রাজনৈতিক সংকট নিরসনে সংলাপ হবে না

আপডেট : ১৫ এপ্রিল ২০১৩, ২১:১৪
সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিরোধীদলের কর্মসূচি, হরতাল-অবরোধ, পুলিশের এ্যাকশন, গ্রেফতার, মামলা, আদালতের সিদ্ধান্ত, নির্যাতন, মেয়েদের টানাটানি, গুলি, মৃত্যু, প্রধান নেতৃবৃন্দের বক্তব্য, গণজাগরণ মঞ্চ, হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচি প্রভৃতি এখন প্রধান প্রধান খবর। মানুষ আগ্রহ নিয়ে এগুলি পড়ে বা শোনে। উপদেশ বা পরামর্শ কেউ তেমন পছন্দ করে না। তবে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোন কোন উপদেশ সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। সম্ভবত এই ভাবনা থেকেই কতিপয় ব্যক্তি ও সংগঠনের পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগ-বিএনপির কাছে কিছু উপদেশ ও প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রস্তাব দিয়েছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, টিআইবির পক্ষে সুলতানা কামাল ও সিপিডির পক্ষে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। উল্লেখিত পরামর্শ, দাবি বা প্রস্তাবের মধ্যে প্রধান দুটি বিষয়। একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার, অপরটি দুই বড় রাজনৈতিক দলের মধ্যে আলোচনা বা সংলাপ। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রসঙ্গটি প্রধানমন্ত্রী আগেই নাকচ করে দিয়েছেন। গত শনিবার টিআইবির নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেছেন, ‘নির্বাচনের আগে নতুন ফর্মুলা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যাহত করতে পারে।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘উচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল হয়েছে।’...নির্বাচনকালীন সরকারের বিষয়ে যারা ফর্মুলা দিচ্ছেন, তাদের বিশ্বের অন্য দেশগুলোর সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতি পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিরোধীদলীয় নেত্রী যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর জন্য মানুষ হত্যার পরিকল্পনা নিয়েছেন। তিনি লাশ ফেলে ক্ষমতায় যেতে চান।...কয়েকটা লাশ ফেললে সেনাবাহিনী এসে উনাকে উদ্ধার করবে। সব সময় মানুষকে হত্যা করা, মানুষের ভাগ্য নিয়ে খেলা এটাই ওনার চরিত্র।’ (দৈনিক ইত্তেফাক) আওয়ামী লীগ ছাড়া প্রায় সব কয়টি রাজনৈতিক দল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন চায়। সংঘাত এড়াতে সুশীল সমাজেরও একই পরামর্শ। আমজনতার মতামত জানার কোন নিক্তি নেই। তবে গণমাধ্যমে প্রচারিত জরিপে প্রতীয়মান হয় তাদেরও সিংহভাগ দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন চায় না। এমতাবস্থায় দেশের অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় দুই দলের মধ্যে সংলাপের প্রয়োজন বলে প্রায় সকলেই বলছেন ও লিখছেন। কিন্তু পরিস্থিতি যায়ই হোক, দুই দলের প্রধান দুই নেত্রী তাদের অবস্থান থেকে একচুল সরে যাবেন, এমন ভরসা করা যাচ্ছে না। অতীতে এমন কোন নজিরও নেই। কেউ বলতে পারবেন না, দুই নেত্রী সহসাই এক টেবিলের দুই প্রান্তে বসবেন। বস্তুত তারা আছেন দুই মেরুতে। দলীয় নেতা-কর্মীদের কারাগারে রেখে তো সংলাপের প্রশ্নই আসে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে বিএনপি। সুতরাং বন্দিদের মুক্তি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদের নির্বাচনের দাবিতে রাজপথে থাকা প্রধান বিরোধী দলকে সংলাপের শান্তনা দিয়ে সহসায় ঘরে ফিরিয়ে নেয়া যাবে বলে বিশ্বাস করা কঠিন। আগামী একমাসের মধ্যে রাজনৈতিক সংকট নিরসন হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত। তিনি সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বয়স্ক মন্ত্রী। যদিও এর আগে কিছু বিষয়ে রাবিশ-ভোগাস বলে বিতর্কিত হয়েছেন। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে তার এই কথা উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। ইতোমধ্যে তার কথার সত্যতা কিছুটা প্রমাণিত হয়েছে। বিএনপির প্রায় সব শীর্ষ নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অচিরেই বেগম খালেদা জিয়াসহ অন্য নেতাদের কারাগারে নেয়া হবে। অবশিষ্টরা পালিয়ে থাকতে বাধ্য হবে। মিডিয়ার মাধ্যমে হরতাল আহ্বান করা হবে। কিন্তু মানুষ আর হরতাল পছন্দ করবে না। লাগাতার হরতালে মানুষ ক্ষুব্ধ হবে। ফলে তাদের আন্দোলন স্তিমিত হয়ে এক পর্যায়ে থেমে যাবে। জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করা হবে। এর মধ্যে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করে মানুষকে আন্দোলনবিমুখ করা হবে। অতএব একমাসের মধ্যে বিরোধী দল আর আন্দোলন করার জন্য নেতা-কর্মী খুঁজে পাবে না। জুলাই-আগস্ট বর্ষাকাল। আন্দোলন হবে না। সেপ্টেম্বরে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ডিসেম্বর বা তার আগেই নির্বাচন। সুতরাং রাজনৈতিক সংকট নিরসনের জন্য বর্তমান সরকারের কাছে কোন প্রস্তাব দিয়ে সুফল পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। কিন্তু এতসব কী বাংলাদেশের মানুষ নীরবে মেনে নেবে? অনেকে মনে করেন, ‘পরিস্থিতির কারণে’ এই সরকারই সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করবে। সংলাপে বসতে হবে না।  লেখক : সাংবাদিক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন