আপনদর্পণ

নতুন দিনের ভাবনা

আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০১৩, ২২:১১
‘ভাবিয়া করিও কাজ করিয়া ভাবিও না’ ছেলেবেলায় পাঠ্য বইতে পড়তাম কতো নীতিকথা। ‘আপনারে বড় বলে বড় সেই নয় লোকে যারে বড় বলে বড় সেই হয়’ ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি সারা দিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি’ এখন দেখি সেই নীতিকথাগুলো কেন যেন পালটে যাচ্ছে। আজকাল শিশুদের পাঠ্যপুস্তকে এ ধরনের কবিতা বা ছড়া পড়ানো হয় না। তারা যা শেখে তাতে বিদ্যা হয়তো বা বাড়ে, কিন্তু নীতিগুলো মুখ লুকায় অজানা বনে। একজন শিশুর জীবনে প্রধান শিক্ষক তার মা, তার বাড়ি, তার আত্মীয়-স্বজন, তার প্রতিবেশী। জন্মের পর থেকেই শুরু হয়ে যায় শিক্ষাগ্রহণ নিজেরই অজান্তে। চাঁদের পানে চেয়ে চেয়ে রাত কেটেছে কতো তাই তো সোনা চাঁদের কণা পেয়েছে মনের মতো এ যুগের একজন ব্যস্তবাগিস মা ছড়া শুনিয়ে চুলে হাত বুলিয়ে কোলে দোল দিতে দিতে শিশুকে ঘুম পাড়ানোর সুযোগ পান না। বেশিরভাগ মহিলাই যান কর্মক্ষেত্রে, একজনের রোজগারে সংসার তরিটিকে ভালোভাবে চালানো যায় না। বাচ্চাটি থাকে গৃহ পরিচারিকার তত্ত্বাবধানে, একান্নবর্তী পরিবার থাকলে এমন বিপর্যয় হতো না। নিজের স্বাতন্ত্র্য বা প্রাধান্য রাখতে গিয়ে কী যে ক্ষতি হয়ে গেল বুঝতে বুঝতে বড্ড দেরি হয়ে গেলো। যে শিশুরা সান্নিধ্য পায় দাদি নানি, দাদা নানা, খালা মামা, চাচা ফুফু, তাদের জীবন হয় অনেক আনন্দময়। স্কুলে পড়ে বাড়ি ফিরে বুয়ার কঠিন মুখ নয়, হাত বাড়িয়ে কোলে টেনে নেন মমতাময়ী দাদি, তিনি যে দীর্ঘক্ষণ ধরে প্রতীক্ষা করছেন সোনামণিদের প্রত্যাবর্তনের। মুহূর্তে সামনে আসে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি, লেবুর সরবত যা শুধু তৃষ্ণা নয় অন্তরকেও করে শান্ত। দিনের পর দিন যায়, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর, তাই নতুন এসে ঠাঁই করে নেয় পুরনো মূল্যবোধের, পুরনো অভ্যাসের। বৈশাখ আসে সেই নতুনের বারতা নিয়ে। আজি কি তাহার বারতা পেলো রে কিশলয় ওরা কার কথা কয় বনময় ইলিশ ইলিশ ইলিশ, কোথায় গেলো তারা। ফোনে ফোনে আলাপ করেন গিন্নিরা। বাজারে তো গেলাম, কিন্তু ইলিশ কেনা গেলো না ভাই। আমরা জানতাম নদীর মাছ থাকে নদীতে, সাগরের মাছ সাগরে, বরিশালের কীর্তনখোলা, চাঁদপুরের ডাকাতিয়া, রাজশাহীর পদ্মা, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী ইলিশ মাছের পিত্রালয়, এখন তারা নদী ছেড়ে চড়ে বসেছে তাল গাছের মগডালে, দামটি গগনচুম্বি, মধ্যবিত্তের ধরাছোঁয়ার বাইরে। জমজমাট হয়ে উঠেছে শহুরে বৈশাখী উত্সব, সূর্য ওঠার ক্ষণে ভিড় জমে বিভিন্ন পার্কে মাঠে অথবা ক্লাবের চত্বরে। সেখানে ঢোলের সঙ্গে বাদ্য, বাউল গান, অন্য পাশে পান্তা ভাত ও ইলিশ ভাজা। আরো আছে নানা পদের ভর্তা, ধনে পাতার ভর্তা, সর্ষে ভর্তা, মরিচ ভর্তা, শুঁটকি ভর্তা, কালোজিরার ভর্তা ইত্যাদি ইত্যাদি। অতএব, ইলিশ কেনা আপনার আমার জন্য নয়। পরিবর্তন প্রয়োজন, মূল্যবোধকে বিসর্জন না দিয়ে, ফ্যাশনের স্রোতে গা না ভাসিয়ে নিজস্ব সংস্কৃতি ঐতিহ্য নীতিবোধকে জাগ্রত রাখতে হবে। সমাজে থেকে সামাজিক আচরণগুলো বিনা তর্কে মেনে নিতে হবে। মুরুব্বীদের শ্রদ্ধা করা, পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন রাখা, নেশা থেকে বিরত থাকা, পথের দু’ধারে গাছ লাগানো আমাদের সকলেরই দায়িত্ব। সচেতনা এসেছে তরুণ সমাজে। বাড়ির পাশে গুলশান ইয়ুথ ক্লাব, সকাল দুপুর সন্ধ্যা রাত্রি সব সময়ই খেলাধুলা, শরীর চর্চা চলছে। তরুণ প্রেসিডেন্ট রাফেজ আলম চৌধুরী অত্যন্ত স্বহূদয়, সচেতন ও সমাজসেবী। তাই আমরা আশেপাশের প্রতিবেশীরা চেষ্টা করি তাঁর সঙ্গে হাত মিলিয়ে কিছু কাজ করতে। বাড্ডা, নতুন বাজার, কালাচাঁদপুর, বেরাইদ থেকে শিশুরা আসে, কিশোররা আসে, তরুণরা আসে, হয়তো বা ফুটবল নেই, তাতে কোন পরোয়া নেই, গাছের একটি বাতাবি লেবুকে বল বানাতে অসুবিধা কি। একই সঙ্গে খেলতে আসে বনানী, বারিধারা, গুলশানের বাসিন্দারা। সবাই মিলে এক হয়ে যান, খেলার ক্ষেত্রে শ্রেণিবিভাগ হয় না। এখানে মনের মিলনটাই আসল, একেই মূলধন করে আমরা গড়বো একটি সুন্দর বাসযোগ্য পৃথিবী।  লেখক :শিক্ষাবিদ-সাহিত্যিক [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন