রাজনৈতিক সংকটের কারণে দেশে গণতন্ত্র হুমকির মুখে

আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০১৩, ২১:০৫
চলমান রাজনৈতিক সংকটের কারণে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে ও গণতন্ত্র বিপর্যস্ত হচ্ছে। জনগণের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন গণতন্ত্রকে সুসংহত রাখা আর সেজন্য প্রয়োজন সব দলের সহমর্মিতা, সহনশীলতা ও পরস্পরকে এক মতের সাথে যুক্ত হওয়া। রাজনীতি হচ্ছে গণতন্ত্রের মূল স্তম্ভ। সেই রাজনীতি সংকটের ফলে দেশের জনগণের লক্ষ্য ও জনগণের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। রাজনৈতিক উন্নয়নে গণতন্ত্রের বিকাশ অনস্বীকার্য। কিন্তু গণতান্ত্রিক যাত্রাপথে রাজনৈতিক সংকটের কারণে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে অনতিবিলম্বে অর্জিত গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হয় এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। সেই সত্য বোধোদয় আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ উপলব্ধি করতে ব্যর্থ। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের শুভবুদ্ধির উদয় হোক আমরা দেশের আপামর জনগণ সেই আশা করি। নিকট অতীত থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত। এক নেত্রী আরেক নেত্রীকে শত্রু না ভেবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ভাবা উচিত। উন্নত দেশের গণতন্ত্রের প্রক্রিয়াকে অনুসরণ করা উচিত। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের নেতাদের আচরণ থেকে শিক্ষা লাভ করতে হবে। যা অগণতান্ত্রিক শক্তির উত্থান রোধে আলোচনার মধ্যদিয়ে চলমান রাজনৈতিক সংকটের সমাধান বের করা যাবে। তাদের এ বোধোদয় না হলে শুধু তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, ব্যাহত হবে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা। বড় দুই দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও প্রধান বিরোধী দল বিএনপির রাজনৈতিক সংকটের ফলে দেশ অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন দেশের সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যম এবং রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক। আলোচনার মাধ্যমে এ রাজনৈতিক সংকট নিরসন না হলে দেশের গণতন্ত্র বিপদগ্রস্ত হবে বলে আশংকা প্রকাশ করছেন। কারণ এ দুই দলের রাজনীতি এখন সভ্যতার খোলস ছাড়িয়ে ধ্বংসাত্মক রূপ নিয়েছে। গত চার/পাঁচ মাসের রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যাবে রাজধানীসহ সারাদেশে ছিল অবরোধ, হরতাল, বিক্ষোভ, লংমার্চ —সবকিছুই সাংবিধানিক অধিকার কিন্তু বিরোধী দল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের দাবিতে যেভাবে হরতাল অবরোধ কর্মসূচির ডাক দেয় তাতে সংবিধান লংঘন হয়। সেই হরতাল অবরোধ লংমার্চ চলাকালে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয় তা দেখে সাধারণ জনগণ হতভম্ব ও স্তম্ভিত। ওইসব কর্মসূচিতে তাজা প্রাণ হারিয়েছে, আহত হয়েছে শত শত মানুষ, নষ্ট হয়েছে দেশের কোটি কোটি টাকার সম্পদ, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইউনিভার্সিটির ও স্কুল-কলেজের শিক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি। কিন্তু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে রাজনৈতিক সংকট দূর করতে হলে প্রয়োজন সংলাপ। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে শত্রুভাবাপন্ন মন তৈরি হচ্ছে এবং সৌজন্যমূলক আচরণ থেকে দূরে থাকে এই বড় দুই দল, ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে সৃষ্টি হচ্ছে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি। অনিবার্য হয়ে উঠছে সংঘাত যা কখনোই কাম্য নয়। সরকার ও বিরোধী দলের অবস্থান মুখোমুখি হয়ে ওঠায় এবং রাজনৈতিক সংকটের কারণে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে ফলে অরাজনৈতিক তৃতীয় পক্ষ সরকার পরিচালনা করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যা