সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরিয়া জারি রাখা বাক-আক্রমণে বিরতি টানিয়া উত্তর কোরিয়ার নেতৃত্বের সহিত আলাপ-আলোচনা করিবার সদিচ্ছা ব্যক্ত করিয়াছে যুক্তরাষ্ট্র। সেক্রেটারি অফ স্টেইট জন কেরি জানাইয়াছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ‘যথাযথ মুহূর্ত’ ও ‘যথাযথ পরিস্থিতি’র জন্য অপেক্ষা করিতেছে। কোন সন্দেহ নাই যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের নূতন ঘোষণাটি বিরাজমান পরিস্থিতিতে নূতন এক মাত্রা যোগ করিবে। স্মরণ করা যাইতে পারে যে, গত কিছুদিন ধরিয়া উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তীব্র বাকযুদ্ধ ও পরস্পরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি প্রদান অব্যাহত রহিয়াছে। চলতি বত্সরের শুরুর দিক হইতে উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে নূতন করিয়া অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের জন্য জাতিসংঘে সচেষ্ট হইয়াছে যুক্তরাষ্ট্র। গত ডিসেম্বরে ভূগর্ভে পরমাণু পরীক্ষা ও চলতি বত্সরের ফেব্রুয়ারিতে রকেট পরীক্ষার দায়ে এই অবরোধ জারি করা হইয়াছে বলিয়া জানানো হইয়াছে। তবে উত্তর কোরিয়া জানাইয়াছে যে, দক্ষিণ কোরিয়ার সহিত যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক মাস দীর্ঘ সামরিক মহড়ার কারণে যে নিরাপত্তা অনিশ্চয়তা তৈরি হইয়াছে তাহার বিরোধিতা করিবার কারণেই নূতন করিয়া অবরোধ অস্ত্র প্রয়োগ করা হইয়াছে। পাল্টা জবাব হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের উপরে পরমাণু হামলা চালাইবার হুমকি দিয়া বিশ্ব-রাজনীতিতে আতঙ্ক সৃষ্টি করিয়া ফেলিয়াছে উত্তর কোরিয়া। দেশটির হুমকির মুখে প্রতিবেশী দক্ষিণ কোরিয়া ও নিকটবর্তী জাপানে যুদ্ধ-আতঙ্ক তৈরি হইয়াছে।
এক্ষণে জন কেরি যে বক্তব্য পেশ করিয়াছেন তাহাতে সঙ্কট নিরসনে কিছুটা আশাবাদ তৈরি হইলেও, ইহাতে কতিপয় ‘যদি’ ও ‘কিন্তু’ যুক্ত হইয়া আছে। প্রথমত, আলোচনায় বসিবার প্রস্তুতির কথা বলিলেও যুক্তরাষ্ট্র জানাইয়া দিয়াছে যে, আলোচনার বিষয়বস্তু হইবে উত্তর কোরিয়া পরমাণু কর্মসূচি পরিত্যাগ বিষয়ক। এইভাবে শর্ত যুক্ত করা হইলে আলোচনা আদৌ অনুষ্ঠিত হইবে কিনা এই প্রশ্নটি থাকিয়াই যাইতেছে। লক্ষণীয় বিষয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবটি তাহার মিত্র ও উত্তর কোরিয়ার প্রতিবেশী দক্ষিণ কোরিয়ার প্রস্তাব অপেক্ষা ভিন্ন। সিউল সর্বশেষ প্রস্তাবে বিনা শর্তে পিয়ংইয়ং-এর সহিত আলোচনায় বসিবার ইচ্ছা ব্যক্ত করিয়াছে। কিন্তু মুরুব্বী রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের শর্তযুক্ত আলোচনার প্রস্তাবের পরে দেশটি এখন কেমন অবস্থান লয় তাহা দেখিবার বিষয় হইবে বটে। স্মর্তব্য, পরমাণু কর্মসূচি লইয়াই উত্তর কোরিয়ার সহিত যুক্তরাষ্ট্র ও তাহার মিত্রদের কলহ চলিতেছে দীর্ঘদিন ধরিয়া।
উত্তর কোরিয়ার প্রধান মিত্র চীন কোন পথ অবলম্বন করে তাহা বর্তমান সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র চীনের নিকট হইতে অধিকতর ভূমিকা প্রত্যাশা করিবার কথা জানাইয়া দিলেও বেইজিং যে তাহার নিজস্ব হিসাব-নিকাশের ভিত্তিতে আগাইবে তাহাতে সন্দেহ নাই। উল্লেখ্য, চীন বিষয়ক মার্কিন যে সামরিক ভাবনা তাহার বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিকবার স্পষ্ট আপত্তি জানাইয়াছে বেইজিং। ইহাছাড়াও চীন মনে করিতেছে যে, উত্তেজনা ও উস্কানির জন্য কেবলমাত্র উত্তর কোরিয়া দায়ী নহে; এই ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও তাহার মিত্রদেরও ভূমিকা রহিয়াছে। এইদিকে, অপর পরাশক্তি রাশিয়ার সীমান্তে ইউরোপীয় মিত্রদের দ্বারা অ্যান্টি-ব্যালাস্টিক মিসাইল মজুত বন্ধে অস্বীকৃতি জারি রাখিয়া মস্কোকেও ক্ষুব্ধ করিয়া রাখিয়াছে ওয়াশিংটন।
এমত পরিস্থিতিতে, সত্যিকারের শান্তির সন্ধান করিলে, সংঘাতের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক থাকিবার কোন অবকাশ নাই। উভয় পক্ষকেই বুঝিতে হইবে যে, জয়-পরাজয় যাহাই হউক না কেন বিস্তর প্রাণহানি, ব্যাপক সম্পদহানি হইতে কোন পক্ষই রেহাই পাইবে না। উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক পন্থা অবলম্বনের পূর্বে যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিতভাবেই ইরাক ও আফগানিস্তানে হামলা-পরবর্তী উদ্ভূত পরিস্থিতিগুলি স্মরণ রাখিবে। অন্যদিকে, সামরিক হঠকারিতার পরিণাম কি হইতে পারে তাহা নূতন নেতৃত্বাধীন উত্তর কোরিয়ার বুঝিতে না পারিবার কথা নহে। আশা করা যায় যে, উভয় পক্ষের সুমতি হইবে এবং উহারা শর্তহীন, হুমকি-ধামকিমুক্ত পরিবেশে আলাপে বসিয়া বিশ্ববাসীর মনে স্বস্তির পরশ বুলাইয়া দিবে।
