পহেলা বৈশাখেই পথচলা শুরু করিয়াছে ইন্টারনেটে পূর্ণাঙ্গ বাংলা সার্চ ইঞ্জিন পিপীলিকা ডট কম। বিশ্বব্যাপী ছড়াইয়া থাকা কোটি কোটি বাঙালির জন্য ইহা নিঃসন্দেহে এই নববর্ষের অনন্য এক উপহার। একই সাথে বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের অবিনাশী চেতনা বাঙালি মানসে সৃজনশীলতা ও সম্ভাবনার যে সিংহদ্বার উন্মোচন করিয়াছিল—সেই স্বপ্ন-সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপায়িত করার দীর্ঘ পথযাত্রায় ইহা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকও বটে। বিশ্বখ্যাত সার্চ ইঞ্জিন গুগলেরও একটি বাংলা সংস্করণ রহিয়াছে বিধায় পিপীলিকাকে প্রথম বাংলা সার্চ ইঞ্জিনের কৃতিত্ব হয়তো দেওয়া যাইবে না, তবে ইহার সর্বাপেক্ষা তাত্পর্যপূর্ণ দিকটি হইল—বিশ্বমানের এই সার্চ ইঞ্জিনটি তৈরি করিয়াছেন সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের একজন শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে ১১ জন তরুণ শিক্ষার্থী। একেবারেই স্বউদ্যোগে কাজটি শুরু করিয়াছিলেন তাহারা। পরে তাহাদের সহায়তায় আগাইয়া আসিয়াছে একটি বেসরকারি মোবাইল ফোন কোম্পানি। আমরা তাহাদের অভিনন্দন ও সাধুবাদ জানাই। প্রবল প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও নানা ক্ষেত্রে আমাদের তরুণদের তাক-লাগানো সাফল্যের বিষয়টি বিশ্ব-স্বীকৃত। এই অদম্য তরুণরা আবারও তাহাদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিলেন এবং দেখাইয়া দিলেন যে, উপযুক্ত পরিবেশ ও পৃষ্ঠপোষকতা পাইলে তাহাদের পক্ষে কোনো কিছুই অসম্ভব নহে।
পিপীলিকার যাত্রা সবেমাত্র শুরু হইয়াছে। তবে ব্যবহারকারীদের জন্য সুসংবাদ হইল, ইহাতে প্রতিষ্ঠিত সার্চ ইঞ্জিনগুলির প্রায় সমপর্যায়ের সুযোগ-সুবিধা সন্নিবেশিত করা হইয়াছে সূচনালগ্নেই। সবচাইতে বড়ো সুসংবাদটি হইল, বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় এই সার্চ ইঞ্জিনটি ব্যবহার করা যাইবে। ইংরেজি সংবাদের পাশাপাশি পাওয়া যাইবে দেশের প্রধান প্রধান বাংলা পত্রিকার প্রয়োজনীয় সংবাদ এবং আনুষঙ্গিক তথ্যাদি। সংবাদ অনুসন্ধান ছাড়াও ব্লগ অনুসন্ধান, বাংলা উইকিপিডিয়া অনুসন্ধান এবং জাতীয় ই-তথ্যকোষ অনুসন্ধানের সুবিধা সংযুক্ত করা হইয়াছে। আছে নিজস্ব বাংলা অভিধানের স্বয়ংক্রিয় সহায়তার ব্যবস্থাও। ফলে কোনো বিষয়ে কেহ ভুল বানানে সার্চ দিলেও পিপীলিকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সঠিক শব্দটি খুঁজিয়া লইবে এবং তাহা প্রদর্শন করিবে। মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত একদা আক্ষেপ করিয়া লিখিয়াছিলেন ‘হে বঙ্গ ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন’। কথাটি অযথার্থ নহে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সমৃদ্ধ ভাষা হিসাবে বাংলার যে বিশাল তথ্যভাণ্ডার রহিয়াছে—পূর্ণাঙ্গ ও সহজে ব্যবহারযোগ্য বাংলা সার্চ ইঞ্জিনের অভাবে দীর্ঘকাল তাহা কাজে লাগানো সম্ভব হয় নাই। ফলে ছাত্র, গবেষক ও সংবাদকর্মীসহ সর্বস্তরের তথ্যসন্ধানী বাঙালিকে সামান্য একটি তথ্যের জন্যও গলদঘর্ম হইতে হইয়াছে। ব্যয় করিতে হইয়াছে বিস্তর সময়। পিপীলিকা শুধু যে তাহাদের মূল্যবান সময় সাশ্রয় করিবে তাহাই নহে, সেই সাথে নিশ্চিতভাবে বাড়াইয়া দিবে কাজের মান এবং গতিও।
আমরা আশা করি, তথ্যপ্রযুক্তিসহ সর্বক্ষেত্রেই সৃজনশীলতার এই ধারা অব্যাহত থাকিবে। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণরা যেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করিয়াছেন, তাহাতে অন্যরাও উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত হইবে। পিপীলিকা উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ হউক, বঙ্গভাণ্ডারের ‘বিবিধ রতনে’ ভরিয়া উঠুক তাহার তথ্যভাণ্ডার। সর্বোপরি, সার্চ ইঞ্জিন হিসাবে পিপীধিলকা অর্জন করুক বিশ্বমান।
