গত শুক্রবার সারা দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের কোন প্রমাণ পাওয়া যায় নাই। তবে প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুজব ছড়াইয়া ও বিভিন্ন জেলায় ভুয়া প্রশ্নপত্র বিক্রি করিয়া একটি চক্র ঠিকই বড় অঙ্কের অর্থ হাতাইয়া নিয়াছে। অবশ্য ভুয়া প্রশ্নপত্র ক্রয়-বিক্রয় এবং পরীক্ষায় জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে অনেককে গ্রেফতারও করা হয়।
বাংলাদেশে বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ও বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস বা ক্রয়-বিক্রয়ের অভিযোগ একেবারে নূতন নহে। এরকম অনিয়ম অতীতেও ছিল, বর্তমানেও আছে। তবে ব্যাপকতা ও মাত্রাগত ব্যবধান আছে মাত্র। গত কয়েক বত্সরে বিসিএস-সহ মেডিকেল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পাইয়াছে। অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক তথা নন-ক্যাডারভুক্ত চাকুরির পরীক্ষায়ও অহরহ প্রশ্নপত্র ফাঁসের উদাহরণ রহিয়াছে। এক সময় এরকম ন্যক্কারজনক কর্মকান্ডের সহিত জড়িত থাকার অভিযোগে বিজি প্রেসের কয়েকজন কর্মচারীকে গ্রেফতারও করা হয়। কিন্তু তাহাতে জালিয়াত চক্র দমিয়া গিয়াছে বলিয়া মনে হয় না। শুধু সরকারি পরীক্ষার ক্ষেত্রেই নহে, বেসরকারি স্কুল-কলেজের ভর্তি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পরীক্ষার বেলায়ও এই ধরনের গুরুতর অনিয়ম হইয়া থাকে। এই খারাপ প্রবণতা মেধার বিকাশ ও সুষ্ঠু প্রশাসন গড়িয়া তোলার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করিতেছে। অনেকে ‘দশচক্রে ভগবান ভূত’ হইয়া যাওয়ার ন্যায় আচরণও করিতেছেন ।
আমাদের সংবিধান অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের কাজকর্মে অংশগ্রহণে সকলের সমান সুযোগ রহিয়াছে। কিন্তু এই ধরনের দুর্নীতির পরিণতিতে বৈষম্যই মাথাচাড়া দিয়া ওঠে। যখন যেই সরকার ক্ষমতায় আসে, সেই সরকার দলীয় লোকজন সবখানে প্রবেশের চেষ্টা চালান। তাহারা যদি মেধা ও যোগ্যতার গুণে কোন চাকুরিতে নিয়োগপ্রাপ্ত হন, তাহাতে কাহারও আপত্তি থাকে না। কেননা দল করিলেই তাহাকে নিয়োগ দেওয়া যাইবে না এমন কথা আমরা ভাবিতে পারি না। কিন্তু নিয়ম-কানুন লংঘন করিয়া সর্বোপরি ক্ষমতার দাপট দেখাইয়া ও আগাম প্রশ্নপত্র পাইয়া যদি কেহ কোন প্রকার সুযোগ লাভ করেন, তাহা হইলে তাহা অবশ্যই আপত্তিকর। ইহাতে মেধাবী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীরা হতাশাগ্রস্ত হন এবং তাহাদের লেখাপড়ায় ইহার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ইদানিংকালে ভাল স্কুল-কলেজে ভর্তি ও বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার দাওয়াই হিসাবে দেশের আনাচে কানাচে গড়িয়া উঠিয়াছে অসংখ্য কোচিং প্রতিষ্ঠান। তাহাদের আয়-ইনকাম ভাল। কিন্তু অনেক সময় এমন অভিযোগও পাওয়া যায় যে, এসব কোচিং সেন্টারের সহিত যাহারা জড়িত, তাহাদের কেহ কেহ বিরাট অর্থের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার সঙ্গে জড়িত। কোন কোন ক্ষেত্রে এই অবৈধ ব্যবসা অনেকটাই রমরমা। যদি শিক্ষার্থীরা অঢেল অর্থকড়ি দিয়া সেইসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়, তাহা হইলে তাহাদের উত্তীর্ণ করাইতে এক প্রকার বাধ্যবাধকতাও তৈরি হয় বৈকি। আর ইহার হাত ধরিয়াই এই ধরনের অবৈধ বাণিজ্য পথ করিয়া নেয়।
হালে তথ্য-প্রযুক্তির যথেষ্ট অগ্রগতি হইয়াছে। ফলে জালিয়াত চক্র সহজে ইহারও সুযোগ গ্রহণ করিতেছে। গত শুক্রবারের প্রাথমিক নিয়োগ পরীক্ষায় জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগে যাহাদেরকে গ্রেফতার করা হইয়াছে তাহাদের একাংশ ‘স্পাই ব্লু-টুথ ইয়ারফোন’-এর মাধমে পরীক্ষার হল হইতে প্রশ্নপত্র আউট করার কথা স্বীকার করিয়াছে। ইহা হাতঘড়ির ন্যায় একটি মোবাইল ফোন। এই প্রক্রিয়ায় পরীক্ষা শুরুর পরপরই একদল প্রশিক্ষিত পরীক্ষার্থী প্রশ্নপত্র বাহিরের লোকজনকে বলিয়া দেয়। সেখানে একটি মেধাবী ও চৌকস টিম তত্ক্ষণাত্ উত্তরপত্র তৈরি করিয়া সরবরাহ করে। পরে মোবাইল ম্যাসেজের মাধ্যমে অন্যত্রও ছড়াইয়া পড়ে দ্রুত। এই ধরনের অভিনব পদ্ধতিতে জালিয়াতি কিভাবে বন্ধ করা যায়, তাহা নিয়া এখন নূতন করিয়া ভাবিতে হইবে। এইজন্য পরীক্ষার হলে সব রকম মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করিতে হইবে। ভর্তি ও নিয়োগ পরীক্ষা স্বচ্ছ ও স্বাভাবিক করিতে আমাদের করণীয় সবকিছুই করিতে হইবে, নতুবা জাতি ও দেশ গঠনে সংকট থাকিয়াই যাইবে।
