সহিংসতা বন্ধে প্রয়োজন সংলাপ

আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০১৩, ২১:১৩
দেশে চলমান অস্থির অবস্থার মধ্যে স্বস্তির একটা সংবাদ হল পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রীর শুভেচ্ছা কার্ড বিনিময়। দেশের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য জনগণ মূলত যাদের বিপরীতমুখিতাকে দায়ী করছে তারাই পরস্পরকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। বিষয়টি আপাতত সুখময় হলেও জানি না এ মনোভাব আদৌ টেকসই হবে কি না। কারণ দেশের সংকটময় অবস্থা নিয়ে সংলাপের জন্য দেশ-বিদেশের জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিরা বারবার তাগিদ দিলেও তা বাস্তবায়নের সামান্য কোন আলামত দেখা দূরের কথা বরং উভয়ের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি ও দূরত্ব বৃদ্ধিমূলক কথাবার্তায় সবাই যেন বারবার হতাশ হচ্ছে। দলীয় প্রধানদের এ আচরণের প্রভাব তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছানোর কারণে দেশে অস্থিরতা-সংঘাত-সংঘর্ষের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে অকল্পনীয়ভাবে। এসব সংঘাত-সংঘর্ষের বলি হচ্ছে সাধারণ মানুষ আর ক্ষতি হচ্ছে দেশ। এ অবস্থা চলতে থাকলে আমাদের দুর্বলতার সুযোগে বিদেশীরা তাদের স্বার্থে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ পাবে যার পরিণাম হতে পারে আরও ভয়াবহ। তাই সংকট নিরসনে অনতিবিলম্বে নিজেদের মধ্যে সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতায় আসা অপরিহার্য। সংলাপে বসতে হবে দেশ ও মানুষের কথা মাথায় রেখে। আজকের সহিংসতা বাইরের কোন দেশের সাথে নয়, আমাদের নিজেদের সংসারের মধ্যে। নিজের সংসারের সমস্যা যদি নিজেরা সমাধান করতে না পারি তবে স্বীকার করতে হবে সে সংসার (দেশ) চালানোর মত যোগ্যতা আমাদের নেই। দেশে যে সমস্যা বিদ্যমান তা সমাধানে প্রয়োজন শুধুমাত্র একটু সদিচ্ছা। অনেক সমস্যার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হল- তত্ত্বাবধায়ক ইস্যু, যুদ্ধাপরাধ বিচার ইস্যু আর অতিসামপ্রতিক ধর্ম অবমাননা ইস্যু। এ চারটা বিষয়ে সমাধানে আসতে পারলে আশাকরি দেশের চলমান সংকটময় পরিস্থিতির ব্যাপক উন্নতি হবে। দেশে আবার শান্তি ফিরে আসবে। দেশে চলমান সহিংসতা ভয়ংকর রূপ ধারণ করে যুদ্ধাপরাধীর রায়ের পর থেকে। বিতর্কিত রায়ের পক্ষে-বিপক্ষে মানুষের অবস্থান পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করে ফেলে। শুরু হয় সহিংস ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া। রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের কথাবার্তায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে-বিপক্ষে বিভাজন চলতে থাকে। দোটানায় পড়ে সাধারণ মানুষ। তারা চায় যুদ্ধাপরাধীর উপযুক্ত বিচার হোক। কিন্তু তারা দেখে যাদেরকে (বিরোধী দল) যুদ্ধাপরাধীর পক্ষের শক্তি বলা হচ্ছে তাদের মধ্যে অনেক মুক্তিযোদ্ধা এবং কিছু খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাও রয়েছে। আবার তারা শোনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির মধ্যে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজাকারও আছে! যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ নামে নতুন সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটে যেখানে সাধারণ জনতার ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ অহিংস আন্দোলন নামে