আমাদের প্রাণপ্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (স.) তার দেশকে খুবই ভালবাসতেন। মদিনা হিজরতকালে তিনি একবার মক্কা যাওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করলে দয়াময় আল্লাহতায়ালা তা মঞ্জুর করেন। তিনি মক্কায় এসে ডুকরে ডুকরে কেঁদে ফেলেন। তিনি দেশ তথা মক্কাকে খুবই ভালবাসতেন বলে। এ সময় দয়াময় আল্লাহ একটা সুরাও নাজেল করেন। কথিত আছে ‘Independence is a precious gift of God’—এ কারণে সব স্বাধীন দেশই তাদের দেশের স্বাধীনতার পটভূমি, মুক্তি সংগ্রামের শপথ এবং সর্বোপরি স্বাধীনতার চেতনা তথা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে আঁকড়ে ধরে। তারা কালের স্রোতকে হারিয়ে দেশপ্রেমকে পুঁজি করেই সব সমস্যাকে পিছনে ফেলে ‘একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার মত’ সব জয় করে এগিয়ে চলে। এটাই সত্য। এটাই তো ইতিহাস। কিন্তু আমাদের দেশের বেলায় তা কেন যেন পুরো উল্টো হলো। আমাদের মুক্তি সংগ্রামের গৌরবময় ইতিহাস আশ্রিত মহান মুক্তিযুদ্ধের সবকিছুই বিশ্ববাসীকে অবাক করেছে। বিশ্ববাসী কখনো ৭ মার্চ/৭১-এর এত বড় মহাসমাবেশ দেখেনি এবং ঐ মহাসমাবেশে পঠিত সংগ্রামের ছন্দময় বজ্র কণ্ঠও শুনেনি। তারা ৯০% জনসমর্থনের মুক্তিযুদ্ধের এত বড় গণজাগরণ দেখেনি। দেখেনি মানবজাতির ইতিহাসে এতবড় গণহত্যা, পাশবিক অত্যাচার, লুটতরাজ এবং সাম্প্রদায়িক হত্যাকাণ্ডের মত কত জঘন্য অপরাধ। তারা এও দেখেনি এক কোটির মত শরণার্থী যারা প্রাণের ভয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়। এটা ছিল দুনিয়া কাঁপানো ঘটনা। অথচ ৪/৫ বছর যেতে না যেতেই একদিন খটখট বুটের আওয়াজে তাদের এক ব্রাশ ফায়ারে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে কবর দেয়া হলো। তারা চায় ‘Open Heart Surgery’-এর মত এবং ‘Operation Clean Heart’-এর মত আরও অপারেশন করতে।
মহাত্মা গান্ধী সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজদের বিরুদ্ধে অসহযোগের হাতিয়ার হিসেবে যখন হরতাল প্রচলন করেন, তখন আবালবৃদ্ধবণিতার দ্বারা স্বতস্ফূর্তভাবে হরতাল পালিত হয়েছিল। অর্থাত্ সে সময় দোকানপাট খুলেনি, অফিস-আদালত বন্ধ ছিল, কোন যানবাহনও চলেনি ইত্যাদি। কিন্তু এখন হরতাল ঘোষণার পূর্ব দিবস হতেই গাড়ি/বাস/ট্রাকে অগ্নিসংযোগসহ ককটেল ফোটানোর মহোত্সবের রিহারসেল শুরু হয়। এটাকে স্বতস্ফূর্ত হরতাল বলা যায় না। এটা ‘ভয়তাল’। আমরা বঙ্গবন্ধুর ডাকে ৭১-এর দিনগুলোতে গান্ধীর ডাকের মত হরতাল দেখেছি। আমরা সবাই দেশকে ভালবাসি। বিধায় দেশের মানুষকে জিম্মি করে কোন হরতাল আহ্বান করতে পারি না। আমাদের দেশে সাধারণ নাগরিক ও রাজনীতিবিদদের দেশপ্রেমের খুবই অভাব বলেই তারা জাতীয় ঐক্যে পৌঁছাতে পারেন না। আমরা কমবেশি সবাই সুবিধাবাদী। তাই দেশের স্বার্থ উপেক্ষা করে নিজের স্বার্থ উদ্ধারে আমরা সর্বদা তত্পর থাকি। আমরা কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দেশপ্রিয় প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির একটি বিশ্ব বিখ্যাত উক্তি স্মরণ করতে পারি না? দেশ কি দিবে সেটা বড় কথা নয়, আমি দেশকে কি দিবো সেটাই বড় কথা। আমরা কেবল দলের স্বার্থে কাজ করি। দেশের স্বার্থে নয়। এ ব্যাপারেও আমরা মার্কিন বর্তমান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার একটা বিখ্যাত উক্তি কি স্মরণ করতে পারি? আমরা ডেমোক্রেট নই, আমরা রিপাবলিকান নই, আমরা সবাই আমেরিকান। তাই আমরাও তো বলতে পারি আমরা কোন দলের লোক নই। আমরা সবাই বাঙালি।
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনাকে বার বার উপেক্ষা করে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো দলের স্বার্থে এবং এমনকি নিজেদের স্বার্থেও দেশ শাসন করতে দ্বিধা করেনি। এক দল চাইছে দেশ পরিচালিত হোক মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনাকে বিবেচনায় নিয়ে এবং আর কিছু দল চাইছে দেশ পরিচালিত হবে ৭৫-এর পট-পরিবর্তনের ঘটনাকে বিবেচনায় নিয়ে। এই কারণেই দেশ পরিচালনায় নানা বিরোধ, দ্বন্দ্ব এবং এমনকি প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক সংঘাত লেগেই আছে।
আমাদের দেশে দেশপ্রেমিক, সত্ এবং সুবিধাভোগী নন এমন রাজনীতিবিদদের বড় অভাব বলেই দেশ পরিচালনায় তারা আশানুরূপ অবদান রাখতে পারছেন না। শুধু তাই নয়, তারা জাতীয় ঐক্যেও উপনীত হতে পারছেন না। আমাদের মৌলিক অধিকার যেমন আহার, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিত্সা এবং বাসস্থানের উত্তরণে সরকারের ভূমিকা আমাদের জানা আছে। এদেশে যত উন্নতি হয়েছে তা আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং আমাদের একক প্রচেষ্টাই হয়েছে বলে আমি বিশ্বাস করি।
আমি ভাবিনি দেশ এত তাড়াতাড়ি স্বাধীন হবে এবং যুদ্ধ শেষে দেশে ফিরবো তাও ভাবিনি। তাই একজন দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বলতে চাই যে, দেশটা সোনার বাংলা হোক। দল ও ব্যক্তি স্বার্থের হানাহানি বন্ধ হোক। লুটপাট/ দুর্নীতির প্লাটফরম ধ্বংস হোক। পক্ষান্তরে দেশপ্রেম ও দেশকে ভালবাসার প্রতিনিয়ত সম্মিলিতভাবে মানববন্ধনা করা হোক। আমি বিশ্বাস করি কেবল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনায় দেশ পরিচালিত এবং জাতীয় ঐক্যে ঐক্যবদ্ধ হলেই দেশের গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে এবং সুশাসন ফিরে আসবে। অন্যথায় কখনই নয়।
লেখক:সমাজকল্যাণ সচিব, মুক্তিযোদ্ধা বিসিএস অফিসার কল্যাণ সমিতি ও ডাইরেক্টর কো-অর্ডিনেশন এন্ড হেড অব ডেভলপমেন্ট বিজিআইসি লিঃ, ঢাকা
