চট্টগ্রাম জেলার অন্তর্গত ফটিকছড়ির ভুজপুর ইউনিয়নে গত বৃহস্পতিবার ভয়াবহ সহিংতার ঘটনা ঘটে। হরতাল সমর্থক ও বিরোধীদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষে ঐ দিন তিন জন নিহত ও অর্ধশতাধিক গুলিবিদ্ধসহ শতাধিক ব্যক্তি আহত হন। ইত্তেফাকের রিপোর্টে প্রকাশিত ঘটনার বিবরণে দেখা যায়, স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতৃত্বে প্রায় পাঁচ শতাধিক মোটর সাইকেল ও অন্যান্য গাড়ি নিয়া হরতাল বিরোধী র্যালি বাহির করা হয়। সেই র্যালিটি ভুজপুর ইউপির কাজিরহাট বাজারে পৌঁছাইলে কে বা কাহারা মাইকে ঘোষণা দেয় যে, সেখানকার বড় মাদ্রাসায় হামলা হইয়াছে, মসজিদে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হইতেছে ও মাদাসার মুহতামিমকে ধরিয়া নিয়া যাওয়া হইতেছে ইত্যাদি। এই খবরকে ইতোমধ্যে স্রেফ গুজব ও ডাহা মিথ্যা বলিয়া দাবি করা হইয়াছে। যাহা হউক, ঐ ঘোষণার পর এলাকার শিবিরকর্মী, মাদ্রাসার হেফাজতে ইসলামের সমর্থক ও হাজার হাজার গ্রামবাসী একত্রিত হইয়া ও দেশী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হইয়া ঐ মিছিলের উপর হামলা চালায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে এক প্লাটুন বিজিবি ও থানা হইতে অতিরিক্ত পুলিশ তলব করা হয়। তাহার পরও উপরোক্ত ব্যাপক হতাহতের ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয় নাই। নিহতদের তিনজনই ও আহতদের অনেকেই আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগের কর্মী বলিয়া জানা গিয়াছে। আবার বিজিবি ও পুলিশের কয়েক শত রাউন্ড গুলিবর্ষণে গ্রামবাসী ও শিবির-হেফাজতকর্মীদেরও অনেকে গুলিবিদ্ধ হইয়াছে। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী এই ঘটনায় পাঁচ হাজার মানুষকে আসামি করিয়া মামলা ও ৩৪ জনকে গ্রেফতার করিয়াছে পুলিশ। সেই সঙ্গে এলাকায় ১৪৪ ধারা বলবত্ রহিয়াছে।
ফটিকছড়ির এই ঘটনা সত্যিই দুঃখজনক। উদ্বেগজনক তো বটেই। ইহার আগেও মানিকগঞ্জে মাদ্রাসা দখলের কথা বলিয়া মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়ার মাধ্যমে সংঘাত ও সহিংসতাকে উসকাইয়া দেওয়া হইয়াছে। ঘটিয়াছে হতাহতের ঘটনাও। তবে চট্টগ্রামের এই ঘটনার পর গ্রামাঞ্চলে সংঘাত কী মাত্রায় ছড়াইয়া পড়িয়াছে তাহা বুঝিতে আর অসুবিধা হয় না। উত্তরাঞ্চল-দক্ষিণাঞ্চল সর্বত্রই রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিদ্যমান। রাজধানীর আশেপাশের অঞ্চলেও বিরাজ করিতেছে উত্তেজনা। এইসব কোন ভাল লক্ষণ বা আলামত নহে। কিন্তু দেশের পরিস্থিতি কেন এই পর্যায়ে উপনীত হইয়াছে তাহাও আমাদের উপলব্ধি করিতে হইবে।
প্রথমত খোলা চোখে দেখিলে যে কেহ বলিবেন, এইসব কিছুই রাজনৈতিক অবিশ্বাস ও আস্থাহীনতার ফসল। তাহার ফলেই এত উত্তাপ ও অসহিষ্ণুতা। দেশবাসীর মধ্যে সুস্পষ্ট অনৈক্য ও বিভক্তি। তবে এক দিনেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় নাই। সঠিক গণতন্ত্র চর্চা, সুশাসন ও আইনের শাসনের অভাবেই ভেদরেখা বাড়িয়া গিয়াছে। দ্বিতীয়ত যাহারা রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন ও আছেন তাহাদের অন্যায়-অবিচারের কারণেও ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হইয়াছে। শাসকরা অনেক ক্ষেত্রেই বাড়াবাড়ি ও সীমালংঘন করিয়াছেন। এমন নয় যে, শুধু এই সরকারের কারণে ও এই সরকারের আমলেই এইরূপ পরিস্থিতির সৃষ্টি হইয়াছে। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৭ সালে প্রতিবারই আমরা বিপর্যয়ের সম্মুখীন হইয়াছি। নূতন নির্বাচনের আগে ক্ষমতা হস্তান্তরকে কেন্দ্র করিয়া অস্থিরতা দেখা গিয়াছে। ক্ষমতার এই পালাবদল কখনও শান্তিপূর্ণ হয় নাই; তবে এইবারের সংকট মনে হয় আরও বেশি ও গভীর। তাহাছাড়া শাহবাগ গণজাগরণ ও তাহার বিপরীতে হেফাজতে ইসলামের আবির্ভাবের ফলে নূতন মাত্রা লাভ করিয়াছে।
এই রকম শ্বাসরুদ্ধকর ও অস্বাভাবিক পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি রোধ করিতে হইলে রাষ্ট্রীয় অন্যায়-অবিচার বন্ধ করিতে হইবে। রাষ্ট্রকে ব্যবহার করিয়া কেহ যাহাতে নাগরিকদের উপর দমন-পীড়ন এবং জুলুমের পথ গ্রহণ ও নাগরিক অধিকারগুলি ক্ষুণ্ন করিতে না পারে, সেই নিশ্চয়তা দিতে হইবে। অন্যায়-অবিচার বন্ধে দরকার সাধারণ ঐকমত্যও। অন্যথায় ফটিকছড়ির ন্যায় ঘটনা বারংবার ঘটিতেই থাকিবে।
