বর্তমানে আমাদের দেশটিতে অনেকগুলো সমস্যা একসঙ্গে জটলা পেকেছে। সমস্যার যেন শেষ হচ্ছে না। একটার পর একটা নতুন নতুন সমস্যা আবির্ভূত হচ্ছে। যেমন- এ সরকারের শুরুতেই মানুষ যা দেখতে পেয়েছিল তা হচ্ছে এক মহা শেয়ার কেলেঙ্কারির ঘটনা- যার পরিণতিতে অনেক সাধারণ মানুষ পথে বসেছিল। যদিও সেই কেলেঙ্কারির হোতারা টাকা-পয়সা লুট করে ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেল। সেই ঘা শুকাতে না শুকাতে একটার পর একটা দুর্নীতির ফিরিস্তি বের হতে লাগলো। যার মধ্যে ডেসটিনি, হলমার্ক ও পদ্মাসেতুর হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির খবর আজ আর কারো অজানা নয়। অথচ কয়েক বছর আগের জোট সরকারের আমলের লাগামহীন দুর্নীতির কথা ভুলতে না ভুলতেই মহাজোট সরকারের আমলে আবারো সেই একই চেহারা যেন দেখতে পাচ্ছে মানুষ। যেন মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ। এই সমস্যাগুলোর কোনো শাস্তিমূলক সমাধান অর্থাত্ কোনো জবাবদিহিতামূলক উত্কৃষ্ট উদাহরণ মানুষ আজও দেখেনি। তদুপরি সমস্যা রয়েছে দেশে জাতীয় নির্বাচন কিভাবে হবে- তার একটা যথাযথ বিহিত। অর্থাত্ গত ২২ বছর থেকে চলে আসা অন্তর্বর্্তীকালীন বা নির্দলীয় বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে যে জাতীয় নির্বাচন হয়ে আসছিল- তা আর এখন নেই। মহাজোট সরকার ক্ষমতার বলে তা সংসদে বাতিল করে দিয়েছেন। বিএনপিও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ছাড়া নির্বাচনে অংশগ্রহণে অনিচ্ছুক। যদিও তারা এই পদ্ধতিটির এক সময় ঘোর বিরোধী ছিল। এমতাবস্থায় যোগ হয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে ঘিরে দেশে এক অচলাবস্থা। কেবলমাত্র তিনজন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় প্রকাশিত হয়েছে। তন্মধ্যে প্রথমজন পলাতক যার ফাঁসির আদেশ হয়েছে। অন্য দু’জনের মধ্যে একজনের যাবজ্জীবন (কাদের মোল্লা) আর অপরজনের (দেলোয়ার হোসেন সাঈদী) ফাঁসির আদেশ দিয়েছে আদালত। উপযুক্ত প্রমাণাদি থাকা সত্ত্বেও কাদের মোল্লার যাবজ্জীবনের রায় যেমন মেনে নিতে পারছে না তরুণ সমাজ (যারা মূলত ব্লগার নামে পরিচিত)- যার ফলশ্রুতিতে শাহবাগে ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে গণজাগরণের শুরু হয়েছে। অন্যদিকে দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর ফাঁসির আদেশের পরে জামায়াতে ইসলামী যেন মরিয়া হয়ে উঠেছে সারা দেশব্যাপি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়াকে থমকে দেয়ার জন্য। যাকে পূর্ণ উদ্যমে ব্লাইনড সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছে বিএনপি। এইসব জটলায় পড়ে মানুষ একেবারেই দিশেহারা। একদিকে হরতাল, ধর্মঘট, অন্যদিকে ব্লগার রাজিব হত্যা ও জামায়াত-শিবিরের ধর্ম নিয়ে উস্কানি ও তাণ্ডব। তার উপর নতুন করে যোগ হয়েছে আর একটি সংস্করণ- যার নাম হেফাজতে ইসলাম। তারা তো ব্লগারদেরকে ধারাবাহিকভাবে শুধু নাস্তিকই বলছেন না তারা বরং এদের ফাঁসিসহ ১৩ দফা দাবি উপস্থাপন করেছেন। এসব নানাবিধ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশে যে এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে— তাতে যেমন জ্বালাও-পোড়াওয়ের পাশাপাশি ব্যাপক হানাহানির ঘটনা ঘটেছে, তেমনি ঝরে পড়েছে অকালে অনেক প্রাণ। সাধারণ মানুষ, পুলিশ, ছাত্রলীগ, শিবির ও জামায়াতের কর্মীসহ প্রায় ১৩০-এর অধিক লোক প্রাণ হারিয়েছেন এসব তাণ্ডবে। এতোগুলো লোকের যে প্রাণ ঝরে গেল— এর দায়ভার আসলে কার? কে বা কারা নেবে এতোগুলো হত্যার দায়ভার? অনেক ঘটনার তো অনেক ভিডিও চিত্রও প্রকাশিত হয়েছে। কে কাকে মারল- তার কি কোনো নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত নয়? এই ব্যক্তিগুলির হত্যার সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যক্তিগুলোকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করা কি অনিবার্য নয়? এখানে সরকারি, বিরোধি, জামায়াত-শিবির বা পুলিশ যে যাকেই হত্যা করুক না কেন- এসব ঘটনাকে উপেক্ষা করা মোটেই সমীচীন নয়। বরং এসবকে আইনের আওতায় যদি না আনা হয়- তাহলে ভবিষ্যতেও এসব ঘটনার হয়তো পুনরাবৃত্তি এড়ানো যাবে না- যা কোনোভাবেই কারো কাছে কাম্য বা কাঙ্ক্ষিত নয়। সমস্যা আছে তার সমাধানও আছে। কিন্তু কিভাবে আমরা সেই সমাধানের পথ খুঁজে নেব- ভুল পথে না সঠিক পথে- বাঁকা না সোজা পথে- সে তো আমাদেরকেই খুঁজে বের করতে হবে। যারা রাজনীতি করেন, দেশ পরিচালনা করেন, গণতন্ত্রের পথ দেখান, ক্ষমতার ভিতরে ও বাইরে থাকেন- তাদের উপরই এই দায়িত্বটা বর্তায় সবার আগে। ভুল ও বাঁকা পথ পরিহার করে সঠিক পথে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন, সেটাই তো হবে রাজনীতিকদের মুখ্য রাজনীতি ও কাম্যতা। আমাদের সবুজে ঘেরা সোনার বাংলাদেশ ও দেশের মানুষ ভাল থাকবে, শান্তিতে থাকবে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারায় এগিয়ে যাবে দেশ- তা কে না চায়!
পরিশেষে বলব যে, আমাদের মধ্যে অনেক মতবিরোধ ও মতপার্থক্য রয়েছে। কিন্তু তাই বলে মতবিরোধের জন্য তো আমরা কারো প্রাণ কেড়ে নিতে পারি না, হানাহানির দিকে অগ্রসর হতে পারি না, জ্বালাও-পোড়াওয়ের পথ বেছে নিতে পারি না। অপরের মতের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাশীল থাকা উচিত- হয়তো সে মত আমার নিজের পক্ষে নয়- তবুও। গণতন্ত্রের বিউটি তো সেখানেই যেখানে রয়েছে সবার মত প্রকাশের স্বাধীনতা। সব মত ও বিশ্বাসের মানুষ এক সমাজে বসবাস করবে। সংখ্যালঘুদের সংখ্যাগুরুদের দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হতে হবে না। আমরা যদি সত্যিকার গণতন্ত্রে বিশ্বাসীই হই, তাহলে আমাদেরকে অনুগত হতে হবে Freedom of expression বা Freedom of speech ev Freedom of religion- এ। অন্যথায় আমাদের শান্তির আশা করাটা দুরাশায় রয়ে যাবে- যা কাম্য নয়। তাই পেশীশক্তি নয়, বরং সবার মতকে গুরুত্ব দিয়ে এক টেবিলে আলোচনার মাধ্যমে ধৈর্য ও মেধাশক্তি দিয়ে পরিস্থিতি সঠিকভাবে মোকাবেলা করাই হবে উত্তম পদ্ধতি।
লেখক : যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও স্টেটে একটি ইন্ডাস্ট্রিতে কর্মরত
alamrowshon¦gmail.com
