আধুনিক গণতান্ত্রিক বিশ্বে একটি দেশ বা রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নয়ন, অগ্রগতি ও শান্তি-শৃঙ্খলানির্ভর করে জাতির দেশপ্রেম ও জাতীয় ঐক্যের উপর। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ব্রিটেন-ভারতসহ সব দেশেই এর দৃষ্টান্ত রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে অনৈক্যের বড় কারণ হল আইনের শাসনের অভাব। আইন সকলের প্রতি সমানভাবে ব্যবহূত হলে ছোটখাট ভেদাভেদ এমনিতেই দূর হয়ে যায়। শাসকদের অন্যায়-অত্যাচার ও অবিচারের কারণেই সমাজ ও রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা ও অনৈক্য দেখা যায়।
জাতীয় বৃহত্তর অঙ্গনে বর্তমানে আমরা কি দেখছি? দলের চেয়ে ব্যক্তি বড় আর দেশের চেয়ে দল বড়। দেশ ও জাতির স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তি ও দলের স্বার্থই ঊর্ধ্বে। দেশের সকল রাজনৈতিক দল যদি সত্যিকার অর্থে দেশপ্রেমিক ও জনদরদী হন, গণমানুষের সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি চান, তবে এত বিভক্তি, অনৈক্য ও দ্বন্দ্ব-সংঘাত থাকে না। রাজনীতি এত হিংস্র, ভয়াবহ, কুটিল ও দুর্বৃত্তায়িত হয়ে উঠে না। সন্ত্রাসনির্ভর রাজনীতি ক্ষমতার অন্ধ মোহে হাবুডুবু খায় না।
প্রকৃত অর্থে দেশপ্রেম ও জাতীয় ঐক্যের জন্য প্রয়োজন জাতীয় ঐকমত্য। বাঙালি জাতীয়তাবাদ, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, মুজিববাদ, জিয়াবাদ সবকিছুর ঊর্ধ্বে নিঃশর্ত দেশপ্রেমে উদ্ধুদ্ধ হয়ে জাতীয় সার্বিক উন্নতিকল্পে জাতীয় ঐক্য কি গড়ে তোলা যায় না? ক্ষমতার কাড়াকাড়ি না করে সবাই মিলেমিশে ক্ষমতার সার্বজনীনিকরণ কি করা যায় না? তবে তো হিংসা, অবিশ্বাস, দ্বন্দ্ব-সংঘাত দূর হতে পারে। তাহলে তো নির্বাচনী ইস্যু নিয়েও মাতামাতি থাকে না। সর্বশক্তি ও কৌশলে পরস্পরকে ঘায়েল করার প্রতিযোগিতার অবসান হয়। সব ইস্যু বাদ দিয়ে দেশ গড়ার একটাই ইস্যু নিয়ে জনগণের কাছে গিয়ে রায় পাওয়ার নির্ভেজাল গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতাই প্রাধান্য পায়। এভাবে রাজনীতি নির্ভেজাল হবে, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজিমুক্ত হবে, জনগণ গণতান্ত্রিক অধিকার ভোগ করবে। দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা নিরাপত্তাসহ সার্বিক সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পেতে থাকবে। এ ইস্যু, সে ইস্যু, সকল ইস্যুর ঊর্ধ্বে দেশপ্রেম ও জাতীয় ঐক্যকে স্থান দিলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠিত হবে। কোন অনৈক্য ও বিভাজনই একটি স্বাধীন ও প্রগতিশীল দেশে কাম্য হতে পারে না।
প্রশ্ন আসতে পারে অনেক। কিন্তু দেশপ্রেম ও বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের ঊর্ধ্বে আমরা কোন প্রশ্নকেই স্থান দিতে চাই না। কোন চেতনার দোহাই দিয়ে দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা ও উন্নতি আসবে না- গত ৪২ বছরে তা প্রমাণিত হয়ে গেছে। দেশপ্রেম ও জাতীয় ঐক্যই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করবে। দেশকে শান্তি ও সমৃদ্ধির আবাসস্থল হিসেবে গড়ে তুলবে। দেশ ও জাতির আজ বড় প্রয়োজন ঐক্য, শান্তি, শৃঙ্খলা ও উন্নয়ন। এ চেতনা বিরোধী কোন চেতনা বা মতাদর্শ দিয়ে কোন লাভ হবে না। দেশ নৈরাজ্যের দিকে যাবে।
দলবাজি, বিদেশি তাঁবেদারি, জাতির সাথে বেঈমানি, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, স্বার্থ সিদ্ধির পলিটিক্যাল সিন্ডিকেট বন্ধ করা দরকার। রাজনীতিকে ব্যবসায়িক স্বার্থ সিদ্ধির হাতিয়ার বানানো চলবে না। সত্ ও যোগ্য শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী এবং সত্ রাজনীতিকদের মনোনয়ন দিয়ে এমপি নির্বাচিত করতে হবে। সন্ত্রাসী ও দুর্নীতিবাজদের প্রত্যাখ্যান করতে হবে।
মার্কিন ডেমোক্রেট ও রিপাবলিকান- জাতীয় এ দু’দলই দেশপ্রেম ও জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নে অভিন্ন। যা সাম্প্রতিক নির্বাচনে ওবামা ও মিট রমনির সংঘাতবিহীন শান্তিপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ও জাতীয় স্বার্থে এক দেখা গেছে। তাহলে বাংলাদেশ কেন পারবে না? কেন রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের এ উত্তরাধিকার। কেন অনৈক্য ও বিশৃঙ্খলা? ভারতীয় কংগ্রেস, বিজেপি, তৃণমূল— তারাও জাতীয় স্বার্থ ও ঐক্যবিরোধী বিচ্ছিন্ন রাজনীতিতে লিপ্ত নয়। গণতন্ত্র, দেশপ্রেম ও জাতীয় ঐক্য তাদের অভিন্ন রাজনৈতিক ও জাতীয় দর্শনে পরিচালিত করে। আমাদের রাজনৈতিক দর্শন ও মতাদর্শকে জাতীয় দর্শন ও মতাদর্শের সাথে একীভূত করতে না পারলে স্বচ্ছ ও দেশপ্রেমের রাজনীতি গড়ে উঠবে না। অনৈক্য, সংঘাত ও গণস্বার্থহানিকর চিন্তা ও কর্মসূচির অবসান হবে না।
চলমান রাজনৈতিক সংকট উত্তরণে নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় ঐকমত্যের সরকার গঠনের উদ্যোগ নেয়া আবশ্যক। সর্বদলীয় সংলাপের মাধ্যমে সর্বদলীয় সরকার গঠনের মূলনীতি ঠিক করা এবং দলীয় কোটা পদ্ধতিতে নির্বাচনী আসন ভাগ করা দরকার। জনসমর্থনের ভিত্তিতে দলগুলোর মাঝে আসন বণ্টন করতে হবে। দেশ ও জাতির মঙ্গল চাইলে যে কোন ফর্মুলায় সর্বদলীয় সরকার গঠনের উদ্যোগ নেয়া যায়। এর প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধন করা যায়। জাতি আর কোন ওয়ান- ইলেভেন বা সামরিক-আধা সামরিক সরকার দেখতে চায় না। চায় দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে দেশ গড়ার অঙ্গীকারে সর্বদলীয় সরকার। নির্বাচনে প্রাপ্ত আসন সংখ্যার ভিত্তিতে দলগুলোর মাঝে মন্ত্রীত্বসহ ক্ষমতা ভাগাভাগির মাধ্যমে সর্বদলীয় সরকারের রূপরেখা প্রস্তুত করা যায়। নির্বাচন নিয়ে, সরকার গঠন নিয়ে কোন ঝুট-ঝামেলাই থাকবে না। তবে সকল নিশ্চয়তার পূর্বশর্ত হচ্ছে গণতন্ত্রের প্রতি আনুগত্য এবং নিঃশর্ত দেশপ্রেম ও জাতীয় ঐক্য।
লেখক : শিক্ষক ও সাংবাদিক
