সরকারের বিভিন্ন বিভাগে কি প্রকারে কার্য সম্পাদিত হইবে তাহার সুস্পষ্ট বিধিমালা রহিয়াছে। প্রতিটি বিভাগের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম পরিচালিত হইয়া থাকে রুল্স অব বিজনেস অনুযায়ী। প্রত্যেকটি ডিপার্টমেন্টের নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামো রহিয়াছে, আছে চেইন অব কমান্ড। পুলিশ বিভাগও ইহার ব্যতিক্রম নহে। কোথায় কাহাকে নিয়োগ বা বদলি করিতে হইবে, কে কোথায় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে, কে কতটুকু দক্ষতার সহিত কর্তব্য পালন করিয়া যাইতেছে না যাইতেছে, তাহা দেখিবার দায়িত্ব বিভাগীয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার। বিষয়টি এমন নহে যে, মাঠ পর্যায়ের কোনো অফিসারের কার্যকলাপ সম্পর্কে কোনো সাধারণ নাগরিকের অভিযোগ-অনুযোগ থাকিতে পারে না। সেরূপ ক্ষেত্রে দল মত ও শ্রেণি নির্বিশেষে যে কোনো নাগরিকের অভিযোগ আমলে নিয়া সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নিয়ম মাফিক তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন। ইহাই রীতিসিদ্ধ এবং স্বাভাবিক শৃঙ্খলার কথা।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হইলেও সত্য এই যে, বাংলাদেশের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহে প্রায়শ এই সাধারণ নিয়ম কাজ করে না বা করিতে পারে না। সময়ান্তরে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে এবং যখন যে দল সরকারে থাকে সেই দলের নেতা-কর্মীদের চাওয়া-না চাওয়া, সুবিধা-অসুবিধার প্রশ্নটি প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও বড় হইয়া দেখা দেয়। ক্ষমতাসীন দল সমর্থিত নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা ছাড়াও তৃণমূল পর্যায়ের নেতারাও অনেক সময় চাপ প্রয়োগ করিয়া থাকেন নিজ এলাকার অপছন্দের কর্মকর্তাকে অন্যত্র বদলি করিয়া দিবার জন্য। এই ধরনের চাপ যিনি বা যাহারা দেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাহারা এই অজুহাত দিয়া থাকেন যে, ঐ কর্মকর্তা ‘আমাদের’ লোক নন। তিনি বিরোধী দলের হইয়া কাজ করেন।
জনপ্রশাসনের কিংবা পুলিশের কোনো কর্মকর্তা বা সদস্যের বিশেষ কোনো দলের লোকেদের হইয়া কাজ করিবার কথা নয়। তিনি পাবলিক সার্ভেন্ট—জনসাধারণের সেবক। দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করাই পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব। তিনি কোন পার্টির সাপোর্টার তাহা বিবেচ্য বিষয় নয়। কিন্তু রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা এই সত্যটি মানিয়া লইতে পারেন না যেনবা কোনো প্রকারেই। তাহাদের মধ্যে এমনও কেহ কেহ আছেন, যাহারা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিজেদের বেতনভুক কর্মচারী মনে করেন। তাহারা ভুলিয়া যান যে, সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারিগণ প্রজাতন্ত্রের বেতনভুক্ত, কোনো রাজনৈতিক দলের নয় । পক্ষান্তরে এমন অনেক কর্মকর্তাও আছেন, যাহারা কর্মী-ক্যাডারের ন্যায় ভান করিয়া থাকেন। বলিহারি, সেই সব কর্মকর্তার নৈতিক বোধ। শাসক দলের যে কোনো পর্যায়ের যে কেনো নেতা বা কর্মী কোনো অফিসারের কাজে সংক্ষুব্ধ হইতে পারেন, নালিশ করিতে পারেন। দেশের একজন নাগরিক হিসাবেই সে অধিকার তাহার রহিয়াছে। তাই বলিয়া দায়িত্বশীল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কোনোরূপ অনুসন্ধান ছাড়াই নিচের কর্মকর্তাকে বদলি বা প্রত্যাহার করিয়া লইবেন; ইহা তো কোনো কাজের কথা হইতে পারে না। অথচ এই রকমটিই ঘটিয়া চলিয়াছে বলিয়া বহু অভিযোগ রহিয়াছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নিজে যদি সমস্যার সমাধান করিতে না পারেন, তাহা হইলে তাহার উপরের স্তরের কর্তৃপক্ষকে জানাইতে পারেন। প্রয়োজনে মন্ত্রণালয়, এমনকি এই ধরনের সমস্যা দেশের প্রধান নির্বাহীর গোচরেও আনা যাইতে পারে। তাহা না করিয়া কোনো কর্মকর্তা যখন দলীয় বিবেচনাকে প্রাধান্য দিয়া অধস্তনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তখন শৃঙ্খলা বলিতে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। পরিস্থিতি দেখিয়া-শুনিয়া পুলিশের মাঠ পর্যায়ের কোন অফিসারের মনে যদি এই ধারণা বদ্ধমূল হয় যে, দলের স্থানীয় নেতাদের সন্তুষ্টি বিধান করিতে না পারিলে তাহার চাকুরির অসুবিধা হইবে তাহা হইলে কর্তব্য পালনের পরিবর্তে তিনি দলীয় নেতা-কর্মীদের মন রক্ষা করিয়া চলিবার চেষ্টা করিয়া যাইবেন-ইহাই স্বাভাবিক। কিন্তু এইভাবে চলিতে পারে না। মনে রাখা দরকার অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা তৃতীয় বিশ্বের জাতিসমূহের অনগ্রসরতা, দারিদ্র্য সর্বোপরি ভঙ্গুর গণতন্ত্রের মূল কারণ।
