বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সংকটকে অতীত সংকটের হুবহু পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখা বা ভাবাটি যথার্থ হবে বলে মনে করি না। কেননা, অতীতের সংকটগুলোর গতিপ্রবাহ, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে বর্তমান সংকটের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের মিল-অমিলের জায়গায় যথেষ্ট পার্থক্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। ১৯৯৬ এবং ২০০৬-৭ সালের সংকট দুটো কিছুটা ভিন্নতাকেন্দ্রিক হলেও উভয় সংকটের মূলেই ছিল অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা, না করা, ক্ষমতায় যাওয়া ও থাকা কেন্দ্রিকতা। এ নিয়ে দেশে যে ধরনের দ্বন্দ্ব ও সংঘাত তখন সংঘটিত হয়েছিল তাতে রাজনৈতিক সংকট গভীরতর হয়েছিল, প্রথমবার (১৯৯৬) এক ধরনের উত্তরণের পথ খুঁজে পেয়েছিল, দ্বিতীয়বার অর্থাত্ ২০০৬-০৭ সালে কোনোপক্ষই একক অবস্থানের ন্যূনতম কাছাকাছিতে আসতে পারেনি, এর পরিণতি শেষ পর্যন্ত কারো জন্যই ভালো হয়নি, দেশে এক এগারোর মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। দুই বছর পর দেশ আবার রাজনীতিতে ফিরে আসে।
এবার যে দ্বন্দ্ব ও সংঘাত শুরু হয়েছে তাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ইস্যুটি শেষ পর্যন্ত মুখ্য থাকেনি, যুক্ত হয়ে গেছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, আস্তিক-নাস্তিকের ইস্যু, সরকার পতনের এক দফা, ক্ষমতায় যাওয়া ও থাকার ১৩ দফা দাবিনামা, সামাজিক নানা অপ্রকাশিত শক্তির হঠাত্ আবির্ভূত হওয়া, পরস্পর বিরোধী মতাদর্শিক শক্তির উত্থান ও অবস্থান, রাজনীতিতে তাদের শক্তির প্রদর্শন। ফলে নির্বাচনের প্রায় ৯-১০ মাস বাকি থাকতেই দেশ এবার যে গভীর রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে তাকে খুব হালকাভাবে দেখার কোনো সুযোগ বা কারণ নেই। দেশের গণতান্ত্রিক শক্তির বোধ হয় বিষয়গুলো নিয়ে আবেগ ও উচ্ছ্বাসে তাড়িত না হয়ে বাস্তবতাবোধে পরিচালিত হওয়ার সময় এখন ঘাড়ের ওপর এসে অপেক্ষা করছে। তা করতে বা দেখাতে ব্যর্থ হলে এমন কি দেরি করলেও দেশে গণতন্ত্র মারাত্মক হুমকির মুখে পড়তে যাচ্ছে বলে অনেকটাই নিশ্চিত আশঙ্কা করছি। পাকিস্তান, আফগানিস্তান হয়ে মধ্যপ্রাচ্য, মিসর, লিবিয়া, মরক্কো, তিউনেশিয়াসহ মুসলিম প্রধান দেশগুলোর নিকট অতীতের রাজনৈতিক সংকটের গভীরতা ও জটিলতাকে সম্মুখে রেখে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক এই রাজনৈতিক সংকটকে দেখা, এ থেকে উত্তরণের পথ খোঁজা খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে আমার বিবেচনায় প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিকে সবকিছু নতুন করে ভেবে দেখতে হবে, গণতান্ত্রিক ভাবাদর্শের রাজনীতিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। এই দুই দলের রাজনৈতিক মতাদর্শ সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর এতে কোনো সন্দেহ নেই, দ্বিধাও নেই। তারপরও দুটোই রাজনৈতিক শক্তি, দেশের রাজনীতির পরস্পর বিরোধী দুটো ধারাকে এ দুটো দলই প্রতিনিধিত্ব করে, নেতৃত্ব প্রদান করে। দেশ শাসনে তাদের উভয়েরই ভূমিকা ছিল, জনগণ তাদেরই ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত করেছে, তারা জনগণের রায় নিয়ে ক্ষমতায়ও ছিল বা আছে। মানতে দ্বিধা নেই, বিএনপির শাসনামলে দেশ দক্ষিণপন্থায় ক্রিয়াশীল ছিল, পুষ্ট হয়েছে, গণতন্ত্রের চিরায়ত ধারা কিছুটা হলেও দুর্বল হয়েছে, অপরদিকে আওয়ামী লীগের শাসনামলে অসাম্প্রদায়িক ধারা কিছুটা হলেও পুষ্ট হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ফিরে আসার সুযোগ পেয়েছে। দেশে উদারবাদী গণতন্ত্রের বিকাশ সীমিত আকারে হলেও ঘটার বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের গণতন্ত্র এমন দুটো পরস্পর বিরোধী শক্তির অবস্থানে এ পর্যন্ত আসতে পেরেছে। তাতে