বিদেশ

গণতন্ত্রের পথে চীন!

আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০১৩, ২১:৩৩
বিশ্বব্যাপী যে গণতন্ত্রের হাওয়া বইছে তার ধাক্কা কি চীনের প্রাচীরেও লেগেছে! চীন কি তার সমাজতন্ত্রের বোঝা বইতে অক্ষম! নাকি একঘেঁয়েমিতে হাঁপিয়ে উঠেছে চীন! চীনকে ঘিরে এখন এমন হাজারো প্রশ্নের বান। এর কারণও আছে। চীনের প্রেসিডেন্টের কথাবার্তায় মনে হচ্ছে তিনি গণতন্ত্রের জন্য উতলা হয়ে উঠেছেন! ডারবানে সদ্যসমাপ্ত ব্রিকস সম্মেলনে চীনের নয়া প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তার বক্তৃতায় নিজের দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা কমপক্ষে তিনবার উল্লেখ করেছেন। বারবার বলেছেন, রাজনৈতিক সংস্কারের কথা। চীন সমর্থিত রাজনীতিকদের একটা যুক্তি হচ্ছে, সমাজতন্ত্র গণতন্ত্র বিরোধী ধারণা নয়। বরং গণতন্ত্রের উন্নততর বিকাশই হল সমাজতন্ত্র। মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিকরা অনেক দিন ধরেই বলে এসেছেন, চীনে যা প্রতিষ্ঠিত, তা হল সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্র। পশ্চিমি তাত্ত্বিকরা পুঁজিবাদকেই গণতন্ত্র বলে সমাজতন্ত্রের সঙ্গে বিরোধ লাগিয়ে রেখেছেন। বাস্তবতা হলো গত কয়েক বছর ধরেই চীন অনেক বেশি করে খোলাবাজার অর্থনীতির দিকে এগিয়ে চলেছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন সমাজতান্ত্রিক ধারণাকে একটি লোহার খাঁচায় আবদ্ধ করতে চেয়েছিল। সেই কারণে তা বুমেরাং হয়ে যায়। কিন্তু চীন অনেকটা জানালা খুলে উষ্ণ বাতাস বার করে দিয়ে নিজেদের ব্যবস্থা বাঁচিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে। শুধু বাঁচিয়ে রাখাই নয়, সমাজতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতির নামে অনেক এগিয়েও গিয়েছে তারা। ফলে দেশের সার্বিক আর্থিক শ্রীবৃদ্ধি হয়েছে। রফতানি বেড়েছে। বেড়েছে বিভিন্ন দেশে আর্থিক বিনিয়োগও। সস্তার চীনা শ্রমিক পৌঁছে যাচ্ছে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। সব মিলিয়ে এখন বিশ্ব বাজারের অনেকটাই দখল করে নিতে সক্ষম হয়েছে চীন। ফলে চীনা ড্রাগনের নিঃশ্বাসে উদ্বিগ্ন পৃথিবীর তাবত্ বৃহত্ অর্থনীতি। এত সাফল্যের পরেও তা হলে কেন চীনা রাষ্ট্রপ্রধানের গলায় গণতন্ত্রের বুলি? কেন এক দলীয় শাসনব্যবস্থার বদলে আরও অনেকগুলি রাজনৈতিক দলকে পরিসর দেওয়ার দাবি উঠছে সরকার ও দলের বিভিন্ন স্তর থেকে? প্রশ্ন উঠছে, চীনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হবে বলে যা বলা হচ্ছে, তা কি বাস্তবে রূপায়ণ করা সম্ভব? তা হলে তো মার্ক্সবাদের মূল পরিকাঠামোই বদলে যাবে। মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী অ্যান্ড্রু নাথান বলছেন, ১৯৮৯ সালের সঙ্কটের পরে চীনা প্রশাসন আরও দমনমূলক রাস্তা নেয়। সেটাই ছিল সে সময়ে চীনের স্থিতাবস্থাকে বজার রাখার পথ। এখন শি জিনপিং বলছেন, অতীত থেকে শিক্ষা নিচ্ছেন তারা। দেশের এক শ্রেণির মানুষের বিরুদ্ধে দুর্নীতির যে অভিযোগ উঠছে, তা-ও দমন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। এক দিকে জিনপিং সাবেকি কমিউনিস্ট পরিভাষাকে ধরে রাখতে চাইছেন। আবার জাতীয় স্তরে সরকারের প্রতি দেশবাসীর যে অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে, তার অনেকটাই ইন্টারনেট-ফেসবুকের মাধ্যমে বের করে দিতে চাইছেন তিনি। উদ্দেশ্য হল, সাধারণ মানুষের ক্ষোভ যাতে পুঞ্জীভূত না হয়ে একটি ছিদ্র দিয়ে বেরিয়ে যায়। রাজনৈতিক সংস্কার বলতে জিনপিং কী বুঝিয়েছেন, তা নিয়েও জল্পনা শুরু হয়ে গিয়েছে। ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেস (এনপিসি)-এর মুখপাত্র ফু ইউঙ্গ বলেছেন, রাজনৈতিক সংস্কার মানেই এক দলীয় থেকে বহু দলীয় শাসনব্যবস্থায় চলে যাওয়া নয়। চীনা বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার উন্নতি ও বিকাশ। আবার ইউঙ্গ এটাও বলেছেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের ব্যর্থতা নিয়ে গবেষণায় দেখা গিয়েছে, সেনাবাহিনীর উপর থেকে দলের নিয়ন্ত্রণ হারানো চলবে না। চীনের বর্তমান পরিস্থিতি দেখে এক ভারতীয় কূটনীতিক মন্তব্য করেছেন, “আর যা-ই হোক, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং কিন্তু গরবাচেভ হতে চান না। বরং তিনি গরবাচেভের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এগোচ্ছেন।” এখন চীনে নয়া নেতৃত্ব যদি সংস্কারের ধারা অব্যাহত না রাখেন, তা হলে ফের ক্ষমতা পরিবর্তনের জন্য বিদ্রোহের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না অনেকেই। লেখক : সাংবাদিক [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন