মিয়ানমারে বেশ কিছুদিন ধরিয়া যে মুসলিম নিধন চলিতেছে উহাতে যুগপত্ বিচলিত ও বিস্মিত না হইয়া পারা যায় না। সংখ্যালঘু মুসলমানদের উপর বৌদ্ধ ভিক্ষুরা সম্প্রতি যে নৃশংসতা চালাইয়াছে এবং এখনও চালাইতেছে উহা নিন্দনীয়। কেননা মানবতার প্রতি ইহা এক নিষ্ঠুর অবজ্ঞা ও অবমাননা বিশেষ। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে প্রকাশ, মিয়ানমারের মধ্যাঞ্চলীয় এক শহরে গত বৃহস্পতিবার মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যে ২৫ জন মুসলমানকে দাঙ্গাবাজ বৌদ্ধরা হত্যা করিয়াছে। নিহতদের মধ্যে দশ বত্সরেরও কম বয়সী দুইটি শিশুও ছিল। হত্যার পর হতভাগা মুসলমানদের লাশ পোড়াইয়া দেওয়া হয় অথবা পার্শবর্তী ডোবায় ফেলিয়া দেওয়া হয়। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ মিয়ানমারে এখন এমন এক উদগ্র রূপ পরিগ্রহ করিয়াছে যে, দেশটির গণতন্ত্রে রূপান্তর প্রক্রিয়া আজ মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন বলিয়া অনেকে মনে করেন।
রয়টার্সের খবরটিতে আরও বলা হইয়াছে যে, রাজধানী হইতে ১৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত লক্ষাধিক বাসিন্দা অধ্যুষিত এক শহরে মাত্র ৪দিনে বৌদ্ধরা ৪৩ জনকে হত্যা করে এবং দাঙ্গাবাজেরা শহরটির প্রায় ১৩ হাজার মুসলমান বাসিন্দাকে তাহাদের বাসস্থান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসমূহ হইতে উচ্ছেদ করিয়াছে। এই দাঙ্গা পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলিতেও ছড়াইয়া পড়ায় দাঙ্গাবাজরা প্রায় ১৪টি গ্রামে মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপর হামলা চালাইয়া তাহাদের বাস্তুচ্যুত করে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, এই সব হামলার নেতৃত্ব দিয়াছে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা। বৌদ্ধ ধর্মের মূল বাণী, সুর এবং তাগিদ যেখানে অহিংসা সেখানে ভিক্ষুদেরকে হিংসায় উন্মত্ত হইতে দেখিলে উহাতে উদ্বিগ্ন ও বিচলিত বোধ না করিয়া পারা যায় না। ধর্মকে কেন্দ্র করিয়া বিদ্বেষ, হানাহানি ও হিংসার ঘটনা ইতিহাসের পাতায় পাতায় দেখিতে পাওয়া যায়। কিন্তু সার্বিক বিচার-বিশ্লেষণে প্রমাণ হইবে যে, সকল ধর্মই শান্তি ও মানবিক বোধে উচ্চকিত। শান্তি এবং মানবতা প্রতিষ্ঠাই ধর্মের উদ্দেশ্য। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে ধর্ম লইয়া বাড়াবাড়ি করিতে গিয়া কিংবা নিতান্তই হীন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করিতে যাইয়া অনেক ধরনের মানব বিপর্যয় ঘটানো হয় আর উহার শিকার হয় প্রধানত সংখ্যালঘুরা।
বৌদ্ধ নাথেরা যেখানে ‘নগর বহিরি ডোম্বী তোহরি কুড়িয়া/ছোঁই ছোঁই যাওসি বাহ্মণ নাড়িয়া’, জাতীয় শ্লোকের আড়ালে মানবাত্মার উন্নত মহিমারই জয়গান গাহিয়াছেন সেখানে আজ যখন মানবতাকে পদদলিত করিয়া কেহ কেহ বৌদ্ধ ধর্মের অহিংস নীতিকে কালিমালিপ্ত করিবার প্রয়াস পায় তখন অন্যরা উহাতে হতাশ হইবে ও দুঃখ পাইবে বৈ কি! মিয়ানমার দীর্ঘদিন সেনা শাসনাধীনে ছিল। ফলে গণতন্ত্রের চর্চা বা অনুশীলন সেখানে হইতে পারে নাই। আর সেনা শাসনাধীনে থাকার কারণে সেখানকার জনগোষ্ঠীর এক বৃহত্ অংশের মনমানস ও চিন্তা-চেতনার মধ্যে এক প্রকার রুক্ষতা কিংবা সহনশীলতার অভাব থাকাটা অস্বাভাবিক নহে। কিন্তু তাহা সত্ত্বেও সম্প্রদায়গত দাঙ্গা-ফ্যাসাদ বাধাইয়া দেশে অশান্তি সৃষ্টি নিশ্চয়ই সেখানে কাহারও কাম্য নহে। মিয়ানমারে বসবাসরত বাঙালি মুসলমান সম্প্রদায়ের প্রতি এক প্রকার বিদ্বেষ সেখানকার বৌদ্ধদের মধ্যে মাঝেমধ্যেই প্রবল ও নিষ্ঠুর রূপ লইয়া থাকে এবং সে কারণেই রোহিঙ্গা সমস্যার মতো অমানবিক সমস্যা সৃষ্টি হয় এবং ইহাতে প্রতিবেশী দেশগুলির নিরাপত্তাও অনেক সময় হুমকির সম্মুখীন হইয়া পড়ে। মিয়ানমারের নোবেল লরিয়েট ও সর্বজনমান্য বিরোধী নেত্রী আং সং সুচী এই মানব বিপর্যয়ে অনেকটা নীরব ভূমিকা পালন করায় অনেকেই পীড়িত বোধ না করিয়া পারে না। মধ্যযুগে আরাকানের রাজসভায় বাঙলা ভাষা ও সাহিত্য যে রূপ পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করিয়াছে উহা সন্দেহাতীতভাবে মিয়ানমারের ভাবমূর্তিকেও উজ্জ্বল করিয়াছে নিশ্চয়ই। কিন্তু নিছক গোষ্ঠীস্বার্থে মুসলমান নিধন বা তাহাদের উত্সাদন কোন সভ্য সমাজের নীতি হইতে পারে না। বিশেষত:ধর্ম প্রচারকদের দ্বারা ভিন্নধর্মীরা নিগৃহীত হইলে উহা ঐ দেশ বা ধর্মগোষ্ঠীর জন্য যে গৌরববাহী হয় না এ কথা ইতিহাসের সকল যুগেই প্রমাণিত হইয়াছে।
