গত সোমবার আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে ১৪ দলের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে আওয়ামী লীগ সভাপতিমন্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ‘বিএনপির শীর্ষস্থানীয় কিছু নেতা কয়েকদিন ধরে বলছেন, দেশে আরও রক্তপাত ও সহিংসতা হবে। তারা এসব কথা কিভাবে বলছেন? এসব কথা শুনে আমরা বিস্মিত হই। দেশে আর যদি কোনো সহিংসতা হয়, তাহলে এর দায়-দায়িত্ব বিএনপিকেই নিতে হবে।’ এই খবরটি দৈনিক ইত্তেফাকের। পক্ষান্তরে একই দিন সহযোগী একটি দৈনিকের খবরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের প্রায় একই ধরনের উদ্ধৃতি ছাপা হইয়াছে। সেখানে তিনি বলিয়াছেন যে, নির্দলীয় সরকার ছাড়া বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের অবসান হইবে না। একই সঙ্গে নির্দলীয় সরকারের দাবি না মানিলে দেশে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হইবে তাহার দায়ভার সরকারকেই নিতে হইবে বলিয়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
এইভাবে চলমান রাজনৈতিক সংকট ও সংঘাত-সংঘর্ষময় পরিস্থিতির জন্য দেশের প্রধান দুইটি রাজনৈতিক দল পরস্পরকে দোষারোপ করিয়া আসিতেছে। ইহার জন্য কেহই কোন দায়ভার গ্রহণ করিতে চাহিতেছেন না। তাহা হইলে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠে, এই দায়ভার কাহার? আমরা পূর্ব হইতেই বলিয়া আসিতেছি যে, দেশ এমন এক পর্যায়ে উপনীত হইয়াছে যেখানে সংলাপ ও সমঝোতার কোন পরিবেশ নাই। কোন একটি পয়েন্টে মতৈক্য হইতে পারে এমন অবস্থাও আমরা দেখিতেছি না। তাহার পরও দেশের সুশীল সমাজ এমনকি বিদেশি শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাহাদের দেশের অভিজ্ঞতা হইতে বারংবার সংলাপের উপর গুরুত্বারোপ করিয়া যাইতেছেন।
নাইন ইলেভেনের ঘটনা যেমন গোটা বিশ্বকেই নাড়া দিয়াছে, তেমনি ওয়ান ইলেভেনের ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিরও খোলনলচে পাল্টাইয়া দিয়াছে। এইজন্য আমরা বরাবরই বলিবার চেষ্টা করিতেছি যে, শুধু লগি-বৈঠার কারণেই ওয়ান ইলেভেন আসে নাই। বাংলাদেশের জন্য অতিব গুরুত্বপূর্ণ ও নিকটতম প্রতিবেশী দেশের গোয়েন্দা সংস্থা গত বত্সর এই সরকারের জনপ্রিয়তা সম্পর্কে রিপোর্ট দেওয়ার পরই আস্তে আস্তে আমাদের রাজনৈতিক দৃশ্যপটের পরিবর্তন হইতে থাকে। অবশেষে শাহবাগের গণজাগরণ ও হেফাজতে ইসলামের আবির্ভাবের পর দেশের বিভাজন রেখাগুলি ক্রমেই সুস্পষ্ট হইয়া উঠে। মিলন নহে, সবখানে যেন বিভক্তিরই সুর বাজিতেছে। গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও সুশাসন ইত্যাদি সঠিকভাবে কাজ না করিলে পরিণতি ইহাই হয়।
প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশ বর্তমানে দুইটি রাজনৈতিক ধারায় বিভক্ত। অনেক ভাবিয়া দেখা গেল, পরস্পরবিরোধী এই দুই দর্শনের মধ্যে ন্যূনতম ঐক্য সাধন বা মিল দিবার মত কোন দার্শনিক ও জ্ঞানী-গুণী এই পৃথিবীতে আছে বলিয়া মনে হয় না। এমতাবস্থায় আমাদের কপালে দুঃখ ছাড়া আর কিছু লিখা নাই বলিলেই চলে। সেই হিসাবে সকল দায়-দায়িত্ব জনগণকেই নিতে হয়। আবার প্রকৃতির বিধান বলিয়াও একটি কথা আছে। কালবৈশাখী-তুফানসহ যতই দুর্যোগ-দুর্বিপাক আসুক না কেন, প্রকৃতির নিয়মেই একসময় তাহার অবসান হয়। যুদ্ধ ও ব্যাপক রক্তপাতের পরও শান্তি আসে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রকৃতি ঠিক কখন তাহার স্বাভাবিক দায়-দায়িত্বটি পালন করিবে তাহাও আমাদের জানা নাই।
