দেশের অবস্থা বারোটা বাজার মতো হয়ে উঠেছে। ভেতরের ও বাইরের বৈরী শক্তিগুলো রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ইত্যাদি সবদিক থেকে দেশকে ধ্বংস ও পতনের মুখে এনে দাঁড় করিয়েছে। দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনায় দেশবাসী আজ কাতর। কি হবে দেশের, তা নিয়ে তারা ভয়ে কম্পমান।
কিন্তু, দেশের ধ্বংস যদি রোধ করাও যায়, দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনা কি তাতে দূর হবে? কারণ, দেশটাতো বৃহত্তর ধরিত্রীর-ই একটি অংশ মাত্র। ধরিত্রীরই যদি ধ্বংস ও পতন ঘটে তবে দেশ রক্ষা হবে কি করে? অথচ সে ধ্বংস প্রক্রিয়া চোখের সামনে ঘটে চলেছে। সে বিষয়ে যতোটা দুশ্চিন্তা থাকা উচিশ, তার ক্ষমাহীন অভাব সব মহলেই রয়েছে বলে দেখা যায়।
পরিবেশ ও প্রকৃতির উপর মানব সমাজের অত্যাচার ইতোমধ্যে এমন এক পর্যায়ে এসেছে যে, তারা প্রতিশোধ নিতে শুরু করেছে। ‘উন্নয়ন’ ও ‘সভ্যতার অগ্রগতিকে’ নিছক এবং আরো আরো বেশি বৈষয়িক উত্পাদন বৃদ্ধির সাথে এমনভাবে সমার্থক করা হয়েছে যে, খোদ ধরিত্রীই এখন হুমকির মুখে পড়েছে। উন্নয়নের ‘ঠেলায়’ বাতাসে যে পরিমাণ কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস নির্গমন হচ্ছে, তা শোধন করার ক্ষমতা ধরিত্রীর বনাঞ্চলের নেই। একদিকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস নির্গমন ক্রমাগত বাড়ছে, আর অন্যদিকে ‘উন্নয়নের’ নামে বনাঞ্চল উজাড় হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ফলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে আরো বেশি পরিমাণে কার্বন-ডাই-অক্সাইড, মিথেন, ক্লোরোফ্লুরোকার্বনসহ আরো কিছু মারাত্মক ক্ষতিকর গ্যাস মজুত হয়ে গ্রীন হাউজ প্রভাব সৃষ্টি করেছে। ফলে সূর্যের তাপ যে পরিমাণে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করছে, তার সবটা বের হতে পারছে না। তাছাড়া এসব গ্যাসের প্রভাবে বায়ুমণ্ডলের বাইরের দিকে যে ওজোন গ্যাসের আবরণ আছে, তা ক্রমেই ক্ষয় হচ্ছে। উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরুর উপরিভাগের ওজোন আবরণে ইতোমধ্যে বড় ফাটল সৃষ্টি হয়ে তা ক্রমাগত প্রসারিত হচ্ছে। ওজোন আবরণের ফলে আগে যেভাবে পৃথিবীর বুকে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির আগমন বাধাগ্রস্ত হতো, এই ফাটলের ফলে তার প্রবেশ এখন সেই পরিমাণে আটকানো যাচ্ছে না।
কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি, ওজোন আবরণের ক্ষয়বৃদ্ধি ইত্যাদি কারণে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে। এই বৃদ্ধির গতিও একই সাথে বাড়ছে। ফলে বদলে যাচ্ছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য। বেড়ে যাচ্ছে সমুদ্রের পানির উত্তাপ। গলে যাচ্ছে পাহাড়ের মাথার বরফ, মেরু অঞ্চলের হিমপ্রবাহ। এসবের ফলে সমুদ্রের পানির স্তর উপরে উঠে আসতে শুরু করেছে। উচ্চতা বাড়তে বাড়তে উপকূল ধরে ক্রমান্বয়ে আরো ভেতরে প্রবেশ করতে থাকবে সমুদ্র ও সমুদ্রের নোনা পানি। জলোচ্ছ্বাসের প্রকোপ বাড়বে, প্লাবিত হতে থাকবে বিস্তৃীর্ণ অঞ্চল। সমুদ্রে তলিয়ে যাবে কোটি কোটি মানুষ ও জীবজন্তুর আবাসভূমি ও বনাঞ্চল। ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস উত্তাপ বাড়লেই বাংলাদেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভূমি সমুদ্রে তলিয়ে যাবে বলে অনেক গবেষক আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। পরিস্থিতির ক্রমাবনতি ঘটতে থাকবে চক্রাকারে। অনেকটাই আণবিক বোমার চেইন-রিএ্যাকশনের মতো। কিম্বা বোতল থেকে বেরিয়ে পড়া দৈত্যের মতো। একবার শুরু হলে বা বেরিয়ে পড়লে থামানোর কোনো সুযোগ নেই। অবধারিতভাবে চক্রাকারের গতিতে ধ্বংসের দিকে ধাবিত হতে থাকবে আমাদের চেনা-জানা ধরিত্রী।
বর্তমানে বিপর্যয় সৃষ্টির জন্য দায়ী কোন দেশ? প্রথমেই অঙ্গুলি নির্দেশ করতে হয় এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অপরাধী আমেরিকার দিকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৪% হলেও তার কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গমনের পরিমাণ ২৬%, মিথেনের ২০% এবং ক্লোরোফ্লুরোকার্বনের ২৫.৮%। মাথাপিছু নির্গমনের হিসাবে এই হার বিশ্বে সর্বোচ্চ। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দেশগুলোর চেয়ে এই হার অনেক বেশি। চীন, ভারত প্রভৃতি দেশের কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গমন বেশি, যদিও মাথাপিছু হিসাবে সেই পরিমাণ আমেরিকার তুলনায় অনেক কম। ২০০৩ সালে প্রদত্ত ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউটের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৯৫০ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত আমেরিকা যেখানে প্রায় ৫,১০০ কোটি টন কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গমন করেছে, সেখানে চীন ও ভারত মিলে (জনসংখ্যা বহুগুণ বেশি হওয়া সত্ত্বেও) এই সময়কালে মোট ১,৮০০ কোটি টন কার্বন-ডাই-অক্সাইড বাতাসে ছেড়েছে। এই পরিমাণ অবশ্য তার পরবর্তী ৬ বছরে আরো বৃদ্ধির দিকে রয়েছে। তবে একথা সন্দেহাতীতভাবে সত্য যে, অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত বিশ্বের গ্রীন হাউজ গ্যাসের সিংহভাগ উদ্গীরণ করেছে আমেরিকাসহ উন্নত দেশগুলো। আর বিশ্বের অধিকাংশ দেশ, যেগুলো অনুন্নত ও পশ্চাত্পদ, তারা এই বিপর্যয়ের জন্য সামান্যই দায়ী হওয়া সত্ত্বেও তাদেরকেই এর ফলে জানমালে সবচেয়ে বেশি মাশুল দিতে হচ্ছে।
এ কথা দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ধরিত্রীর যে মহাবিপদ আজ উপস্থিত সেজন্য আমেরিকাসহ তথাকথিত উন্নত দেশগুলোই চৌদ্দ আনা দায়ী। এটা কম-বেশি সর্বজনস্বীকৃতও বটে। এই সমূহ মহাবিপদ থেকে উদ্ধার পেতে হলে প্রধান যে কাজগুলো করতে হবে তা হলো:
১। বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। ভবিষ্যতে তাপমাত্রার বৃদ্ধি খুব বেশি হলে ১ থেকে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখা নিশ্চিত করতে হবে।
২। এজন্য গ্রীন হাউজ প্রভাব সৃষ্টিকারী কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস নির্গমনের বর্তমান হার নাটকীয়ভাবে ৪০% থেকে ৫০% পরিমাণে কমিয়ে আনতে হবে। এই কাজে সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে আমেরিকাসহ সেসব উন্নত দেশকেই; যারা এযাবত্কাল এই গ্যাসের সিংহভাগ বাতাসে ছড়ানোর জন্য দায়ী, এবং এখনো তার বেশিরভাগ নির্গমন করে চলেছে।
৩। ওজোন আবরণে যে ক্ষয় হয়েছে তার বৃদ্ধি রোধ করতে হবে। এজন্য ক্লোরোফ্লুরোকার্বন গ্যাসসহ ক্ষতিকর গ্যাস নির্গমনের ক্ষেত্রে রাস টেনে ধরতে হবে। এ ধরনের গ্যাস নির্গমনও অর্ধেকে নামিয়ে আনতে হবে।
৪। জ্বালানি চাহিদা মিটানোর জন্য কয়লা ও জীবাশ্ম নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প শক্তির উত্স উদ্ভাবন ও তার অবাধ সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।
৫। পরিবেশ-উদ্বাস্তু পুনর্বাসন কাজ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিভিন্ন দেশ বিশেষত বাংলাদেশের মতো সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত দেশের বিশাল ক্ষতি পুষিয়ে দিতে হবে। সব দেশকে প্রযুক্তিগত এ্যাডজাস্টমেন্ট করার কাজে সহায়তা দিতে হবে। এই খরচ বহন করতে হবে একদিকে এই ক্ষতির জন্য প্রধানত দায়ী এবং অন্যদিকে সামর্থ্যবান উন্নত ধনী দেশগুলোকেই।
এগুলো সবই এমন জরুরি কাজ যে, সেসব ক্ষেত্রে এক মুহূর্ত সময় অপচয় করার অর্থ হবে ধরিত্রীকে ধ্বংসের পথে আরো এক কদম ঠেলে দেয়া। কাজগুলো দ্রুত করতে ব্যর্থ হলে অবস্থা এমন জায়গায় এসে দাঁড়াবে যে, তখন নিশ্চিত ধ্বংস এড়াতে আর কিছুই করার সুযোগ অবশিষ্ট থাকবে না। এই তাগিদ থেকেই বিগত ২/৩ দশক ধরে সারা বিশ্বে হৈচৈ উঠেছে—সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। ধরিত্রীকে বাঁচাতে কিছু কর।
ধরিত্রীকে রক্ষা করার এইসব প্রয়াসে কেন লাগাতারভাবে বৈরিতা করে চলেছে আমেরিকা? এই বৈরিতা ছিল কার্টার, রিগান, ক্লিনটন, বুশ—সব আমলেই। অব্যাহত আছে ওবামার আমলেও। একথা কে না বুঝে যে, ধরিত্রী ধ্বংস হলে আমেরিকাও বাঁচতে পারবে না। তারপরেও কেন আমেরিকায় সরকার আসে-যায়, কিন্তু কোনো সময়েই জলবায়ু পরিবর্তনের ধ্বংসাত্মক আত্মঘাতী পথ থেকে এবং ধরিত্রীকে চূড়ান্ত ধ্বংস থেকে রক্ষার বিরোধিতা থেকে তাকে সরিয়ে আনা যাচ্ছে না? এই রহস্যের জবাব খুঁজে পাওয়া যাবে আমেরিকান রাষ্ট্রের পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী চরিত্রের দিকে তাকালে।
পুঁজিবাদ এমন একটা ব্যবস্থা যার মূল প্রণোদনা হলো ব্যক্তিগত ‘মুনাফা’ অর্জন। মুনাফার জন্য গলাকাটা প্রতিযোগিতা তাকে সামন্ততন্ত্রের সামাজিক শৃঙ্খল ভাঙ্গতে, প্রযুক্তির ক্রমাগত উন্নয়ন সাধন করতে বাধ্য করে। আরো উত্পাদন কর, শোষণের মাত্রা বৃদ্ধি কর, উদ্বৃত্ত মূল্য আরো বর্ধিত পরিমাণে আত্মসাত্ কর এবং এই ব্যবস্থাকে এপাশ-ওপাশে ও উপরমুখীভাবে বিস্তৃত কর—এসবই পুঁজিবাদের মুনাফা তাড়নার অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য। বৈষয়িক সম্পদ বৃদ্ধির এই তাগিদ আজ এমন স্তরে এসে দাঁড়িয়েছে যে, সসীম ধরিত্রীর পক্ষে এই অসীম স্ফীতি ধারণ করা আর সম্ভব হচ্ছে না। এবং এটা এই অবস্থাতেই সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, যখন পৃথিবীর মাত্র এক-চতুর্থাংশে তথাকথিত উন্নত পুঁজিবাদের পর্যায়ে উপনীত হতে সক্ষম হয়েছে। যদি অবশিষ্ট তিন-চতুর্থাংশ অনুন্নত ও স্বল্পোন্নত দেশগুলো একই পুঁজিবাদী পথ অনুসরণ করে ‘উন্নত’ দেশে পরিণত হয় তাহলে পরিবেশ দূষণ, ধরিত্রীর উষ্ণায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন ইত্যাদি কোন মাত্রায় গিয়ে পৌঁছাবে তা হিসাব করে বোঝানোর প্রয়োজন হয় না।
পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মুনাফার তাড়নাই হলো তার মূল উদ্দীপক, চালিকা শক্তির প্রেরণা। মুনাফা বাড়ানোর তাগিদে সে সবকিছু করতে পারে। ‘এক পয়সা মুনাফা বাড়ানোর জন্য পুঁজিপতি তার নিজের মায়ের গলায় ছুরি চালাতেও দ্বিধা করবে না’। এই যখন সত্য, তখন মুনাফা ও সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য বজায় রাখার জন্য ধরিত্রীর সর্বনাশ ঘটাতেই বা সে দ্বিধা করবে কেন?
পুঁজিবাদী ব্যবস্থার আরেকটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো, এই ব্যবস্থার অধীনে উত্পাদন প্রক্রিয়ার ক্রমবর্ধমান সামাজিক চরিত্র অর্জনের প্রবণতার সাথে তার ব্যক্তিগতভাবে আহরণের (personal appropriation)-এর দ্বন্দ্ব। জলবায়ু পরিবর্তন এখন এমন এক সমস্যা হিসাবে বিরাজমান যে, গোটা বিশ্ব সম্প্রদায় তথা, মানব সমাজকে সম্মিলিতভাবে তা মোকাবেলা করতে হবে। সর্বোচ্চ স্তরের সামাজিক দায়বদ্ধতার সাথে ধরিত্রীর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রশ্নটি আজ সম্পৃক্ত হয়ে গেছে। কিন্তু পুঁজিবাদ সেই সামাজিক দায়বদ্ধতার পথে বাধা তৈরি করে রেখেছে তার ব্যক্তিগত আহরণের তথা ব্যক্তিগত মুনাফা তাড়িত বৈশিষ্ট্যের কারণে।
পুঁজিবাদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো তার ‘অসম বিকাশের’ চরিত্র। যেসব দেশ আগেভাগে পুঁজিবাদের গাড়িতে সওয়ার হতে পেরেছে তারা তাদের বর্ধিত ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে ২/৩ শতাব্দী ধরে সারা দুনিয়াকে ঔপনিবেশিক শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে অবাধে লুণ্ঠন চালিয়ে আরো সম্পদশালী হতে পেরেছে। ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার অবসানের পর তারা বহুজাতিক কোম্পানি, কর্পোরেট পুঁজি ইত্যাদির মাধ্যমে অর্থনৈতিক শৃঙ্খলে বিশ্বকে আজ আবদ্ধ করে রেখেছে। বিশ্বায়নের নামে এ হলো পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার নয়া-ঔপনিবেশিক শোষণ প্রক্রিয়া। এই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্য সাম্রাজ্যবাদ আজ মরিয়া। সে চায়, “আমরা ধরিত্রীর যে ক্ষতি করেছি তা এখন বন্ধ করে আমাদের ‘উন্নতিকে’ পিছিয়ে এনে কিছু করা যাবে না। সেটা করতে গেলে গোটা ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়বে। তাই, ধরিত্রীকে বাঁচাতে হলে যা করার তা তোমাদেরকে অর্থাত্ অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে করতে হবে। আমাদের কাছ থেকে পয়সা দিয়ে পরিবেশ-বান্ধব প্রযুক্তি নাও, ব্যবহার কর, দূষণ কমাও। আমার উপর চাপ দিও না। ধরিত্রী বিপদাপন্ন—এ নিয়ে হৈচৈ হোক, আপত্তি নেই। কিন্তু সেজন্য আমাকে আমার মুনাফার ব্যবসা বন্ধ করতে বলো না। বরঞ্চ এ থেকেও আমাকে আরো দু-পয়সা কামাই করার সুযোগ দাও।” হায় পুঁজিবাদ! এই পথে যে তোরও মরণ, তোর চিন্তা করার আজ সুযোগ নেই। কারণ মুনাফা বৃদ্ধির তাগিদই যে তার ‘প্রাণ’। সেই ‘প্রাণ’ রাখতে এখন সমস্ত ধরিত্রীর সাথে তার নিজেরও প্রাণ যায়-যায়। এখানেই পুঁজিবাদের অমোচনীয় ও অন্তর্নিহিত আভ্যন্তরীণ বিরোধ (inharent contradiction)। পুঁজিবাদ বিকশিত হওয়ার প্রক্রিয়াতেই সে সমান্তরালভাবে তার কবর রচনা করতে থাকে। কিন্তু এখন প্রশ্নটা ভিন্নতর মাত্রা লাভ করেছে। পুঁজিবাদের কবর খোঁড়ার বিষয়টি তো সেটা ভালোই। কিন্তু পুঁজিবাদের মুনাফা তাড়িত ব্যবস্থার কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের ধারা যেভাবে চলছে এবং সেই বিপদ নিরসনে সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা যেভাবে বাধা দিচ্ছে তাতে গোটা ধরিত্রীরই কবর রচিত হলে পুঁজিবাদ আর সমাজতন্ত্র—কোন কিছুই কোন কাজে আসবে না। ‘অপারেশন সাকসেসফুল, বাট পেশেন্ট ইজ ডেড’—এরূপ পরিণতি কারোই কাম্য হতে পারে না। তাই, দেশকে জামাত-শিবির, সাম্প্রদায়িকতা, অনাচার-অবিচার, শোষণ-বঞ্চনা, সংঘাত-নৈরাজ্য, দুঃশাসন-অপশাসন ইত্যাদি থেকে বাঁচানোর জন্য সংগ্রামের পাশাপাশি ধরিত্রীকে বাঁচানোর সংগ্রামে সকলেরই আরো মনযোগী হওয়াটা কি ফরজ কর্তব্য নয়?
লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি
E-mail : [email protected]
