: আপনি তো সম্প্রতি শ্রমের জায়গা পাল্টেছেন।
: পাল্টেছি।
জায়গাটি কখনো কখনো পাল্টাবার সুযোগ পাওয়া ভালো। নতুন এক সেট বন্ধু পাওয়া যায়।
: পাল্টাবার সময় আপনার পুরনো সহকর্মীরা কি আপনাকে সংবর্ধনা দিয়েছে?
: দিয়েছে। একটি শুচিশুদ্ধ পবিত্র আয়োজনের মাধ্যমে তারা আমাকে শ্রমের একটি প্রকোষ্ঠ থেকে আরেকটি প্রকোষ্ঠে উঠিয়ে দিয়ে এসেছে। আত্মীয়-বান্ধব ও শুভার্থী-স্বজনেরা যেমন কোন শুভযাত্রার সময় কাউকে কিছুটা পথ এগিয়ে দেয়, অনেকটা তেমন করে।
: আপনার তখন কেমন লেগেছে?
: ওদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার বোধ যেমন ছিল, তার চেয়ে অনেক গুণ বেড়ে গেছে।
: কতগুণ বেড়েছে?
: মাপার যন্ত্র নেই। থাকতোও যদি সে যন্ত্র, প্রয়োগে ব্যবহারে আমি আগ্রহ দেখাতাম না। প্রথমত আমার প্রয়োজন নেই, দ্বিতীয়ত রুচিহীনতার অমন দৌরাত্ম্য আমার কাছে প্রশ্রয় পায় না।
: বিদায় নেয়ার সময় আপনি কি খুব শক্ত ছিলেন?
: খুব শক্ত চেষ্টা করেছিলাম শক্ত থাকার। কিন্তু পারিনি। ভেঙ্গে পড়েছিলাম। টিস্যু পেপারের বড় অপচয় করেছি। একবার ভেবেছিলাম, দু’মিনিটের জন্য উঠে যাই, মুখে জল ছিটিয়ে আসি, চোখ মুছে আসি, নাক ঝেড়ে আসি। শেষ পর্যন্ত তাও করিনি। রুমাল ভেজাতে ভেজাতে কোনভাবে টিকে থেকেছি।
: সহকর্মীদের সঙ্গে আপনার আচরণ কেমন ছিল? শ্রমের জায়গাটি আপনি কেমন দেখতে চাইতেন?
: যেদিন আমি যোগ দিয়েছিলাম আমার সর্বশেষ শ্রমের জায়গায়, আমি বলেছিলাম আমার সহকর্মীরা সময়মত দপ্তরে আসে আনন্দে ও হেসে হেসে এবং বিকেল বেলায় দপ্তর থেকে বেরিয়েও যাবে সময়মত, আনন্দে ও হেসে হেসে। নইলে তাদের দু’টি জীবন নষ্ট হবে- অফিসের জীবন ও আবাসের জীবন। আমি তাদের একটি জীবনও নষ্ট করতে চাই না। যদি আমার কক্ষে তাদের কখনো ডাক পড়ে, তাদের প্রসন্ন মুখে কখনো যেন আতঙ্কের ছায়া না পড়ে, তারা যেন হেসে হেসে ঢোকে এবং হেসে হেসেই বেরিয়ে যেতে পারে।
: এতে কাজ হয়েছে?
: হয়েছে । তাদের কাউকে কাউকে আমি এমনও পেয়েছি, যারা ডাক দেয়ার আগেই আমার হাতের কাজ কেড়ে নিতে এগিয়ে এসেছে এবং কাড়তে পেরে সন্তুষ্ট হয়েছে। আমার শ্রমের জায়গাটিতে পারিবারিক বাতাবরণ তৈরি করতে গিয়ে দেখেছি আমাকে ঠকতে হয়নি। কর্তৃত্বকে আমি স্নিগ্ধ করার চেষ্টায় শ্রম দিয়েছি। যারা মনে করে ‘পাওয়ার ইজ বেস্ট এক্সারসাইজড হোয়েন ইট ইজ সিরিয়াসলি এক্সারসাইজড’ (ক্ষমতার সর্বোত্তম প্রয়োগ তখনই হয়, যখন তা প্রবলভাবে প্রযুক্ত হয়), আমি তাদের স্কুলে ঢুকিনি; তাদের স্কুলই আমাকে টেনেছে, যারা মানে ‘পাওয়ার ইজ বেস্ট এক্সারসাইজড হোয়েন ইট ইজ নট এক্সারসাইজড’ (ক্ষমতার সর্বোত্তম প্রয়োগ তখনই ঘটে, যখন এটি ‘প্রযুক্ত হয় না’)।
: সহকর্মীদের মধ্যে আত্মীয় সন্ধানের বিষয়টি বুঝতে পারলাম না।
: অথচ, এই বিষয়টিই সবচেয়ে সহজে বোঝার। সম্বোধন যাই হোক, কারো মধ্যে ভাই, কারো মধ্যে বোন, কারো মধ্যে পুত্র ও কারো কন্যার ছবি বসিয়ে কাজ করা, কাজ চাপানো, কাজ নামানো, কাজ বাড়ানো, কাজ কমানো ও কাজ গুছোনো। এই কাজটি আমি শুরু করি খুব বড় বড় তিনটি শোক অসময়ে, অকারণে, অপ্রয়োজনে পাওয়ার পর। পিতৃশোক, মাতৃশোক ও পুত্রশোক।
: আজ আর কিছু জিজ্ঞেস করবো?
: এ মুহূর্তে অন্যকিছু জিজ্ঞেস করলে আমি আপনাকে মারতে দৌড়ুবো। আজ আর কিছু বলার মুড নেই।
লেখক :শ্রমজীবী কথাসাহিত্যিক
