স্বৈরশাসক হোসনী মোবারক বিরোধী আন্দোলন এবং মোবারক-পতন অন্তে নিজেদের হস্তে ক্ষমতা কুক্ষিগত করিয়া রাখিবার দিনগুলিতে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে জঘন্য হিংসাত্মক কার্যক্রমে লিপ্ত হইয়াছিল মিসরের মিলিটারি। চলতি বত্সরের জানুয়ারি মাসে দেশটির প্রেসিডেন্টের নিকট পেশকৃত একটি গোপন প্রতিবেদনে এই বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণ পেশ করা হইয়াছে। চলতি সপ্তাহে বিলেতের দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকা কর্তৃক প্রতিবেদনটির বিভিন্ন অংশ ফাঁস হইয়া যাইবার পর হইতে সর্বমহলে সমালোচনার ঝড় উঠিয়াছে। সরকার কি কারণে এতদিন ধরিয়া এহেন জনগুরুত্বসমপন্ন একটি দলিল গোপন করিয়া রাখিয়াছে তাহা লইয়াও সোচ্চার হইয়া উঠিয়াছে মিসরের মানবাধিকার কর্মীরা। মিসরের মিলিটারি এতদিন ধরিয়া গণতন্ত্রকামীদের বিরুদ্ধে একটি গুলিও না ছুঁড়িবার দাবি করিত। এমনকি, মিলিটারি সর্বদা মোবারক বিরোধী বিক্ষোভকারীদের পক্ষে ছিল বলিয়াও প্রচার করা হইত। কিন্তু সদ্য ফাঁস হওয়া প্রতিবেদন হইতে গণতন্ত্রকামী মানুষের বিরুদ্ধে মিসরের মিলিটারির মানবেতর কর্মকান্ডের বিবরণ পাওয়া যাইতেছে। প্রতিবেদনে প্রকাশ, মোবারক বিরোধী আন্দোলনের দিনগুলিতে কায়রোর কবরি আল-ক্কুব মিলিটারি হাসপাতালে সামরিক বাহিনীর সিনিয়র ডাক্তারদের নির্দেশে জুনিয়র ডাক্তার ও নার্সরা অজ্ঞান ও যথাযথভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা ব্যতীতই রাজপথে আহত আন্দোলনকারীদের অস্ত্রোপচার করিয়া ফেলিত। ইহাছাড়া কখনও কখনও হাসপাতালে আহত অবস্থায় চিকিত্সাধীন থাকা আন্দোলনকারীদের প্রহার করা হইত; মিলিটারির ডাক্তার ও সৈনিকেরা মিলিয়া বিক্ষোভকারীদের অশ্লীল গালাগাল করিত। অভিযোগে প্রকাশ, উল্লেখিত উচ্চপদস্থ অফিসারদের নির্দেশে হাসপাতালটির ভূগর্ভস্থ কক্ষগুলিতে আহত আন্দোলনকারীদিগকে বাঁধিয়া রাখিবার মত ঘটনাও ঘটানো হইত। মিসরের মানবাধিকার কর্মীদের কেহ কেহ জেনেভা কনভেনশনের আলোকে ব্যাখ্যা করিয়া মিলিটারির কৃতকর্মকে ইতোমধ্যেই যুদ্ধাপরাধের সহিত তুলনা করিয়াছেন।
মোবারকের পতন হইবার পরে ক্ষমতা হস্তগত করিবার পরেও নিপীড়ন হইতে বিরত হয় নাই মিসরের মিলিটারি। নানাবিধ তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রণীত প্রতিবেদনটিতে প্রকাশ, বিগত বত্সরের মাঝামাঝি সময়ে সামরিক শাসন বিরোধী উত্তাল আন্দোলন দমন করিবার জন্য বালতিগিয়া নামে পরিচিত কুখ্যাত ভাড়াটিয়া অপরাধীদিগকে কাজে লাগাইয়াছিল মিসরের মিলিটারি। বালতিগিয়ারা আন্দোলনকারীদের দলে ভিড়িয়া আন্দোলনকে বিপথে পরিচালনা ও বিঘ্নিত করিত। ইহাছাড়াও এই ভাড়াটিয়া অপরাধীরা আন্দোলনকারীদের উপরে শারীরিক হামলা চালাইবার কাজটিও করিত। খুবই স্বাভাবিক যে, প্রতিবেদনটি ফাঁস হইয়া যাইবার পর হইতে ক্ষোভের ঝড় উঠিয়াছে মিসরে।
মানবাধিকার কর্মীদের কেহ কেহ মিলিটারির কৃতকর্মকে ইতোমধ্যে যুদ্ধাপরাধের সহিত তুলনা করিয়া মিলিটারির সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষকে তদন্তের আওতায় লইয়া আসিবার দাবি উত্থাপন করিলেও সরকার পক্ষ এখন অবধি কোন ধরনের আনুষ্ঠানিক অবস্থান গ্রহণ না করায় ক্ষোভের আগুন অধিক মাত্রায় প্রজ্বলিত হইতেছে। মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যে এই সন্দেহও দানা বাঁধিতেছে যে, নীরব থাকিবার মধ্য দিয়া সরকারপক্ষ সম্ভবত জনমনে মিলিটারির বিরুদ্ধে জাগিয়া উঠা ক্ষোভের মাত্রা প্রশমিত করিয়া ফেলিবার কৌশল গ্রহণ করিয়াছে। উল্লেখ্য, মোবারকের পতনের পর হইতে মিলিটারির সহিত বর্তমানে ক্ষমতাসীন ইসলামপন্থিদের সুসমপর্ক লক্ষ্য করা গিয়াছে। তাহাদের পার্লামেন্ট নির্বাচনে যাইবার পর হইতে এই সন্দেহ প্রবল হইয়াছিল। জানুয়ারি মাসে পেশকৃত মিলিটারির অপকর্মের দলিল এতদিন অবধি প্রকাশ না করা ও কোন ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ না করিবার কারণে উদার ও গণতন্ত্রপন্থিদের এতদিনকার সন্দেহ বোধগম্য কারণেই প্রবলতর হইবে।
