আলোকপাত

সবাই হয়তো ভুল করেই চলছে

আপডেট : ১৫ এপ্রিল ২০১৩, ২১:১৫
ডাক্তার ভুল করলে একজন রোগী পঙ্গু হয় বা মারা যায়, চালক ভুল করলে কয়েকজন যাত্রী পঙ্গু হয় বা মারা যায় আর রাজনীতিবিদ ভুল করলে পুরো দেশ বা দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিগত বিশ বছর যাবত্ দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল (পরবর্তীকালে জোট) সঠিক কর্মের চেয়ে ভুলই অধিক করে আসছেন এবং তাদের ভুলের মাশুল দেশকে ও জনগণকে পরিশোধ করতে হচ্ছে। বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি জটিলতম আকার ধারণ করেছে। ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকারের বিরুদ্ধে বৃহত্ বিরোধী দল বিএনপিসহ আরও অনেক দল, এমনকি সরকার সমর্থক জোটের ভেতরের দলও একের পর এক প্রতিযোগিতার মত লাগাতার হরতাল দিয়ে জনগণকে জিম্মি বানাচ্ছে এবং অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। প্রতিবাদের সর্বশেষ ও সবচেয়ে কার্যকরী অস্ত্র হরতাল এখন যেন খেলার বস্তু হয়ে গিয়েছে। কথায় কথায় যে কোন অছিলায় বিরোধী দলগুলো হরতাল ডাকছে এবং হরতালের আগে ও পরে এবং হরতালের মধ্যে যানবাহন ট্রেন, বাস পোড়ানো, পুলিশের ওপর হামলা, ককটেল বিস্ফোরণ, লাঠিসোঁটা ও অন্যান্য অস্ত্র দিয়ে আক্রমণ যেন অধিকারে পরিণত হয়েছে। কারণ হরতাল ডাকা নাকি সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু একই সংবিধানে তো প্রত্যেক নাগরিকের অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিত্সা, বাক-স্বাধীনতা, ইত্যাদি লাভের অধিকারও দেয়া হয়েছে। হরতালে জনগণের সে সব অধিকার পদদলিত হয় তা হলো, দিনমজুর কাজ না পেয়ে উপোস করে, কৃষকের ক্ষেতের ফসল ক্ষেতে পচে , মুমূর্ষু রোগী চিকিত্সা না পেয়ে মৃত্যুবরণ করে, শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিতে না পেরে এক বছর পিছিয়ে যায় অথবা রাত ৩টায় ব্রিটিশ কাউন্সিলে তাকে পরীক্ষা দিতে হয়, নিরপরাধ পথচারী প্রাণ হারায়, দূর-দূরান্তে মৃতের জানাজায় আত্মীয় যেতে পারে না, ভয়ার্ত প্রাণ নিয়ে রাস্তায় বেরোতে হয় ইত্যাদি। সর্বোপরি, দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয় দিনে প্রায় ২০০০ কোটি টাকার। উনারা বলেন, জাতীয় বৃহত্ স্বার্থে হরতাল ডাকা হয়। বছরে ৫০ দিন হরতাল ডাকা হলে ১ লাখ কোটি টাকা ক্ষতি হয়। পারবেন উনারা ক্ষমতায় গিয়ে এ ক্ষতি পুষিয়ে দিতে, মুখে হাজারবার বললেও পারবেন না। কাজেই হরতাল দলের স্বার্থেই ডাকা হয় ক্ষমতায় যাওয়ার পথ খুঁজতে। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার শান্তিপূর্ণ রাস্তা হলো জনতার ভোট আদায়। সেজন্য জনতার ভোগান্তি না বাড়িয়ে উনারা সরকারের বিরুদ্ধে জনতার কাছে নালিশ করতে পারতেন যে দেখুন, সরকার আমাদের উপর কি অত্যাচার করছে , আমরা হরতাল দিতে পারতাম, কিন্তু আপনাদের ও দেশের স্বার্থে তা করলাম না। এটা করলে উনাদের দেশপ্রেমের প্রমাণ পাওয়া যেতো। সুতরাং উনারা ভুল করেই চলছেন। এদিকে সরকারও ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিচ্ছে না। একতরফাভাবে নিজেদের পছন্দমত পদ্ধতিতে নির্বাচন করতে চাচ্ছে যা বহুদলীয় গণতন্ত্রে গ্রহণযোগ্য নয়। নির্বাচনের জন্য সমান ক্ষেত্র তৈরি না করলে অনেক দলই হয়তো নির্বাচনে অংশগ্রহনণ করবে না। সরকারের এখন উচিত সর্বনাশা হরতাল ও নৈরাজ্যের কবল থেকে দেশকে বাঁচানোর উদ্দেশ্যে সংলাপের জন্য “ধরি মাছ না ছুঁই পানি” নীতি পরিত্যাগ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাবনা নিয়ে বিরোধী দলকে আহবান করা। আরও বহু টানা হরতাল আসতে পারে। তাই শক্তি দিয়ে নয়, সংলাপের মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা উচিত। তারপরও সরকারের কাঁধে বোঝা ঝুলছে জামাত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করা, হেফাজতে ইসলামের দাবি-দাওয়া বিবেচনা করা। সবকিছুর জন্যই সরকারের হাতে সর্বোত্তম পন্থা হলো সংলাপ, শক্তি প্রয়োগ নয়। গত ২০ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে সময়মত সংলাপ-সমঝোতা করেনি বলে সরকার শেষ পর্যন্ত হার মেনেছে। তাই দেশের ও জনগণের ভোগান্তির দিকে তাকিয়ে সরকারের সংলাপ শুরু করা উচিত। দ্বিতীয়ত হরতাল গণতান্ত্রিক অধিকার হতে পারে কিন্তু এর অপকার মারাত্মক। তাই এ ক্রান্তিকালে হরতালকে নিষিদ্ধ করতে হবে। জানি সরকার এটা করতে চাইবে না। কারণ বিরোধী দলে গেলে সরকারকে কাবু করতে কেউই এই মোক্ষম অথচ আরামদায়ক অস্ত্রটি হাতছাড়া করতে রাজী নয়। তাই হরতাল নিষিদ্ধ করে সরকার দেশ-প্রেমের পরাকাষ্ঠা সৃষ্টি করতে পারেন। তাতে বিরোধী দলগুলো ছাড়া সবাই সাধুবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাবে, দেশের মানুষ আপনাদেরকে অন্তরে চির-ভাস্বর ও অমর করে রাখবে। আগামী নির্বাচনেও আপনারা জনগণের সমর্থন পাবেন।  লেখক :এফসিএ ও কথাশিল্পী

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন