আলোকপাত

স্বদেশ, তুমি কার?

আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০১৩, ২২:১০
লন্ডনের হাইড পার্কে ঢোকার আগে সামনের রাস্তার এক ফাস্টফুডের দোকানে ঢুকে অর্ডার করার সাথে সাথে ওয়েটার বলেছিল সেখানে বসে খাব, না নিয়ে যাব। আমি সেখানে বসে খাবার কথা বলায় আমাকে সেদিন দুই পাউন্ড অতিরিক্ত দিতে হয়েছিল এবং সেদিন হতেই বুঝেছিলাম সারা ইউরোপ- আমেরিকার লোকেরা রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ফাস্টফুড খায় কেন। আমি সেদিন হাউড পার্কে ঢুকে একটি বক্তব্য দিতে চেয়েছিলাম। আগেই জানতাম সেখানকার একটি নির্দিষ্ট জায়গায় পৃথিবীর যে কেউ বক্তৃতা করতে পারেন এবং মিডিয়ার লোকজন তা কভার করেন। আমিও সেই আশায় এই বুড়ো শরীরে একটু বাড়তি শক্তি সঞ্চয় করে কিছুক্ষণ ঘুরে সেই কাঙ্ক্ষিত জায়গা বের করলাম। কিন্তু হা হতোস্মি! সেখানে কোন মিডিয়াম্যান দূরের কথা কোন দর্শক- শ্রোতাও নেই। দুই-একজন লোককে হেঁটে যেতে দেখে জিজ্ঞেস করায় তারা জানালেন, সপ্তাহের অমুক নির্দিষ্ট দিন নির্দিষ্ট সময়ে সেখানে বক্তৃতা হয়। তখন দর্শক-শ্রোতা এবং মিডিয়ার লোকও থাকেন। সে নির্দিষ্ট দিন ও সময়ের কথা এখন মনে করতে পারছি না। যা হোক, দুইদিন পরই সেখান হতে আমার আমেরিকা যাবার টিকিট থাকায় আমি হাইড পার্কে বক্তৃতা দিতে পারি নাই। আমি সেখানে আমার বক্তৃতায় বলতে চেয়েছিলাম, “তোমরা বৃটিশরা আমাদের ভারতবর্ষ হতে যেসব মূল্যবান দ্রব্য নিয়ে গিয়েছ তার অংশবিশেষ আমাদের প্রাপ্য বিধায় তা আমাদের ফেরত দাও, দুইশত বছর ধরে আমাদের উপর যে অন্যায়, জুলুম করেছ তার ক্ষতিপূরণ দাও। আমরা স্বাধীন বাংলাদেশিরা আমাদের অংশ ফেরত চাই। আমি আমাদের বিশ্বাসেরা হীরকখণ্ড কোহিনূর যাতে ভারতবর্ষে ফেরত আসে এবং পালাক্রমে তা যেন ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশে থাকে সে কথাও বলতে চেয়েছিলাম। আরো বলতে চেয়েছিলাম মাদাম তুষো জাদুঘর কর্তৃপক্ষ যেন আমাদের স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি মূর্তি লন্ডনের মাদাম তুষো জাদুঘরে স্থাপন করেন। কিন্তু এসবের কোন কিছুই বলা সম্ভব হয় নাই। তবে সামনে লন্ডন গেলে অবশ্যই হাইড পার্কে গিয়ে আমি এসব বলবো। আসলে অনেক উচিত কথাই আমি বা আমাদের বলা হয়ে ওঠে না। স্কুল-কলেজে পড়ার সময় পাবনার টাউন হল, পুলিশ মাঠ, জিন্নাহ্ পার্ক ইত্যাদি স্থানে যখন মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু ইত্যাদি নেতা বক্তৃতা করতেন তখন তন্ময় হয়ে আমি তাদের কথা শুনতাম এবং ছাত্রাবস্থায় আমিও ভালো বক্তৃতা দিতে পারতাম। সে সময় আমাকে যাদের বক্তৃতা আকৃষ্ট করতো তাদের অন্যতম হলেন বঙ্গবন্ধু এবং মওলানা ভাসানী। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে উজ্জীবিক হয়েই আমি ১৯৭১ সনে ভারত গিয়েছিলাম। আবার সেই কিশোর এবং যুবক বয়সে মওলানা ভাসানী বক্তৃতার সময় মাঝে-মধ্যে ‘খামোশ’ বলে উঠলে ভীষণ মজা পেতাম। আজ এই পড়ন্ত বয়সে এসে তাদের মত কোন নেতার বক্তব্য শুনতে না পেরে বা দিকনির্দেশনা না পেয়ে এখন হতাশায় ভুগি। কারণ বর্তমান নেতৃবৃন্দের কোন কথাই কানে ধরে না, তাদের কোন কথাতেই দিকনির্দেশনা থাকে না। বর্তমানে আমার নিজের ভিতরটা তাই দিন দিন আলোড়িত হয়, আন্দোলিত হয়। এক্ষণে মনে হচ্ছে বর্তমান নেতাদের কারণে সামাজিক অবক্ষয়ে দেশ ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে! মনে হচ্ছে কিছু না বললেই যেন নয়। চুপচাপ বসে থাকাকে অপরাধ বলে মনে হচ্ছে। এই কয়দিন আগেও আমি পাবনা টাউন হল ময়দানে মহান স্বাধীনতা দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিয়ে এসেছি; কিন্তু মনে হচ্ছে কিসব যেন বলতে পারি নাই। এসব কারণেই হয়তো সেদিন রাতে স্বপ্ন দেখলাম যে, আমি একটি বিরাট বিশাল ময়দানে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করছি আর ময়দানভর্তি মানুষ তন্ময় হয়ে আমার কথা শুনছেন। আমার সে বক্তৃতার যে অংশগুলো মনে পড়ছে তা হলো: “বন্ধুগণ এ দেশ এখন কার সে প্রশ্নের উত্তর আমাদেরকে খুঁজে বের করতে হবে! যখন দেখি জামায়াত-শিবির আমাদের পুলিশকে রাস্তায় ফেলে মাথা থেঁতলে হত্যা করে, হাজার হাজার গাছ কেটে রাস্তায় ফেলে রাস্তা বন্ধ করে দেয়, অস্ত্র দিয়ে গুলি করে পুলিশসহ মানুষ হত্যা করে, রেললাইন উপড়ে ফেলে, রেললাইনে আগুন দিয়ে রেলপথ-রাজপথ সবকিছু বন্ধ করে দেয়, পরিবারের অন্ন যোগাতে রাস্তায় নামা মূসার টমটম জ্বালিয়ে মূসাকে পুড়িয়ে হত্যা করে, তখন মনে হয় এদেশ জামায়াত-শিবিরের। যখন দেখি একদল মৌলবাদী মানুষ শাপলা চত্বরে লাখ লাখ মানুষ একত্রিত করে ১৩ দফা দাবি দিয়ে সরকার পতনের হুমকি দেয়, তখন মনে হয় দেশটা বোধ হয় তাদের। যখন দেখি দুই দল মানুষ জনগণের নামে জিগির তুলে এই দেশ জনগণের এই কথা বলে আর ক্ষমতার দ্বন্দ্বে দিনরাত কামড়াকামড়ি করে, পরস্পরের প্রতি অশ্রাভ্য-কুশ্রাব্য বলে সমাজকে ধ্বংস করে দেয়, মিথ্যা কথায় দেশের আকাশ-বাতাস দূষিত করে তোলে আর ভোট বাণিজ্য করে ক্ষমতায় আসে, তখন মনে হয় এদেশ তাদেরই। আবার যখন দেখি একদল লোক রাইফেলের সঙ্গীন উঁচিয়ে ক্ষমতা দখল করে বলে সবকিছু ঠিক করে ফেলবো, এখন হতে সবকিছু নিয়মতান্ত্রিকভাবে চলবে; কিন্তু পরক্ষণেই সবকিছু ভুলে আখের গোছায়, তখন মনে হয় এদেশ তাদের।—বন্ধুগণ, আমার অনেক বয়স হলো। ইতিমধ্যে সহপাঠীদের অনেকেই মারা গিয়েছেন। আর কতদিন বাঁচবো জানি না। তবে আপনাদের কাছে একটি স্বনির্বন্ধ অনুরোধ জানাব, আসুন আমরা সবাই মিলে এদেশটি আসলে কার সে কথা জানার চেষ্টা করি। এদেশ যদি জনগণের হয় তাহলে আসুন আমরা সাধারণ মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে মতলববাজদের প্রতিহত করি। বন্ধুগণ এতোদিন পরও কি এ প্রশ্ন অমীমাংসিত থাকবে যে, আমার প্রিয় জন্মভূমি, আমার স্বদেশ আসলে কার? লেখক :মুক্তিযোদ্ধা, কলামিস্ট

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন