রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য শান্তি ও সমৃদ্ধি। পৃথিবীর ইতিহাসে রাষ্ট্র পত্তন, রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনা, রাষ্ট্র ভেঙ্গে রাষ্ট্রের জন্ম নেয়ার ভেতরই এর যথার্থতা আছে। ইউরোপের কথাই ধরি না কেন, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তার লেখায় বারংবার বলেছেন, সভ্যতা মূলত ইউরোপের দান। আজ যে শক্তিধর আমেরিকা সে তখন শিশু। পৃথিবীকে হিটলারের হাত থেকে বাঁচিয়েছে চার্চিল আর লেনিনের মৈত্রী, প্রাজ্ঞতা ও দূরদর্শিতা। পরবর্তীকালে আমেরিকার উত্থান ও গণতন্ত্রের জয়যাত্রা দুনিয়াকে বদলে দিলেও রাষ্ট্র ভেঙ্গে তার প্রভাবে ভাঙ্গন বিচ্ছিন্নতা, পৃথকীকরণও দেখেছি আমরা। মানুষ শান্তি ও কল্যাণের জন্য যূথবদ্ধ থাকতে নিরবচ্ছিন্ন প্রগতির পথে চলতে নিজস্ব সংস্কৃতি ও ধারাকে এগিয়ে নিতেই রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে। যখন যে দেশে, যে সমাজে, যে জাতিতে এর যে কোন একটি বা একাধিক বিষয় আক্রান্ত অথবা তোপের মুখে পড়ে তখনই শুরু হয় অশান্তি। সে অশান্তির প্রবল প্রতাপে বার্লিনের দেয়াল ভেঙ্গে পড়ে। সমাজতন্ত্রের দুর্গ তাসের দেশের মত নড়ে ওঠে, ইউরোপে, আফ্রিকায়, এশিয়ায় সর্বত্র এই ভাঙ্গন ও অস্থিরতার ফলে হয় পরিবর্তন অথবা বিপর্যয়ই চোখে দেখি। ফলে আমাদের সাবধানতার বিকল্প নেই। বিয়াল্লিশ বছর পর থিতু ও প্রায় সর্বক্ষেত্রে অগ্রসর হবার জন্য মরিয়া জাতিকে পেছনে ঠেলতে হবে দুর্ভাগ্যের, কিন্তু তাই হচ্ছে। আজ আমাদের জন্মভূমি বাংলাদেশ অস্থির ও অশান্ত। এমন কঠিন সময় ইতোপূর্বে দেখিনি, কখনো মনে হয়নি এমনও হতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষণ বা সমস্যার আলোচনা এ লেখার বিষয় নয়। আমরা প্রবাসে দূর দেশে বাংলাদেশের ভয়াবহ বাস্তবতা আর সমাধান হীনতায় উদ্বিগ্ন। এ কথা মানতে হবে আদর্শ, চেতনা, ধর্ম বা যুক্তি সবকিছুই মানুষের জন্য। ধর্মই তাকে সৃষ্টির সেরা জীব আখ্যা দিয়েছে। এই জীবের সাথে অন্য জীবের মৌল তফাত্ এরা ভাবতে জানে। বিচার-বুদ্ধি, শিক্ষা-জ্ঞানে দুনিয়াকে হাতের মুঠোয় আনতে পারে। পারে বলেই তাদেরকে সমীহ না করলেও বুদ্ধি- বিবেচনা আর ন্যায্যতা দিয়ে চালাতে হয়। যে সব দেশে তা হয়নি তাদের অর্থনীতির বারোটা বেজে গেছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এমনকি রাষ্ট্রের টিকে থাকাও পড়েছে প্রশ্নের মুখে।
শান্তিপূর্ণ ও ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ দেশের তফাত্ যে কি সে আমাদের কারোই অজানা নয়। ভারত, পাকিস্তান পাশাপাশি দুটো দেশ, যেমন অস্ট্রেলিয়ার প্রতিবেশী পাপুয়া নিউগিনি, অথচ দৃশ্যপট আর বাস্তবতার ব্যবধান আসমান-জমিন। দিল্লী, আগ্রা, ব্যাঙ্গালোর, কোচিন, গোয়ায় এখন পর্যটকদের ভিড়। উড়োজাহাজ নামছে আর উঠছে, অন্যদিকে নিঃসর্গ ঐতিহ্য শোভায় চমত্কার অতিথিবত্সল অতীতের পর লাহোর, পিন্ডি, করাচি আজ খাঁ খাঁ। বিদেশি পর্যটকদের দুঃস্বপ্ন যাত্রা অথবা নিষিদ্ধ নগরী। বলছিলাম পাপুয়া নিউগিনির কথা, বিস্তৃত বনাঞ্চল, সমৃদ্ধ বন সম্পদ আর প্রকৃতির আশীর্বাদপুষ্ট দেশ। সে দেশের সম্পদ আর প্রকৃতি বাণিজ্য দখল নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার সাথে চীন ও মালয়েশিয়ার তর্ক-বিতর্ক বৈরিতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনের মুখরোচক খবর, আছে অধিকার রক্ষায় আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগও। এই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন এমন বাংলাদেশির সংখ্যাও কম কিছু নয়। অতি সমৃদ্ধ দেশটি কেবল জাতিগত হানাহানি আর দাঙ্গার কারণে এখনো তিমিরেই পড়ে আছে। এখনো ম্যালেরিয়া তাড়াতে পারেনি। আগন্তুক অভ্যাগত বা পর্যটকদের মনে চিরকালের ভয় ধরিয়ে দেয়ার মত সহিংসতায় বিদেশিরা রাজধানীর বাইরে পা ফেলে না ভয়ে। ফেললেই হয়তো দেখবে রাজপথের পাশের বৃক্ষে ঝুলছে জীবন্ত মানুষ, ধীরে ধীরে তার চামড়া তুলে নিচ্ছে প্রতিপক্ষ। এমনই ভয়াবহ জাতিগত হিংসা, আফ্রিকার কথা মনে করুন, কত দেশে যে গণহত্যা আর নির্যাতন চলছে। একই গায়ের রং, এক ভাষা, এক ধর্ম- তারপরও প্রতিহিংসার আগুনে পুড়ে শেষ হয়ে গেছে কৃষ্ণ দেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যত্। আপনি জিম্বাবুয়ে ঘুরে আসুন, জলপ্রপাত দেখে আসুন মনেই হবে না এসব দেশে এক পক্ষ আরেক পক্ষকে কুপিয়ে মারে, কথায় কথায় গুলি বন্দুক মারণাস্ত্রে এক সম্প্রদায় অন্য সম্প্রদায়ের জীবন-যাপন দূর্বিষহ করে তোলে। শুধু কি তাই? শারীরিক শক্তি সম্পদ আর মনোবলে এগিয়ে থাকার পরও এই দেশ ও জাতিগুলো আজ ধুঁকে মরছে। তাদের দেশ বা রাষ্ট্র মাথা তুলতে পারছে না। ব্যর্থ রাষ্ট্রের দায় নিয়ে আজ এরা বিশ্বের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমরা নিশ্চয়ই এমন বাস্তবতা চাই না। আমরা গত বিশ বছরে বাংলাদেশকে যেভাবে দেখেছি বা দেখতে পাচ্ছি সে যাত্রায় বিঘ্ন ঘটলে দেশ দেশ থাকবে না। মনে রাখা উচিত বড় কষ্টে রক্তে অর্জিত এই দেশটির প্রতিবেশীরা অগ্রসর দেশ এবং কেউই তার চূড়ান্ত মিত্র নয়। তাছাড়া প্রকৃতি ও দৈব আশীর্বাদে নিন্দুকের মুখে কালি লেপে ক্রমাগত এগিয়ে চলেছি আমরা। কোন পক্ষের দোষ বা কোন পক্ষ দায়ী ইতিহাস বা সময় কখনোই তা মনে রাখবে না। ইতিহাস মনে রাখলেও ফিকে হয়ে আসবে, সময় চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেবে এই তোমার অধঃপতন বা বিপর্যয়ের কাল। বাংলাদেশে এখন হঠাত্ করে কাজের চেয়ে কথা, কথার চেয়ে শ্লোগান, শ্লোগানের চেয়ে সমাবেশ, উগ্রতা, মার্চ ও লং মার্চের জোয়ার বইতে শুরু করেছে। এই প্রবণতা নিম্নগামী। আমরা কৃষক, শ্রমিক, মেহনতী মানুষ সাধারণ জনগণের কথা শুনতে চাই। রাজনীতি অনেক বলেছে, বলবেও। কিন্তু অনৈক্য আর সমন্বয়হীনতা চলতে থাকলে মানুষের কথা শোনার বিকল্প থাকে না। সে শোনাটা এখন দলের বৃত্তে জাতীয় পর্যায়ের হতে হবে। এই আহ্বান বা ডাক আসতে হবে তৃণমূল থেকে। কেবল সংস্কৃতি বা চেতনা কোন দেশকে ধরে রাখতে পারে না। সামনে যেতে দিতে পারার একক শক্তি হতে পারে না। এ জন্যেই চাই সম্মিলন, গণতন্ত্র ও সহিষ্ণুতার প্রকৃত গতিধারা। এবার যা পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হলে কেউই পার পাবে না। এমন কি প্রবাসীরাও। সবাই মিলে জাতীয় ঐক্য আন্তর্জাতিক ঐক্য আর শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করার এখন আর সত্যি কোন বিকল্প নেই।
[সিডনি থেকে]
