অপার সম্ভাবনাময়ী বাংলাদেশে এখন চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। দেশের এই সংকটকালে জনগণ আজ আতংকিত। কি হবে দেশের পরিস্থতি, দেশের অগ্রগতি অব্যাহত থাকবে নাকি থমকে দাঁড়াবে তাই আজ জনগণের চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক অস্থির পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতি, শিক্ষাব্যবস্থা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে পক্ষ-প্রতিপক্ষ অথবা শত্রু-মিত্রের রূপরেখা তৈরি হয়েছে। মতাদর্শগত বিরোধ, স্বার্থগত চাওয়া-পাওয়া ইত্যাদির কারণে দেশে প্রায়ই সহিংস ঘটনা ঘটছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দরের সভা-সমাবেশ, হরতাল, অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে দেশের অর্থনীতি ও শিক্ষাখাতসহ বিভিন্ন খাত চরম বিপর্যয়ের মুখে।
দেশে এখন বহুমাত্রিক সমস্যা বিদ্যমান, যেগুলোর গভীরতা অনেক বেশি। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলের নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের দাবি এবং সাম্প্রতিক হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন শান্তিপূর্ণ হলেও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে সহিংস ঘটনা ঘটছে। অথচ সংকট নিরসনে উল্লেখযোগ্য কোন অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। আর আমরা জানি সংঘাত কোন সমাধানের নাম নয়। একমাত্র গণতান্ত্রিক মনোভাব নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসন করতে হবে।
রাজনৈতিক কারণে সৃষ্ট সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সমাঝোতা প্রয়োজন। তা না হলে গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়বে। গণতন্ত্র টিকবে না। হার-জিত নয়, বরং সংকট উত্তরণের পথকে প্রাধান্য দিতে হবে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোকে।
দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির দাবি তত্ত্বাবধাযক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করা, কিন্তু ক্ষমতাসীন সরকার সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করে দিয়েছে। সুতরাং আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে জনমনে সংশয় দেখা দিয়েছে। আর সুষ্ঠু নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্র টিকতে পারে না। গণতন্ত্র না টিকলে মানবাধিকার, বাক স্বাধীনতা ভূলুণ্ঠিত হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। দেশের নির্বাচন কি উপায়ে হবে, কার নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হবে তা সরকার ও প্রধান বিরোধী দলসহ অন্য দলগুলোকেই সমাধান করতে হবে। আর এজন্য দরকার গণতান্ত্রিক মনোভাব। এজন্য সরকারকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। যেহেতু আমাদের দেশে সংসদীয় বহুদলীয় গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা বিদ্যমান তাই সরকারকে ভাবতে হবে যে, গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে বহাল রাখার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা জরুরি। বিএনপির অনেক শীর্ষস্থানীয় নেতা হাজতে আটক আছেন। এই অবস্থায় আলোচনার পরিবেশ নেই দাবি বিএনপির। আর সরকার দাবি করে যে, বিএনপি সহিংস আন্দোলনের পথ অনুসরণ করছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে গণতন্ত্র মুখ থুবড়ে পড়বে। এই সংকট সময়ে হরতাল-অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মকান্ডে দেশের অর্থনীতিসহ বিভিন্ন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী আজ বিরোধী দলগুলোর মুখোমুখি অবস্থান করছে। বিরোধী দল মনে করে তারা সরকারের লাঠিয়াল বাহিনী। অথচ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সমাধানের পথ খুঁজে পেলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনের সুযোগ পাবে। সমস্যাগুলো যেহেতু রাজনৈতিক তাই রাজনৈতিকভাবে এগুলোর সমাধান করতে হবে। তাদের অগণতান্ত্রিক মনোভাব দেশের অকল্যাণ বয়ে আনবে। যা দেশের মানুষ আশা করে না।
রাজনীতি হবে দেশের জন্য, মানুষের জন্য। কোন ব্যক্তিস্বার্থ বা গোষ্ঠীস্বার্থের জন্য নয়। রাজনীতি হবে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে। রাজনৈতিক দলগুলোর কাজ হবে দেশের মানুষের কথা চিন্তা করা।
হরতাল, অবরোধ ইত্যাদি কর্মসূচিতে দেশের উন্নয়ন বাধাপ্রাপ্ত হয়। তাই আন্দোলন তথা দাবি আদায়ের বিকল্প পথ খুঁজে বের করা দরকার। বর্তমান সময়ে আরেকটি বিষয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা হল জাতিগত বিভাজন সৃষ্টি। বিভিন্ন জায়গায় ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের মধ্যে সংঘর্ষের খবর পাওয়া যাচ্ছে। যা দেশের ঐক্য বিনষ্ট করছে। দেশের উন্নয়নে এই ঐক্য বজায় রাখা জরুরি।
দেশের বহুমাত্রিক সমস্যা নিরসনে রাজনৈতিক নেতাদের আলোচনা করা দরকার। আর এজন্য নেতৃবৃন্দের গণতান্ত্রিক মনোভাব থাকতে হবে। কারণ গণতান্ত্রিক আচরণ দিয়ে গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে হবে। দেশে যেন কোন সহিংস ঘটনা না ঘটে বা হরতাল, অবরোধ ইত্যাদির কারণে দেশের বিভিন্ন খাত ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেজন্য আলোচনা জরুরি। সংঘাত, প্রতিহিংসা কোনক্রমেই সংকট নিরসনের পথ হতে পারে না। আমরা সবাই এদেশের নাগরিক। একটি পরিবারের মত। যার প্রতিটি সদস্যের শান্তিতে বসবাস করার অধিকার আছে। সুতরাং আমরা সবাই মিলে সংঘাতের পথ পরিহার করে আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ উপায়ে বসবাস করব। দেশের বর্তমান সংকট নিরসনে সরকার ও বিরোধী দলগুলো গণতান্ত্রিক মনোভাব পোষণ করবে এই প্রত্যাশা দেশের সকলের।
লেখক: এম.এস.সি. ফলিত রসায়ন ও রাসায়নিক প্রযুক্তি বিভাগ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