অতীতের বাস্তবতায় দেখেছি। অরাজনৈতিক তৃতীয় পক্ষের শক্তির আবির্ভাব আমাদের দেশের রাজনীতির জন্য সুফল বয়ে আনতে পারে না। বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী ও বন্ধুভাবাপন্ন রাষ্ট্রগুলো আমাদের দেশের রাজনৈতিক সংকট নিয়ে চিন্তিত। কারণ রাজনৈতিক সংকট যতই ঘনীভূত হয় ততই বাধাগ্রস্ত হয় উন্নয়ন। দেশের উন্নয়ন মূলত নির্ভর করে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের উপর। রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিনষ্টের পাশাপাশি এই সংকটময় রাজনীতি জনগণের নিরপত্তাকে বাধাগ্রস্ত করে তুলেছে। তাই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনকে কলুষমুক্ত করার জন্য রাজনৈতিক সংকট উত্তরণের জন্য মুখ্য ভূমিকা পালন করবে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। মূলত সংকট সমাধানের জন্য তাদের এগিয়ে আসতে হবে। রাজনৈতিক সংকট যদি দূর হয় সেটার কৃতিত্ব অবশ্যই দুই নেত্রীর। আবার রাজনৈতিক সংকট বাড়লে সেটার দায়ভারও তাদের উপর। আমরা জানি দুই নেত্রী যথেষ্ট প্রজ্ঞাবান, তাই আমরা সাধারণ জনগণ আশা করি রাজনৈতিক সংকট উত্তরণের জন্য এগিয়ে আসবেন। কীভাবে রাজনৈতিক সংকট দূর করা যায়, সে বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা করবে। তারপর রাজনৈতিক দলগুলোকে অবাধ, সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। সেক্ষেত্রে তত্ত্বাবধায়ক সরকার একমাত্র গ্যারান্টি নয়। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য আরো অতীব জরুরি কাজ রয়েছে। যেগুলো বাদ দিয়ে শুধু তত্ত্বাবধায়ক বা নির্দলীয় সরকার যথেষ্ট নয়। নির্বাচনকালে যে সরকার ক্ষমতায় থাকুক না কেন, সেই সরকারের ভূমিকা কী হবে, এর ক্ষমতা কোথায় কোথায় সীমাবদ্ধ থাকবে, কোথায় কোথায় ভূমিকা থাকবে না— এসব আইনে থাকতে হবে। বাংলাদেশে অতীতে তেমন একটা গুরুত্ব দেয়নি নির্বাচনকালীন সময়ে, ফলে নির্বাচন কমিশন নির্বাচন পরিচালনা করতে গিয়ে স্বাধীন ও সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন করতে পারেনি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার পর নির্বাচিত ভুয়া ভোটার ভোট জালিয়াতি গণনার জালিয়াতি ফলাফল প্রকাশে নানা প্রশাসনিক কারসাজি ঠেকানো যায়নি। সেক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন পরিচয়পত্রসহ নানা সংস্কার নিয়ে মাঠে নেমেছিলো। ফলে নির্বাচন কমিশন ইতিবাচক ভূমিকা পালন করছিল। এখন নির্বাচন কমিশন সেই ধারাতে অগ্রসর হচ্ছে। তাছাড়া কোন গণতান্ত্রিক দেশে অগণতান্ত্রিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করাটা দেশের জন্য মঙ্গল বয়ে আনে না এবং অতীতে আমরা লক্ষ্য করেছি তত্ত্বাবধায়ক সরকার অগণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে দেশ পরিচালনা করেছে এবং দেশে রাজনৈতিক অঙ্গনে সংকট দেখা দিয়েছিল এবং অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। রাজনৈতিক সংকট ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি দূর করার জন্য নির্বাচনের সামগ্রিক বিষয়টি নিয়ে ক্ষমতাসীন দল ও প্রধান বিরোধী দল সংসদে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বাছাই কমিটি গঠন করতে পারে, যা তাদের নিয়ে সংসদে ও বাইরে খোলামেলা আলোচনা হওয়া উচিত। যা দীর্ঘমেয়াদী বাংলাদেশের অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের উপায় গভীরভাবে ভাবতে পারে এবং বাস্তব রূপরেখা ও বিধি-বিধানের রূপ নিতে পারে সেখানে আইনীসহ রাষ্ট্র, প্রশাসন বিধি-বিধানগত দিকগুলো আইনে পরিণত করতে পারে। নির্বাচনকালীন সময়ে সমস্ত ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের হাতে প্রয়োগ করতে হবে। তাহলে নির্বাচন কমিশন অবাধ, সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন পরিচালনা করতে পারবে। সেই নির্বাচন সবার কাছে গ্রহণ যোগ্যতা পাবে। তাহলেই গণতান্ত্রিক শাসন প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। লেখক:প্রাকটিসিং এ্যাডভোকেট, ফরিদপুর জজকোর্ট