সমাজে দুটো শক্তিই যার যার অবস্থান নিতে পেরেছে। সম্ভবত তারই প্রকাশ ঘটেছে ২০১৩ সালে দেশের রাজনীতিতে। তরুণ প্রজন্মের উল্লেখযোগ্য অংশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশের রাজনীতিকে সমৃদ্ধ করা ও পরিচালিত করার যে আন্দোলন শুরু করে যা দেশের গণতন্ত্রের জন্য একটি অভূতপূর্ব সম্ভাবনাময় আবেদন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দেশের সরকার এবং বিরোধী দলকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী অবস্থানে তারা দেখার যে আগ্রহ প্রকাশ করেছে তা বেশ সুদূরপ্রসারী। তাতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে উদারবাদী গণতন্ত্রের বিকাশ অনেক বেশি সহজতর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি সম্ভবত হতো যদি প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি রাজনীতির এমন একটি আদর্শিক জায়গার কাছাকাছি অবস্থান নিতে পারতো। কিন্তু সেটি অতীতে ঘটেনি। না ঘটার পেছনে বড় দুই দলের আদর্শিক দুর্বলতা, ভিন্নতা ও সংকীর্ণতা প্রধান কারণ। আমরা জানি না, আপাতত এই সম্ভাবনাকে কতোদূর এগিয়ে নেয়া যাবে নিরবচ্ছিন্নভাবে তবে এমন অগ্রসর যুব-তারুণ্যের আন্দোলনের বহিঃপ্রকাশকে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য নির্ভরযোগ্য শক্তি হিসেবেই দেখতে হবে, ভরসা করতে হবে। বাংলাদেশের সমাজ অভ্যন্তরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি আস্থাশীল গণতান্ত্রিক তরুণ সমাজের উপস্থিতি আগামী দিনের সম্ভাবনাকে উজ্জ্বলতর করেছে। তবে একই সময় বাংলাদেশের সমাজ অভ্যন্তরে ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর উপস্থিতিও বেশ ক্রিয়াশীল, দেশকে মধ্যযুগীয় চিন্তাধারায় ফিরিয়ে নিতে বেশ তত্পর তাও স্পষ্ট হয়েছে। মূলত ধর্মীয় আবেগ ও বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে একটি মোটামুটি বড় গোষ্ঠী বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবির্ভূত হতে চাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের রাজনীতি এখন দুটো পরস্পর বিরোধী ধারায় মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে যা মোটেও রাজনীতির জন্য সুখকর হবার নয়। একদিকে মুুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী তারুণ্য, অন্যদিকে ধর্মান্ধ নানা গোষ্ঠী, এর কোনোটিই মুখোমুখি হওয়া কাঙ্ক্ষিত বা প্রত্যাশিত ছিল না। দু’টো সম্পূর্ণ বিপরীত শক্তি। তবে এমনটি আপনা-আপনি ঘটেনি। দেশের রাজনীতি ১৯৯৯ সালের পর থেকে দলীয় অবস্থানে সীমাবদ্ধ না থেকে জোটগতভাবে সংগঠিত হতে থাকে। তখন ৪ দলীয় জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এর নেতৃত্ব সেই সময় বিএনপির হাতে ছিল। ২০০১ সালের নির্বাচনে ৪ দলীয় জোটের বিস্ময়কর বিজয় দেশের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি ও চরিত্রকেই নতুন হিসাব-নিকাশে নিয়ে যায়। তা থেকে ২০০৪-৫ সালে ১৪ দলীয় জোটের আবির্ভাব ঘটে, ২০০৮ সালের নির্বাচনে মহাজোটের অভূতপূর্ব বিজয় ৪ দলীয় জোটকে সংকটে ফেলে দেয়। ফলে তারা ১৮ দলীয় জোট গঠন করে। দেশ এখন কার্যত দ্বিদলীয় রাজনীতি থেকে দ্বিজোটের বৃহত্তর পরিসরে বিস্তৃত হয়েছে। তাতেও কোনো স্থিরতা আসেনি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে কেন্দ্র করে শাহবাগ আন্দোলনের উত্থানকে মোকাবিলা করার জন্য আস্তিক-নাস্তিকের বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়েছে, তা থেকে গোটা সমাজের অভ্যন্তরে ধর্মীয় আবেগ ও অনুভূতিকে কাজে লাগানো হয়েছে, অবশেষে হেফাজতে ইসলামকে মাঠে নামানো ইত্যাদি বিষয় নতুনভাবে দেশে গণতন্ত্রের সংকট উন্মোচিত করতে শুরু করেছে। যাদের পৃষ্ঠপোষকতায় এদের সংগঠিত করা হয়েছে, কার্যত দেখা যাচ্ছে এই শক্তি তাদেরও নিয়ন্ত্রণে না থাকার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, হেফাজতকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনীতিতে ধর্মাশ্রয়ী সকল শক্তির বিশেষ কোনো সমাবেশ ঘটতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি আওয়ামী লীগ বা বিএনপি কারো জন্যই মঙ্গল বয়ে আনবে বলে বিশ্বাস করার কারণ নেই। ইতিমধ্যে হেফাজতের ১৩ দফা দাবিনামার প্রতি বিএনপি বা আওয়ামী লীগ কেউই সমর্থন জানাতে পারেনি। এরই মধ্যে রাজনীতির মাঠে এদের আবির্ভাব ঘটে গেছে, তাতে একদিনের সহিংস হরতাল, ঢাকায় মহাসমাবেশ, দেশব্যাপী সভা-সমাবেশের আয়োজন, অবরোধ, অবস্থান, গণমাধ্যমের সংবাদ শিরোনাম, টকশোতে প্রাধান্য পাওয়া ইত্যাদি মিলিয়ে দেশ আসলে কোন দিকে যাচ্ছে সেই প্রশ্নে গোটা জাতি দ্বিধাবিভক্ত, ভীতসন্ত্রস্ত্র, হতাশ এবং বিক্ষুব্ধও। এখন যে কেউ হরতাল ডেকে নৈরাজ্য সৃষ্টি করাটি স্বাভাবিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। গাড়ি ভাঙচুর, পোড়াপুড়ি, রাস্তাঘাটে মানুষ মারা কোনো ব্যাপার নয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সরকার এবং প্রধান বিরোধী দল বিএনপির মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে তার সুযোগ নিচ্ছে দ্বন্দ্ব-সংঘাত সৃষ্টিকারী বিভিন্ন অপশক্তি। এতে দেশের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে নৈতিক কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার উপক্রম, মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অথচ সাধারণ মানুষ বুঝতে পারছে না, এখনই দেশে সংঘাত-সংঘর্ষের রাজনীতি এতোটা তীব্রতর হওয়ার কারণ কী? দেখা যাচ্ছে সরকার এবং প্রধান বিরোধী দল বিএনপি পরস্পরের মুখোমুখি অবস্থানে। কেউ কাউকে সামান্য ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়। মনে হচ্ছে উভয় পক্ষই পয়েন্ট অব নো রিটার্নে চলে গেছে। এটি কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য বা সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। উভয় পক্ষকেই দেশের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ন্যূনতম হলেও একটি সমঝোতায় আসতে হবে। আগামী নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হতে হবে এ নিয়ে কোনো দ্বিমত থাকতে পারে না। প্রশ্ন হচ্ছে নির্বাচনকালে কী ধরনের সরকার ব্যবস্থা থাকবে, যা কোনোভাবেই নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করবে না, সকল পক্ষের জন্য সমান অবস্থান তৈরি করবে, নির্বাচন কমিশনকে আরো কী কী কাজ করতে হবে—পুরো বিষয়গুলো নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি আলাপ-আলোচনা করবে, সে সবকিছু করার সময়তো এখনই। দুঃখজনক অভিজ্ঞতা হচ্ছে, আলোচনা বা আন্দোলন কোনোটিই সেদিক কেন্দ্রিক নয়। এখানেই আতঙ্কের বিষয়। কেন কোনো পক্ষই বিষয়গুলো নিয়ে সুস্পষ্ট কোনো প্রস্তাব দিচ্ছে না, কথা বলছে না তা মোটেও বোধগম্য নয়। তবে পরিস্থিতি যেদিকে মোড় নিচ্ছে তা কারো কাছেই ভালো মনে হচ্ছে না। সংঘাত-সংঘর্ষ বাড়তে বাড়তে কোথায় গিয়ে পৌঁছাবে সেই হিসেব কিছুতেই মেলানো যাচ্ছে না। কেউ কেউ এক এগারোর মতো কিছু একটা আশঙ্কা করছেন। সেটির সম্ভাবনা না থাকলেও অন্য কিছু যে ঘটবে না, সংঘাতে সংঘাতে দেশ সম্পূর্ণরূপে দাঁড়িয়ে যাবে না তার কী কোনো নিশ্চয়তা রয়েছে? এখন যেভাবে চতুর্দিক থেকে সংকট ধেয়ে আসছে তা যদি রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমাধান দিতে না পারে তাহলে বাংলাদেশ পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের মতো দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত সংকটেই পড়তে পারে। তেমন অবস্থাটি কারো জন্যই ভালো হবে না। সুতরাং এখনো বেশ সময় আছে, দুই দলকেই সমাধানের উপায় বের করতে হবে, বাস্তবোচিত সমাধানের পথেই দুই দলকে এগুতে হবে, জেদাজেদি, হরতাল আর মামলার প্রতিযোগিতায় নয়, রাজনৈতিক বিবেচনায় অগ্রসর হলেই সমাধানের মহাসড়কে ওঠা যেতে পারে।
লেখক : অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
