বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল লরিয়েট ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য দূরীকরণে ব্যাপক অবদান রাখিবার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক কংগ্রেসনাল গোল্ড মেডেল লাভ করিয়াছেন। সম্প্রতি মার্কিন কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে তাঁহার হস্তে এই পদক তুলিয়া দেন কংগ্রেসের স্পিকার জন বোয়েনার। আনন্দঘন ও জমকালো অনুষ্ঠানে মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। তন্মধ্যে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় দলের তিনজন করিয়া সদস্য বক্তব্য রাখেন। বিশেষত স্পিকার জন বোয়েনার বলেন,‘ অধ্যাপক ইউনূস এমন এক কাজ শুরু করিয়াছেন, যাহা বিশাল একটি বিষয় হইতে পারে। তাঁহার এই কাজ মানুষকে শ্রেয়তর জীবনের পথে আগাইয়া নিবে।’ ড. ইউনূস তাঁহার এই সম্মাননা বাংলাদেশের মানুষের জন্য উত্সর্গ করিয়াছেন।
শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের এই অসামান্য সম্মাননায় সারা বাংলাদেশের মানুষ আনন্দিত ও পুলকিত। এই কঠিন সময়েও তাহারা নিজেদেরকে গৌরবান্বিত মনে করিতেছেন। ১৯৭৬ সালে কংগ্রেসনাল গোল্ড মেডেল প্রবর্তনের পর হইতে এ পর্যন্ত বহু আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব এই পুরস্কার পাইয়াছেন। তাঁহাদের মধ্যে আছেন শান্তিতে নোবেল বিজয়ী নরম্যান বারলগ, মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র, নেলসন ম্যান্ডেলা, ইলি উইসেল, গণতন্ত্র সংগ্রামী অং সান সুচি, মাদার তেরেসা প্রমুখ। ইহার আগে ড. মুহাম্মদ ইউনূস যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্সিয়াল গোল্ড মেডেলও লাভ করেন। ইহাছাড়া ক্ষুদ্র ঋণের প্রবক্তা হিসাবে তিনি দেশ-বিদেশে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করিয়াছেন। একক ব্যক্তি হিসাবে বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে পরিচিত করিবার ক্ষেত্রে তাঁহার যে ব্যাপক ভূমিকা রহিয়াছে তাহা কখনও ভুলিবার নহে। বর্তমানে সারা পৃথিবীতে ২০ কোটিরও বেশি মানুষ তাঁহার দেখানো পথে ক্ষুদ্রঋণের সুবিধা পাইতেছে। এইসব কারণে তিনি আমাদের অহংকারে পরিণত হইয়াছেন। মার্কিন কংগ্রেসনাল গোল্ড মেডেল লাভ করায় আমরা তাঁহাকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে দেওয়া কংগ্রেসনাল গোল্ড মেডেলে একদিকে আছে তাঁহার হাস্যোজ্জ্বল প্রতিকৃতি। অন্যপিঠে বিশ্বের মানচিত্রের মধ্যে শাপলার উপর বাংলাভাষায় লেখা হইয়াছে ‘আমরা দারিদ্র্যকে জাদুঘরে পাঠাবো’। উপরে ইংরেজিতে লেখা হইয়াছে ‘ব্যাংকার অব দ্য পুওর’। বিশেষ করিয়া মেডেলে বাংলা ভাষার স্থান দেওয়ার বিষয়টি অভিনব ও চমকপ্রদ। ইহাও আমাদের জন্য গৌরবজনক। ড. ইউনূস দেশি ও বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা হইতে অব্যাহতি গ্রহণ করিয়া দরিদ্র মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে প্রতিষ্ঠা করেন গ্রামীণ ব্যাংক। যদিও মাইক্রো ক্রেডিট বা ক্ষুদ্রঋণের ধারণাটি একেবারে নূতন নহে, কিন্তু তিনি এই তত্ত্বের পুনরুজ্জীবনসহ বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োগও করিয়া দেখাইয়াছেন। এইখানেই বিশ্বের অন্যান্য অর্থনীতিবিদের তুলনায় তিনি সম্পূর্ণ আলাদা। বর্তমানে তিনি নিজের গড়া গ্রামীণ ব্যাংকের সহিত আর সংশ্লিষ্ট নহেন। ক্ষুদ্রঋণের সাফল্যের পর তিনি সোসাল বিজনেস বা সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বপ্ন দেখিতে শুরু করেন। সেই অনুযায়ী কাজও করিয়া যাইতেছেন। তাঁহার মতে, বিশ্ব অর্থনীতির এক শতাংশ এই খাতে ব্যয় করা হইলে আগামী পাঁচ বত্সরে পৃথিবীর আমূল পরিবর্তন হইবে। এইভাবে দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে তিনি পথিকৃতের ভূমিকা পালন করিয়া আসিতেছেন।
সর্বশেষ খবর অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া ও ইলিনয় রাজ্যের শিকাগোতে দুইটি সড়কের নামকরণ করা হইয়াছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নামে। ইহাও বিরল সম্মানের প্রতীক। এইভাবে আমাদের দেশ ও জাতিকে মহিমান্বিত করায় আমরা যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস, জনগণ ও সরকারকে ধন্যবাদ জানাই।