পরিচিতি লাভ পাওয়ার আগেই দলীয় প্রভাবে তারা সহিংস মনোভাব প্রকাশ করে ফেলে। এদের কিছু কিছু লোক ধর্মের বিরুদ্ধে আপত্তিকর কথা বলায় ‘হেফাজতে ইসলাম’ নামের সংগঠনের আত্মপ্রকাশ হওয়ার সাথে সাথে দেশের সাধারণ মানুষ আস্তিক-নাস্তিক এর বলয়ে বিভক্ত হয়ে যায় এবং সংকট জটিল থেকে জটিলতর হতে থাকে। দু‘একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া হেফাজতের শান্তিপূর্ণ লংমার্চ ও মহাসমাবেশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ধন্যবাদ পেলেও অন্যদের মত তাদেরও কিছু ভুল ছিল। আসলে কেউ জেনে বা না জেনে ভুল বা অন্যায় করে ফেললে অন্যদের উচিত হচ্ছে সে ভুল সংশোধনের জন্য তাকে বোঝানো। যদি না বোঝে বা না মানে এবং ভুল অন্যায়ে রূপান্তরিত হয় তখন কেবল প্রতিক্রিয়া দেখানো যেতে পারে। ইসলাম এসেছে উত্তম আচরণের মাধ্যমে। ভুল হয়েছে গণজাগরণ মঞ্চেরও। কারণ তাদের ভাবা উচিত ছিল শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে অধিকাংশই ধর্মের প্রতি নিবেদিত প্রাণ। গণজাগরণের ভেতর যারা ধর্মের শত্রু তাদের নিবৃত করা ছিল গণজাগরণের প্রথম কাজ। নিবৃত না করে বরং ধর্মের বিরুদ্ধে কটূক্তি করায় সরকার যাদের গ্রেফতার করেছে তাদের মুক্তির জন্য সমাবেশ, মিছিল-মিটিং করায় গণজাগরণ মঞ্চ এখন মুসলমান ধর্মের লোকদের আস্থা হারাচ্ছে। কিছু দিন পর হয়ত অন্য ধর্মের লোকদেরও আস্থা হারাবে যদি ধর্মের অবমাননা চলতেই থাকে। কারণ যারা ধর্মের শত্রু তারা সব ধর্মেরই শত্রু। আজ ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করছে কাল অন্য ধর্ম নিয়ে করবে। সবচেয়ে মারাত্মক ভুল করেছে সরকার গণজাগরণে দলীয় প্রভাব বিস্তার করতে যেয়ে এবং ধর্মের অবমাননাকারীদের তথ্য ফাঁস হওয়ার সাথে সাথে ব্যবস্থা না নিয়ে। আগেই যদি ব্যবস্থা নেয়া হত তবে আস্থা হারানোর আগেই গণজাগরণ মঞ্চ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে ইতিবাচক মনোভাব তৈরী করতে সক্ষম হত। ভুল যা হওয়ার হয়েছে, দেশের অনেক ক্ষতি হয়েছে। চলমান সহিংস পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেতে এখনই আলোচনায় বসতে হবে। সমস্যাগুলো এক এক করে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। বিতর্কের উর্ধ্বে থেকে প্রকৃত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতেই হবে। কেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার নয়? তত্ত্বাবধায়কের আয়োজনে ভোট দেবে জনগণ। গত পাঁচ বছরে সরকার যদি জনগণের আস্থা অর্জন করে থাকে তবে জনগণ আবারও তাদেরকেই নির্বাচিত করবে। আস্থা যদি অর্জন করতে না পারে তবে জনগণ ভোট দেবে না। তাহলে ভয়টা কি আসলে তত্ত্বাবধায়কের না কি জনগণের আস্থা অর্জন না করার? গণজাগরণ ও হেফজতের দাবিগুলো বিচার বিশ্লেষণ করে ব্যবস্থা নিতে হবে। এ সবই করতে হবে ঠাণ্ডা মাথায় ও অহিংস মনোভাবে ব্যক্তিস্বার্থের উর্ধ্বে থেকে দেশ ও মানুষের স্বার্থে। এক্ষেত্রে মিডিয়ার নিরপেক্ষ ভূমিকা ব্যাপক অবদান রাখবে। কোন ঘটনা প্রকাশ করতে উভয় পক্ষেরই মতামত প্রকাশ করা উচিত। কিন্তু অনেক মিডিয়া সেটা করে না বা আংশিক করে। ফলে প্রকৃত ঘটনা না জানার কারণে সমস্যা আরও ঘনিভুত হয়, অহিংস মানুষগুলোর মাঝে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। আমরা যদি সবাই সহিংসতা পরিহার করে অহিংস মনোভাব নিয়ে আলোচনার পথ খোলা রাখি তবে চলমান সমস্যা অচিরেই দূর হবে। লেখক :রাজনৈতিক বিশ্লেষক E-mail: [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন