৫ ও ৬ এপ্রিল সরকার দলের কথিত হরতালের পর ৮ এপ্রিল হরতালের ডাক দেয় হেফাজতে ইসলাম; এরপর ৯, ১০ এপ্রিল টানা ৩৬ ঘণ্টা হরতালের কর্মসূচি দেয় বিএনপিসহ ১৮ দল। ১১ এপ্রিল দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডাকে ইসলামী ছাত্রশিবির। বিরোধী দলের হরতাল আর সরকার সমর্থিত হরতালে এখন টালমাটাল দেশ। বিরোধী দলই কেবল হরতাল দিচ্ছে না, এক্ষেত্রে মাঝে- মধ্যে সরকারি দলও কম যাচ্ছে কৈ? এদেশে হরতালকে এখন যে যার মতো যথেচ্ছ ব্যবহার করছে। হরতালের রীতিমত অপব্যবহার শুরু হয়েছে। কথায় কথায়, কারণে-অকারণে হরতাল দেয়া হচ্ছে। নিজেদের স্বার্থে, দলের স্বার্থে হরতাল ব্যবহার হচ্ছে; দেশের স্বার্থে নয়।
প্রকৃতই দেশের পিছু নিয়েছে হরতাল। দেশের স্বার্থে আমাদের রাজনীতিবিদদের হরতালের বিকল্প খুঁজতে হবে। কাউকে না কাউকে ছাড় দিতেই হবে। প্রধানমন্ত্রী নয় তো বিরোধীদলীয় নেত্রীর ছাড়ে দেশবাসী অন্তত রক্ষা পাবেন। আর যিনিই ছাড় দেবেন, তিনি দেশবাসীর কাছে নন্দিত হয়ে থাকবেন। যেভাবে হরতাল শুরু হয়েছে; সামনে আরও হবে; লাগাতার হরতালেরও হুমকি আছে, ঠাকুরগাঁওয়ে শুরুও হয়েছে, তাতে করে দেশের অর্থনীতির কি হবে তাই নিয়ে উদবিগ্ন দেশের আমজনতা। মাত্র ক’দিনের হরতালেই ব্যবসায়ীদের এখন ত্রাহিমধুসূদন অবস্থা। একটি হরতাল সেদিনেরই ক্ষতি করে না। হরতালের লেগে থাকা বিষ্ঠা সপ্তাহ, মাস, বছর ধরে দেশবাসীকে চরম ভোগান্তিতে ফেলে। মরণ ব্যাধি ক্যান্সারের মতো দেশকে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে নিয়ে যায়। অর্থনীতির বারটা বাজিয়ে ছাড়ে। বরাবরই আমরা যা দেখছি তা হলো রাজনৈতিক দলগুলো হরতাল দেয় ঐ একই উদ্দেশ্যে। ক্ষমতার লিপ্সা আর উচ্চ মসনদে আটঘাট করে বসতেই হরতাল দেয় রাজনৈতিক দলগুলো। সেই স্বাধীনতার পর থেকেই তা আমরা প্রত্যক্ষ করে আসছি। এবারও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। কোন দলের ক্ষেত্রেই তার ব্যতিক্রম হয়ও না।
ফি বছর ধরেই আমরা যা দেখছি কি বিএনপি, কি আওয়ামী লীগ সবাই মসনদ প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষায় জনস্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে একের পর এক এ ধরনের ঘাতক কর্মসূচি গ্রহণ করে । এরা সবাই ক্ষমতার বাইরে থাকলে হরতালপ্রীতি আর ক্ষমতায় থাকলে হরতালবিরোধী ভূমিকায় থাকে। সব সময়ই তাই হচ্ছে। এমন আচরণ অন্তত দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে দেশবাসী কখনোই আশা করে না। এখানে দেশবাসীর আশা করা না করায় এদের আসে যায় না। তাই স্বস্বার্থে যা করার তাই করে দলগুলো। বিগত সরকারের সময় বিএনপি ক্ষমতায় গেলে তারা আর হরতাল দেবে না; হরতালে এই হয়, ঐ হয়, হরতাল দেশকে পঙ্গু করে দেয় এমন বক্তৃতা-বিবৃতি দেশবাসী অনেক শুনেছে। আজ তাদের কাছে হরতাল অধিকার, হরতাল দেশবাসীর কল্যাণ বয়ে আনবে এমন বক্তব্য শুনছি আমরা। আওয়ামী লীগ যখন বিরোধী দলে তখন একই বিবৃতি তাদের মুখেও শুনেছে দেশবাসী। তারাও বলেছিল হরতাল অধিকার আদায়ের সর্বোত্কৃষ্ট পন্থা। রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় থাকলে এক ধরনের বিবৃতি আর ক্ষমতায় না থাকলে তাদের মুখেই শুনি অন্য বুলি । এমনটা দেশবাসী আর শুনতে চায় না। তারা চায় হরতাল নামক ভূতের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে। মসনদের কাড়াকাড়িতে হরতাল যেন আর কোন দলেরই হাতিয়ার হতে না পারে এজন্য তারা চায় এর সুষ্ঠু সমাধান। দেশবাসী, ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ এদের সবারই একটাই দাবি হরতাল থেকে দেশ ফিরে আসুক। সুদিন ফিরে আসুক দেশে। সব্বারই কথা হরতাল দিয়ে আর দেশকে পঙ্গু করা যাবে না। রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের অধিকার আদায়ে বিকল্প পথ খুঁজে বের করতেই হবে। হরতালকে না বলতে হবে । হরতালের বিরুদ্ধ অবস্থান করতে হবে সরকারি দল এবং বিরোধী দলগুলোকে। অধিকার আদায়ের আরো অনেক পন্থা আছে। সে পথেই হাঁটতে হবে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোকে। প্রয়োজনে শক্ত আইন প্রণয়ন করে দেশ বাঁচানোর স্বার্থে তা তাদের করতেই হবে।
আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো দু’পক্ষই সরকারে থাকলে একরকম আচরণ করেন, সরকারের বাইরে গেলে তারা করেন বিপরীত আচরণ । সরকারে থাকলে তারা হরতালের বিরুদ্ধে থাকেন। তখন তারা বুঝতে পারেন যে, হরতালে দেশের ক্ষতি হয়, প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। বিরোধী দলকে এসব বিষয়ে জ্ঞানদান করতে থাকেন। তারা এর পরে বিরোধী দলে গেলেও আর হরতাল ডাকবেন না, এ মর্মে প্রতিশ্রুতিও দিতে থাকেন। সে প্রতিশ্রুতি কখনো পালিত হয় না। কেউ কথা রাখেন না। প্রকৃতপক্ষে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলই গত দু’দশক ধরে তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসাবে হরতালকে ব্যবহার করে আসছে। হরতাল যে বিরোধিতার কোন শক্তিশালী রাজনৈতিক হাতিয়ার হতে পারে না, বরং বরাবরই সেটা দেশ-জনতার দুর্ভোগের কারণ হয়ে দেখা দেয়। এটি এদেশের রাজনৈতিক দলগুলো আর কতকাল পরে উপলব্ধি করবে? সত্য উপলব্ধির কি এখনই প্রকৃত সময় নয়?
রাজনীতিবিদদের অবশ্যই হরতালের বিকল্প খুঁজতে হবে। এখন রাজনৈতিক মতবাদ প্রচার বা দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য অন্য অনেক মাধ্যম সবার আয়ত্তের মধ্যে চলে এসেছে। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে হরতালের আর প্রয়োজন নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, হরতাল বা কোন বিষয়ে প্রতিবাদ জানাতে আমাদের রাজনৈতিক কর্মীরা, বিশেষ করে ছাত্ররা এভাবে গাড়ি ভাংচুর করবে কেন? কার গাড়ি? কে ভাংগে? কেন ভাংগে? জনমুখী আন্দোলনের অন্যতম অস্ত্র (?) হিসেবে হরতালকে যেদিন থেকে এদেশের রাজনীতিকরা গুরুত্ব দিয়েছেন, সেদিন থেকেই সর্বনাশের শুরু। সর্বনাশের আগের ধাপ কর্মনাশ। হরতালের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অব্যাহত রাখার মতো সাহস মানুষের আর নেই। এখন তো বোঝার সাধ্য নেই কে হরতাল ডেকেছে। শাসক দল নাকি বিরোধী দল? সরকার এবং বিরোধী দলগুলো বিধ্বস্ত-আতঙ্কিত মানুষের অভিব্যক্তিকেই হরতালে ‘সাফল্য’ ‘ব্যর্থতা’ বলে সগর্বে প্রচার করে। হরতাল এখন দেশের জনজীবনে পথসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশ এগিয়ে বা পিছিয়ে যাক, হরতাল তার সঙ্গে সঙ্গে আছে। তাই হরতাল ও অনৈতিক আন্দোলন পরিহার করতে হবে। গণতন্ত্রে সুস্থ রাজনীতির বিকল্প নেই। তাই আসুন আমরা হরতাল থেকে বেরিয়ে আসি। বিরোধী দলে থাকাকালীন সময় “হরতাল করব না” আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর জনগণকে দেয়া এমন ওয়াদা রক্ষা করবেন এটাই আমাদের সকলের প্রত্যাশা।
লেখক : সাংবাদিক
