এই দেশের রাজনীতির মহিমা অপার! ইহার মাহাত্ম্য বোঝা অসম্ভব প্রায়। রাজনীতিতে কূট চাল প্রয়োগ এবং প্রয়োজনে সত্যকে মিথ্যা ও মিথ্যাকে সত্য বলিয়া প্রচার করা মেকিয়াভেলির শিক্ষা হইতে প্রাপ্ত কৌশল হিসেবে বিবেচিত। রাজনীতি কোন এককালে জনগণের কল্যাণ সাধনের ব্রত হিসেবে স্বীকৃত এবং চর্চিত ছিল। এক্ষণে ‘সেই যুগ হইয়াছে বাসি’। আমরা এখন এমন এক যুগে বাস করিতেছি যে যুগে কিনা নিয়মিত অনিয়মই নিয়ম। মিথ্যাচারই সত্য বলিয়া প্রতিষ্ঠিত। জনদুর্ভোগ সৃষ্টিই জনকল্যাণের অপর নাম। আমাদের মতো সীমিত সম্পদের এই দেশে এতোরকম বুজরুকি দেখিতে দেখিতে জনগণের প্রাণবায়ু নিভু নিভু অবস্থায় আসিয়া ঠেকিয়াছে। তবে এই কথা ঠিক যে, রাজনীতিকরাই পারেন তাহাদের নিভু নিভু প্রাণপ্রদীপটিকে অনির্বান দ্বীপশিখায় পরিণত করিতে। আর সেই জন্য নীতিনিষ্ঠা, সত্সাহস, সততা, আন্তরিকতা, দেশপ্রেম ইত্যাদি অপরিহার্য। আবার এই গুণাবলী অর্জনের জন্য চাই নিয়মিত গণতান্ত্রিক চেতনার অনুশীলন। মোদ্দাকথা নিছক ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীস্বার্থ রাজনীতিককে গ্রাস করিলেই বিপদ।
মহাজোট সরকারের শরিক জাতীয় পার্টির (এরশাদ) প্রেসিডিয়াম সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী গোলাম মোহাম্মদ কাদের গত শুক্রবার লালমনিরহাটে এক জনসমাবেশে বলিয়াছেন যে, ‘বর্তমান সরকার স্বৈরাচার সরকার। তাহার মতে, এই সরকার জনগণের আস্থা হারাইয়া ফেলিয়াছে। তাই ইহাদের ক্ষমতায় থাকিবার কোন নৈতিক অধিকার নাই’। তিনি আরও বলিয়াছেন, এই সরকারের নেতৃত্বদাতা আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসিবার পর হইতে টেন্ডারবাজি, দলবাজি, চাঁদাবাজি, আর দলীয়করণে ব্যস্ত হইয়া পড়িয়াছে। ৯০-৯১ এর পর হইতে এই অবধি দেশে কোন সংসদই কার্যকর ছিল না বলিয়া তিনি উল্লেখ করিয়াছেন। মন্ত্রীবরের এই সকল কথা বা অভিযোগের সত্যাসত্য নির্ধারণের মালিক জনগণ। নির্বাচনে জনগণ তাহাদের এ বিষয়ক ভাবনার প্রতিফলন ঘটাইবে। কিন্তু আমরা ভাবিতেছি এই সরকারেরই একজন মন্ত্রী নিজ সরকারের বিরুদ্ধে এতগুলি কথা উচ্চারণ করিতে পারিলেন কোন যাদুমন্ত্র বলে! একটি নির্বাচিত সরকার কিরূপে স্বৈরাচারী সরকার হয় উহাও আমাদের বোধগম্য নহে। এই সরকার স্বৈরাচারী হইয়া থাকিলে এবং স্বৈরাচারী ব্যবস্থার প্রতি কোন প্রকার আগ্রহ আনুগত্য না থাকিলে সেই সরকারেরই মন্ত্রী পদে বহাল থাকার মাজেজা কি? সত্য সত্যই ইহা মন্ত্রীর মনের কথা হইয়া থাকিলে তিনি তাহার পদ হইতে পদত্যাগ করিতে এখনও পরাঙ্মুখ কেন এমন কথাও কোন কোন মহলে উচ্চারিত হইতেছে বৈকি! এই সরকারের সমালোচনায় তাহার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ও জাতীয় পার্টির স্রষ্টা এএইচএম এরশাদ অবশ্য প্রায়শই সকলকে ছাড়াইয়া যান। এবার জিএম কাদেরও কি তাহার অগ্রজের পদাংক অনুসরণে মনস্থ করিয়াছেন? নাকি এইগুলি ভোটের রাজনীতির ক্ষেত্রে অন্য সবাই যেমনটি করিয়া থাকে তেমনি জনসাধারণকে বোকা বানাইবারই মেকিয়াভেলীয় কৌশল মাত্র!
অন্যদিকে, সরকারের এক মন্ত্রীর এই ধরনের তীব্র ও ঝাঁঝালো সমালোচনায় প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই বিচলিত বোধ করিতেছেন না। তিনিও বিষয়টিকে হয়তো বা উপভোগ করিতেছেন। আসলে এই ক্ষেত্রে কি ঘটিতেছে উহা জনগণের পক্ষে হয়তো কখনই জানা বা বোঝা সম্ভব নহে। রাজনীতির যে কত মাহাত্ম্য মহিমা তাহা আমজনতা বুঝিবেই বা কী করিয়া। তাহাছাড়া, আদার ব্যাপারী হইয়া জাহাজের খবর লইতে চাওয়াটাও তো তাহাদের জন্য এক ধরনের বাড়াবাড়ি নয় কী!
