রাজনৈতিক অচলাবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে কাউকে না কাউকে দূতালির কাজটি করতে হবে। দেশ জাহান্নামে চলে গেলেও দুই নেত্রী একত্রে কোন আলোচনার টেবিলে বসবেন বলে মনে হয় না। তাই নিরুপায় হয়ে স্বপ্ন দেখছি রাষ্ট্রের স্বার্থে মাননীয় রাষ্ট্রপতি এই দুরূহ কাজটি সম্পন্ন করার জন্য উদ্যোগী হয়েছেন। গুনাগার বান্দা হয়েও আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি আমার এই স্বপ্ন যেন বাস্তবতা লাভ করে। রাজনীতিতে প্রজ্ঞা ও দর্শন চর্চার অভাবে ক্ষমতা দখলের লড়াইতে উভয় জোট নানান ধরনের ভনিতার আশ্রয় নিয়ে দুর্বৃত্তায়নকে মারাত্মকভাবে প্রশ্রয় দিয়ে জনজীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। বিগত বিশ বছরের অধিককাল দুধ-কলা দিয়ে বিষধর সাপ পুষেছে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আর এখন জনগণ তার খেসারত দিচ্ছে। কোন বিবেকবান মানুষ এই ধরনের অবান্তর ও আত্মঘাতীমূলক কর্মকাণ্ডকে কশ্মিনকালেও অনুমোদন দিতে পারে না। বিবেকের তাড়নায় যে চিত্র ভেসে উঠে তা হলো নিম্নরূপ:
ধরা যাক ১ বৈশাখ উদযাপনের দুই সপ্তাহের মধ্যে রাষ্ট্রপতি পূর্ব নির্ধারিত এজেন্ডার ভিত্তিতে প্রধান বিরোধী দলের নেত্রীর সাথে বৈঠকে বসলেন। দিনটিকে ডি ডে হিসাবে ধরা হলো। সমগ্র আন্দোলন যেহেতু নির্বাচনকে ঘিরে তাই বিষয়বস্তু নির্বাচনভিত্তিক হওয়াই স্বাভাবিক। অন্য বিষয় নিয়ে আলোচনা করা সময়ের অপচয়। তাই বিষয়বস্তু হবে যেমন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন ও গঠন প্রণালী, নির্বাচন কমিশন ও তার কার্যক্রম ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অনধিক দশজন মন্ত্রী মহোদয়গন নিজেরা নির্বাচনে এবং কোন ধরনের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। তারা শুধুমাত্র নিজস্ব মন্ত্রণালয়ের দৈনন্দিন কাজ সমাধা করবেন। নির্বাচন কমিশনের অনুরোধক্রমে তারা প্রয়োজনীয় সাহায্য-সহযোগিতা প্রদানে বাধ্য থাকবেন। দশজন মন্ত্রীর মধ্যে সরকারি দল/জোট পাঁচজন ও বিরোধী জোট বাকি পাঁচজনের নাম সংসদ সদস্যদের থেকে বাছাই করে দিবেন। এই পাঁচজনের মধ্যে তিনজন সরকারি দলের/জোটের হবে। মনে রাখতে হবে যে, ১৯৪৬ সালে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের যৌথ মন্ত্রিসভা দলাদলির কারণে মোটেও তেমন কোন গঠনমূলক কাজ করতে পারেনি।
রাজনৈতিক দলসমূহে গণতন্ত্রায়নকে বেগবান করার জন্য প্রস্তাব রাখা যায়, যে কেউ দুই টার্মের বেশি সরকার প্রধান হতে পারবেন না। এই প্রথা ১৯৯০ সাল থেকে প্রযোজ্য হবে। প্রস্তাবটি বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। যদিও বিশাল প্রধান দুই দলকে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দেয়ার মতো দল দুইটির মধ্যে বর্তমান একক সবল নেতৃত্বের অবর্তমানে সেই ধরনের কার্যকর নেতৃত্ব দেয়ার মতো সর্বজনগ্রাহ্য একক ডাইনামিক নেতার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। বিশেষ করে বিএনপির মধ্যে। কারণ সেভাবে নেতৃত্ব গড়ে উঠেনি বা উঠতে দেয়া হয়নি। তবুও রাজনীতিতে তাঁবেদারি এবং স্বার্থান্বেষী মহল, পরিবারতন্ত্র ও কালো টাকার দৌরাত্ম্য থেকে দেশকে উদ্ধারকল্পে এই প্রস্তাবটি অতীব গুরত্বপূর্ণ বিধায় এই প্রস্তাব রাখা সমীচীন হবে।
নির্বাচন কমিশন বিশেষ করে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে হতে হবে সত্, দেশপ্রেমিক, প্রজ্ঞাবান, আইনজ্ঞ, দক্ষ প্রশাসক এবং হতে হবে বেপরোয়াভাবে সাহসী। থাকতে হবে হিমালয়সম ধৈর্য। তার প্রতি প্রধান দুই দলের আস্থা থাকতে হবে। তার প্রতি বাংলাদেশের অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর আস্থা থাকতে হবে। রাষ্ট্রপতি ইচ্ছা করলে পূর্ববর্তী নির্বাচন কমিশনকে বর্তমান জাতীয় নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব দিতে পারেন। যেহেতু তারা ২০০৮ সালে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করতে সমর্থ হয়েছিলেন এবং বর্তমান নির্বাচন কমিশন তাদের সাথে আন্ডার স্টাডি হিসাবে কাজ করতে পারে। এতে করে নির্বাচনের কাজ ত্বরান্বিত হবে। একই সঙ্গে নির্বাচনী ব্যয় কমাতে হবে। যেমন টিভিতে প্রার্থীদের ডিবেট করিয়ে যে আয় হবে তা দিয়ে ভোটারদের আনা-নেয়ার জন্য কমপক্ষে প্রতি প্রার্থীর জন্য পাঁচটি বাসের বন্দোবস্তসহ প্রার্থীদের অন্যান্য নির্বাচনী ব্যয় নির্বাচন কমিশন বহন করতে পারে। তাতে করে কালো টাকার দৌরাত্ম্য কমে আসবে এবং ভালো ও সত্ মানুষ নির্বাচনে প্রার্থী হতে আগ্রহী হবে।
প্রধান বিরোধী দলের/জোটের নেত্রীর সাথে কথা বলার পর (ডি+৪ দিন) সরকারি দলের/জোটের নেত্রীর সাথে কথা বলে একটি কার্যকর কার্যক্রম প্রণয়ন করে (ডি+১৫) প্রয়োজনে জরুরিভিত্তিতে সংসদ ডেকে যেখানে আইনের সহায়তা প্রয়োজন তা নিয়ে (ডি+২৫-৩২ দিন) অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন প্রণালী স্থিরকরণ, দরকার হলে নির্বাচন কমিশন ঢেলে সাজানো ও সম্ভাব্য নির্বাচনের দিন ধার্য করা এবং ভোটার লিস্ট আপডেইটেডসহ অন্যান্য কার্যক্রম শুরু করার কাজ সম্পন্ন করা। সেমতে সরকারি দল, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের রাস্তা সুগম করার জন্য সংসদ ভেঙ্গে দেয়ার জন্য রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ করবে এবং রাষ্ট্রপতি ত্বরিত কার্যক্রম গ্রহণ করে নির্বাচন কমিশনকে তাদের দায়িত্ব পালনে আহ্বান জানাবেন (ডি+৬০) এবং সংশ্লিষ্ট সকল মহল নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী নির্বাচনের সকল কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত কাজকর্ম চালিয়ে যাবে। নির্বাচন চলাকালীন নির্বাচন সংক্রান্ত সকল বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সীদ্ধান্তই শেষ সীদ্ধান্ত বলে বিবেচিত হবে। তবে নির্বাচন শেষে (ডি+২০০ দিন) কোর্ট-কাছারিতে আপিল করতে পারবেন—তার আগে নয়। রাজনীতিকে যতদূর সম্ভব কোর্ট-কাছারি ও ধর্মীয় উপাসনালয় থেকে বের করে এনে আলোচনার টেবিলে, জনসভায়, টিভির ডিবেট মঞ্চে ও সংসদে আবদ্ধ করতে হবে।
যদি ফলপ্রসূ আলোচনা না হয় বা আলোচনার অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয় তা হলে রাষ্ট্রপতি জরুরি আইনের বলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনসহ (সমমনার একটি টিম গঠন করা) প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন ঢেলে সাজিয়ে, রাজনৈতিক অঙ্গনে যে জঞ্জাল সৃষ্টি হয়েছে তা যতদূর সম্ভব ত্বরিত গতিতে দূরীভূত করে পরমুহূর্তে রাজনৈতিক দলসমূহের সাথে আলোচনা করে অনতিবিলম্বে অবাধ ও সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান করার জন্য সকল ধরনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণপূর্বক নির্দিষ্ট সময়ের ভিতর নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে সাধারণ নির্বাচন সম্পন্ন করা। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে নিয়ত ও ঈমান ঠিক রেখে রাষ্ট্রপতি নিরপেক্ষভাবে শক্ত হাতে হাল ধরলে এই কার্যক্রম বাস্তবায়ান করা তেমন কোন কঠিন কাজ নয়। কারণ সমগ্র দেশ তার এই নির্মোহ কাজে তার পাশে থাকবে এটা প্রায় নিশ্চিত।
[ এটি লেখকের শেষ লেখা। তিনি গত শুক্রবার গভীর রাতে আকস্মিকভাবে ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহে..... রাজেউন)। মৃত্যুর আগে এই লেখাটি তিনি ইত্তেফাকে পাঠান, তার রুহের মাগফিরাত কামনা করে এই শেষ লেখাটি এখানে পত্রস্থ করা হলো। ]
লেখক :অবসরপ্রাপ্ত সামরিক অফিসার ও সাবেক রাষ্ট্রদূত।
