সম্প্রীতি ও শান্তির আলোয় উদ্ভাসিত হউক দেশ

আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০১৩, ২২:২৫
আজ পহেলা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন। বাঙালির জীবনে এই দিনটির গুরুত্ব ও তাত্পর্য কতো ব্যাপক তাহা অনুধাবন করিবার জন্য এই তথ্যটিই যথেষ্ট যে, গত পাঁচশতাধিক বত্সর যাবত্ দিবসটি নববর্ষ হিসাবে উদযাপিত হইয়া আসিতেছে। এই সুদীর্ঘ সময়ে বহুবার শাসক বদলাইয়াছে। বদলাইয়াছে মানচিত্রও। এমনকী বিশ্বায়নের প্রভাবে অর্থনীতির ক্ষেত্রেও ঘটিয়া গিয়াছে ব্যাপক ওলটপালট। কিন্তু কোনো পরিবর্তনই বাঙালির এই উত্সবের উজ্জ্বলতাকে এতোটুকু ম্লান করিতে পারে নাই। বরং গ্রামীণ কৃষি- অর্থনীতিকে কেন্দ্র করিয়া এই উত্সবের সূচনা হইলেও তাহা এখন নগরবাসীর চিত্তেও স্থায়ী আসন গাড়িয়া বসিয়াছে। বাংলা নববর্ষের এই সর্বব্যাপী প্রভাবের প্রধান কারণ দুইটি। প্রথমত, আবহমান বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে ইহার শিকড় ছড়াইয়া আছে বাঙালি সমাজমানসের অনেক গভীরে। দ্বিতীয়ত, ধর্ম ও রাজনৈতিক সীমানানির্বিশেষে ইহাই বাঙালির একমাত্র সর্বজনীন উত্সব। ফলে যুগ যুগ ধরিয়া প্রধানত খ্রিস্টাব্দ বা ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী আমাদের যাবতীয় কার্যাদি সমাধা হইলেও বাংলা নববর্ষের প্রতি সকল বাঙালিই গভীরতর এক প্রাণের টান অনুভব করিয়া থাকেন। বাংলাপিডিয়ায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মূলত মুগল সম্রাট আকবরের শাসনামলেই বাংলা নববর্ষ উদযাপনের সূচনা হয়। কৃষিকাজের সুবিধার্থে তিনি ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০/১১ই মার্চ বাংলা সন প্রবর্তন করেন। ইহার ভিত্তি ছিল হিজরি চান্দ্রসন ও বাংলা সৌরসন। নূতন এই সনটি প্রথমে ‘ফসলি সন’ নামে পরিচিত ছিল, পরে তাহা বঙ্গাব্দ নামে পরিচিত হয়। মুগল শাসকরা দীর্ঘদিন পহেলা বৈশাখ পালন করিয়াছেন। সেই সময়ে বাংলার কৃষকরা চৈত্রমাসের শেষদিন পর্যন্ত জমিদার, তালুকদার এবং অন্যান্য ভূস্বামীদের খাজনা পরিশোধ করিতেন। পরদিন নববর্ষে জমিদার-ভূস্বামীরা তাহাদের মিষ্টিমুখ করাইতেন। নববর্ষের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ও উত্সবমুখর অর্থনৈতিক আয়োজন ছিল হালখাতা। গ্রামে-গঞ্জে ও নগরে ব্যবসায়ীরা নববর্ষের প্রারম্ভে পুরনো হিসাবনিকাশ সম্পন্ন করিয়া হিসাবের নূতন খাতা খুলিতেন। এই উপলক্ষে তাহারা পুরনো খদ্দেরদের আমন্ত্রণ জানাইয়া মিষ্টিমুখ করাইতেন এবং নূতন করিয়া তাহাদের সাথে ব্যবসায়িক যোগসূত্র স্থাপন করিতেন। এইসব উত্সবের অংশ হিসাবে গ্রামে-গঞ্জে মেলা বসিত। এইসব মেলার প্রধান দুইটি আকর্ষণ ছিল লোকজ পণ্যসম্ভার এবং লোকজ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বর্ণাঢ্য উপস্থাপনা। প্রশ্ন উঠিতে পারে যে, শত শত বত্সর ধরিয়া বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ যে সর্বস্তরের মানুষকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করিয়া চলিয়াছে তাহার মূল শক্তিটা কোথায়? ইহার উত্তরে নির্দ্বিধায় বলা যায় যে ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশ শান্তি, সমপ্রীতি ও সহিষ্ণুতার দেশ। পহেলা বৈশাখের মূলবার্তাও তাহাই। শান্তি ও অগ্রগতির পূর্বশর্ত হইল সৌহার্দ, সমপ্রীতি ও ঐক্য। পহেলা বৈশাখ বরাবরই বাঙালি জীবনে এই মিলনের ও সমপ্রীতির বার্তা বহন করিয়া আনিয়াছে। এইবারও ব্যতিক্রম নহে। তবে এইবারের বাস্তবতা ভিন্ন। সর্বত্রই অনৈক্য ও অসহিষ্ণুতার দাপট প্রবল হইয়া উঠিয়াছে। ফলে শুধু যে শান্তি ও অগ্রগতিই ব্যাহত হইতেছে তাহা নহে, দেখা দিয়াছে আরও গুরুতর বিপর্যয়ের আশঙ্কাও। ফলে আমাদের জাতীয় জীবনে এইবারের নববর্ষের গুরুত্ব ও তাত্পর্য আরও বেশি। এই কঠিন সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে একাত্ম হইয়া আমরাও কায়মনোবাক্যে কামনা করি: ‘মুছে যাক গ্লানি ঘুচে যাক জরা/অগ্নিস্নানে শুচি হউক ধরা’। নববর্ষের চেতনায় সৌহার্দ, সম্প্রীতি ও শান্তির আলোয় উদ্ভাসিত হউক দেশ। নববর্ষের শুভেচ্ছা সকলের প্রতি।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন