বিভিন্ন কারণে দেশে কিডনী রোগীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। মোট জনসংখ্যার শতকরা ১০-১৬ ভাগ লোক কোন না কোনভাবে কিডনী রোগে আক্রান্ত বলে জানা গেছে। এ এক ভয়াবহ চিত্র; এ চিত্র আমাদের অন্ধকার ও একটি অকর্মন্য জাতির ভবিষ্যতের পূর্বাভাস দিচ্ছে। তবে আশার কথা, কিডনী বিকলের কারণগুলো- ডায়াবেটিক, প্রেসার, খাদ্য ও জীবনযাত্রা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অনেকটাই স্বাভাবিক জীবন-যাপন করা যায়। মিডিয়ার প্রচারণায় মিডিলম্যানদের প্রতারণা ও ডোনারদের দুর্গতির কথা আমরা জেনেছি, কিন্তু কিডনী রোগীদের দুরবস্থা, বিপন্ন পারিবারিক ব্যবস্থা, মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা, তাদের আহাজারি, নীরব কান্নার শব্দ আমরা শুনিনি।
তারপরও যাদের কিডনী বিকল হয়ে যায়, তাদের জীবনে নেমে আসে অমানিশা, কষ্ট, দুর্ভোগ ও পরনির্ভরতা। কিডনী শরীরের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। কিডনী শরীরে পানির ভারসাম্য রক্ষা করে, রক্তের বর্জ্য বের করে দেয়। তা করতে না পারলে শরীরে, পায়ে, মুখে, ফুসফুসে পানি জমে শ্বাস বন্ধ হয়ে মারা যেতে পারে। অকেজো বা বিকল কিডনী রোগীদের এখন পর্যন্ত দুইটি স্বীকৃত চিকিত্সা পদ্ধতিতে চিকিত্সা দেয়া হয়। একটি হলো-হিমো ডায়ালাইসিস, অন্যটি হলো-কিডনী সংযোজন করা। দুটোই ব্যয়বহুল চিকিত্সা। হিমো ডায়ালাইসিস পদ্ধতিতে রোগীর হাতে ফিস্টোলা তৈরি করা হয়, যার মাধ্যমে শরীরের রক্ত একটি বিশেষ যন্ত্র ডায়ালাইসিস মেশিনের মাধ্যমে পরিশোধিত হয়ে আবার শরীরে ফিরে আসে। একবার ডায়ালাইসিস করতে প্রায় চার ঘণ্টা সময় লাগে। একজন অকেজো কিডনী রোগীকে সপ্তাহে তিনবার বা প্রতি অল্টারনেটিভ ডে’তে একবার ডায়ালাইসিস করতে হয়। একজন কিডনী রোগী হিসাবে এর প্রত্যেকটি কষ্টের ধাপ আমি পার করছি। অন্য চিকিত্সা পদ্ধতিটি হলো নতুন একটি কিডনী রোগীর দেহে সংযোজন করা। কিডনীটি সঠিকভাবে স্থাপন ও এডজাস্ট করলে এটি অত্যন্ত কার্যকর ও স্বাভাবিক জীবন-যাপন করা যায়। কিডনী স্থাপন যেমন ব্যয় বহুল, স্থাপনোত্তর চিকিত্সাও অত্যন্ত খরচ সাপেক্ষ।
সাধারণ লোকজনের ধারণা যে কোন লোকের কিডনী যেকোন রোগীর দেহে সংযোজন করা যায়। ধারণাটি ভুল। একজন পরিপূর্ণ, সুস্থ, নিরোগ মানুষের দুইটি সুস্থ কিডনীর একটি নেয়া হয়, যদি তা রোগীর রক্তের, টিস্যুর সাথে ম্যাচিং হয়। ডোনারের সুস্থতার উপর অধিক গুরুত্ব দেয়া হয় এবং ১৭ প্রকার টেস্ট করা হয়। এ রকম একজন ডোনার খুঁজে বের করা যে কত কষ্ট ও ভোগান্তিকর, যার ঘরে কিডনী রোগী আছে, সেই হাড়ে হাড়ে টের পায়। এ দুর্বলতাকে পুঁজি করে কিছু প্রতারণা জাতিকে নাড়া দিয়েছে। আমাদের দেশে অত্যন্ত সাফল্য ও কম খরচে কিডনী সংযোজন হচ্ছে। অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান রোগীদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। আমাদের ডাক্তারদের সফলতায় বিদেশমুখী রোগীদের স্রোত অনেকটাই কমে এসেছিল। বিদেশে চিকিত্সা নিঃসন্দেহে ব্যয় বহুল। তারা বাংলাদেশ থেকে রোগী আকর্ষণে এজেন্টসহ বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেন। বাংলাদেশে কিডনী সংযোজনে রোগীদের মনে আশার আলো জ্বেলে দিয়েছিল। কিন্তু গত ২০১১ সালের শেষের দিকে কিডনী ক্রয়-বিক্রয় নিয়ে মিডিয়া ব্যাপক সাড়া ফেলে। মিডিয়া মিডিলম্যানদের বিভিন্নমুখী প্রতারণায় কিডনী ডোনারদের আর্থিক ও শারীরিক ক্ষতির বিষয়গুলো জনসম্মুখে উপস্থাপন করে। ফলে বন্ধ হয়ে যায় দেশে কিডনী সংযোজন।
বর্তমানে আইনের কঠোরতায় সীমিত আকারে কিডনী সংযোজন হচ্ছে। রোগীরা বিদেশে চলে যাচ্ছে। আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে ডোনাররাও বিদেশে যাচ্ছে। এ এক বিশাল আর্থিক ক্ষতি। কিডনীও সংযোজন হচ্ছে। কয়েকজন কিডনী রোগী বলেছেন, মিডিয়া শুধু মুদ্রার এক দিকের চিত্র তুলে ধরেছেন, তাদের দুঃখের বিষয়টি মিডিয়ার নজর এড়িয়ে গেছে। তারা তাদের দুরবস্থার কথা উপস্থাপনের দাবি জানিয়েছেন। নীতি নির্ধারকদের কেউ বা তাদের নিকট আত্মীয় যদি এ অবস্থায় পতিত হয়, তবে হয়ত আইনটি দ্রুত সংশোধন হবে। কিডনী সংযোজন করে ডোনারসহ খুব সুস্থ আছেন, এ রকম দু’জন বলেন, যেহেতু একটি কিডনী নিয়ে ভালভাবে জীবন-যাপন করা যায়, তাই কিডনীদান পদ্ধতি সহজ করে দেয়া উচিত। নীরবে নিবৃত্তে মৃত্যুর প্রহরের জন্য অপেক্ষাকারী কিডনী রোগীর আর্তনাদ আইনপ্রণেতা, মানবতাবাদীদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করে জাতির বিবেককে জাগ্রত করবে এটাই তাদের প্রত্যাশা।
লেখক :একজন ভুক্তভোগী কিডনী রোগী [email protected]
