আমাদের দেশের মহাসড়কগুলির নিরাপত্তা বিধানের জন্য হাইওয়ে পুলিশ প্রথা প্রবর্তিত হইয়াছে প্রায় এক দশক আগে। অথচ, অদ্যাবধি এই পুলিশ বা হাইওয়ে পুলিশ বিভাগের কোন প্রকার তত্পরতা পরিলক্ষিত হইতেছে না। দেশের প্রায় ১২ হাজার কিলোমিটার হাইওয়ে প্রহরায় নিয়োজিত এই বাহিনীর শুধু যে জনবলই অপ্রতুল তাহা নহে, আধুনিক সাজ-সরঞ্জাম, যানবাহন, রাডার ইত্যাদি ক্ষেত্রেও রহিয়াছে যাচ্ছেতাই রকমের অভাব। ফলে যে উদ্দেশ্যে এই বাহিনী গঠিত হইয়াছে সে উদ্দেশ্য আদৌ সফল হইতেছে না। আমাদের সীমিত সম্পদের এই দেশে সম্পদের যে বিপুল অপচয় ঘটিয়া থাকে উহা নিবারণকল্পে তেমন কোন কার্যকর ব্যবস্থাই চোখে পড়ে না। অথচ, এই অপচয় যদি আমরা তাত্পর্যপূর্ণ হারে রোধ করিতে পারিতাম তাহা হইলে হাইওয়ে পুলিশ বিভাগ কিংবা এই জাতীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান নানাবিধ সংকট নিরসন করিতে পারিতাম নিশ্চয়ই। একটি রাষ্ট্রে বহু প্রতিষ্ঠানই অত্যন্ত অত্যাবশ্যকীয় বলিয়া বিবেচিত হয়, কিন্তু সিস্টেমের অভাবে সেই সকল প্রতিষ্ঠান অনেক ক্ষেত্রেই অপাংক্তেয় হইয়া দাঁড়ায়। ফলে মহতী উদ্দেশ্যে কিংবা রাষ্ট্রের ও জনগণের প্রয়োজনে কোন প্রতিষ্ঠান, বিভাগ বা ব্যবস্থা গড়িয়া তোলার সদিচ্ছাও এক শ্রেণীর ফেরেববাজ, চাটুকার ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তির কারণে ভেস্তে যায়। হাইওয়ে পুলিশও এমন ধারার হীনমন্যতার শিকার। তাহা না হইলে ২০০৪ সালে এই বিভাগটি গঠিত হইবার সময় যেসকল সমস্যা ছিল এই দীর্ঘ আট বত্সরে তাহা সমাধানের কোন প্রকার কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হইল না কেন?
পত্রিকান্তরের একটি প্রতিবেদনে হাইওয়ে পুলিশের যে জীর্ণ-দশার চিত্র তুলিয়া ধরা হইয়াছে উহাতে ক্ষুব্ধ না হইয়া পারা যায় না। প্রায় ১২ হাজার কিলোমিটার মহাসড়কের নিরাপত্তায় টহলের জন্য এই বাহিনীর মাত্র ৭২টি গাড়ী আছে। অর্থাত্, ১৬৬ কিলোমিটার টহলের জন্য বরাদ্দ রহিয়াছে মাত্র একটি গাড়ী। অন্যদিকে, দুর্ঘটনা কবলিত গাড়ী উদ্ধারকল্পে রেকার রহিয়াছে মাত্র ৮টি। কোন কোন ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা কবলিত গাড়ী উদ্ধারের জন্য দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছাইতে পুলিশকে সহস্রাধিক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। ফলে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, ডাকাতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ এবং নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠার সকল আয়োজন বা উদ্যোগই ব্যর্থতার বালুচরে মুখ থুবড়াইয়া পড়িতেছে। উল্লেখ্য, মহাসড়কে দুর্ঘটনা, ট্রাফিক আইন লংঘন, চোরাচালান, চোরাই পণ্য আটক ও মাদক দ্রব্য উদ্ধার সংক্রান্ত সব ধরনের অপরাধের মামলা দায়ের ও তদন্তসহ আরও বিভিন্ন বিষয়ে ক্ষমতা দিয়া হাইওয়ে পুলিশের খসড়া বিধিমালা প্রস্তুত করা হইয়াছিল। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে উহার কিছুই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় নাই। এমতাবস্থায় অবকাঠামোগত উন্নতি সাধনসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হইলে হাইওয়ে পুলিশ যে উন্নত সেবা প্রদান করিতে পারিবে এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নাই।
তবে মুশকিল এই যে, এই দেশে ‘ইচ্ছা থাকিলে উপায় হয়’ এই আপ্তবাক্য সকলের জানা থাকিলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মনে ঐ সদিচ্ছা জাগানোই অসম্ভব ব্যাপার বৈ আর কিছু নহে। ফলে ‘যাহা বাহান্ন তাহা তেপ্পান্ন’ হিসাবেই বলবত্ থাকে এই দেশে। জনগণকে সেবা ও নিরাপত্তা প্রদান সরকারের অন্যতম গুরুদায়িত্ব। কবে এই দায়িত্বের বিষয়টিকে সংশ্লিষ্ট মহল তাহাদের ‘বিশ্বাসের অঙ্গ’ হিসাবে গ্রহণ করিবে তাহা কে জানে! তবে বিশ্বাসের তাড়না সৃষ্টি না হইলে হাইওয়ে পুলিশতো বটেই, অন্যসকল ক্ষেত্রেও অব্যবস্থাই চলিতে থাকিবে মাত্র!
