[ রা জ নী তি ]

অনিশ্চয়তার অন্ধকার আর কতোদিন

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০১৩, ২১:০২
কি হচ্ছে দেশে? রাজনীতির ঘটনাবলী ধাবিত হচ্ছে কোন্ পথে? বেশির ভাগ মানুষের মুখে মুখে এখন এটাই বড় প্রশ্ন। যতো মানুষের সাথে প্রতিদিন দেখা হয়, এমনকি আমাদের নিজেদের অথবা অন্যান্য রাজনৈতিক দলের যতো নেতা-কর্মীদের সাথে দেখা হয়, তাদের অধিকাংশই আজকাল দেখা হওয়া মাত্রই কথা শুরু করেন এ ধরনের প্রশ্ন দিয়ে। এমনকি, একই ব্যক্তির সাথে হরদম, কিম্বা সকাল-বিকাল দেখা হলেও, প্রতিবারই তার কাছ থেকে সেই একই প্রশ্ন বার বারই শুনতে হয়— ‘নতুন কোনো খবর আছে কি?’ মানুষের ধারণা যে, কি হতে যাচ্ছে সে বিষয়ে আমি হয়তো কিছুটা বেশি জানি। তাই আমাকে এই প্রশ্ন করে দেশে কি ঘটতে যাচ্ছে তা তারা জেনে নিতে চায়। দেশবাসী অনুভব করতে পারছে যে, দেশে সম্ভবত অস্বাভাবিক কিছু একটা ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। কিন্তু কি ঘটতে যাচ্ছে তা তাদের জানা নেই। তাছাড়া, একই ব্যক্তির কাছে একই প্রশ্নকর্তার ঘণ্টায় ঘণ্টায় সেই একই প্রশ্ন করাটা একথাই প্রমাণ করে যে মানুষের ধারণা হলো দেশে চলছে চরম রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। তাই, সকলের মনেই স্বাভাবিক ও বহুল জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন হলো— কি ঘটতে যাচ্ছে দেশের রাজনীতিতে? আমাকেও অনেকে একান্তে ডেকে নিয়ে প্রশ্ন করেন, —বলেন তো ভাই, আসলে কি হতে যাচ্ছে দেশে? কি জবাব দিবো এ প্রশ্নের? সবজান্তার ভাব করে তাকে হয়তো বানানো একটা জবাব দিতে পারি। কিন্তু এরকম ভুয়া ‘সবজান্তার’ ভাব দেখাতে আমার বাধে। বাংলাদেশের রাজনীতি যেসব শক্তি ও ঘটনা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে, সেগুলো বহুমাত্রিক। তাছাড়া, সেক্ষেত্রে রয়েছে দেশি ও বিশেষ করে বিদেশি উপাদান। এসব সম্পর্কে সব তথ্য তো আমার জানা নেই। তাই তথ্য-উপাত্ত না জেনে বলি কিভাবে যে কি ঘটতে যাচ্ছে দেশে। অবশ্য ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ থেকে অনেক ক্ষেত্রে অনুমান করা যায় যে সামনের দিনগুলোতে কি ঘটতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এরূপ বিশ্লেষণ এই সিদ্ধান্তেরই জন্ম দেয় যে, কি ঘটতে পারে তা ‘অনিশ্চিত’। দেশকে অনিশ্চয়তার মাঝে ঝুলিয়ে রাখতে আগ্রহী বিদেশি-দেশি শক্তির কারণেই দেশে আজ ‘স্থায়ী অনিশ্চয়তা’ বাসা বেঁধেছে। ‘অনিশ্চয়তাই’ যদি হয় দেশের রাজনীতির নিশ্চিত বৈশিষ্ট্য, তাহলে দেশে কি ঘটতে যাচ্ছে তা ষোলআনা নিশ্চিত করে বলতে পারাটা বিজ্ঞানসম্মতভাবে সম্ভব কি? তাই, যখন কেউ খুব জোর গলায় ‘কক্ শিওর’ হয়ে বলেন যে, আমি নিশ্চিত করে বলছি যে ঘটনাবলী এভাবে-ওভাবে ঘটবে, তখন তার ‘প্রতিভা’ দেখে হেসে ওঠা ছাড়া আর কিছু আমার করা হয়ে ওঠে না। কি হতে যাচ্ছে দেশে— এ ধরনের প্রশ্নের জবাবে তাই আমি সাধারণত বলি যে, দেশে শেষ পর্যন্ত কি হবে তা আমি বলতে পারছি না। অনেক কিছুই হওয়া সম্ভব। Many options are still open, এখনো অনেক বিকল্পই উন্মুক্ত। কিন্তু কোনোটাই নিশ্চিত নয়। কি ঘটতে চলেছে দেশে, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে সুনির্দিষ্ট জবাব দিতে না পারাটাকে আমি জ্ঞান-বুদ্ধি কম থাকার অভিপ্রকাশ বলে মনে করি না। বরঞ্চ ঠিক বিপরীতটাই সত্য বলে মনে করি। দেশের রাজনীতিতে আসলে কি ঘটতে যাচ্ছে— এরূপ প্রশ্নের জবাব দেয়ার জন্য আমি আজকাল অনেক সময় একটি অভিনব পন্থা অবলম্বন করে থাকি। প্রশ্নের জবাবে আমি বলি, —এ প্রশ্নের জবাব তো অতি সহজ। একটি ধাতব মুদ্রা (coin) আমি প্রথমে চেয়ে নেই। সেটি হাতে নিয়ে ক্রিকেট আম্পায়ারের মতো করে আঙ্গুল দিয়ে টস্ করার ভঙ্গিতে প্রশ্নকর্তাকে পাল্টা প্রশ্ন করি —এবার বলেন, হেড না টেইল। সবাই জানে যে টসে্ ধাতব মুদ্রার হেড অথবা টেইল-এর মধ্যে যেকোনো দিক উপরে উঠতে পারে। ফলাফল কি হবে তা অনিশ্চিত। ততোক্ষণে অধিকাংশ বুদ্ধিমান প্রশ্নকর্তাই আমার জবাবের আসল তাত্পর্য বুঝতে পেরে হেসে ওঠেন। আমি যে একথাই বলতে চাচ্ছি যে, দেশে কি হতে যাচ্ছে সে প্রশ্নের জবাব ধাতব মুদ্রা টস্ করে হেড না টেইল কোন দিকটি উঠবে তা বলতে পারার মতোই অনিশ্চিত তা ততোক্ষণে প্রশ্নকর্তার কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়। তবুও, এসবের মাঝেই দেশতো সচল রয়েছে। প্রতি মুহূর্তেই নানা ঘটনা ঘটছে। পরিপূর্ণ অনিশ্চয়তাই যদি একমাত্র বৈশিষ্ট্য হতো, তাহলে সবকিছু অনিশ্চয়তার আবরণে নিশ্চল হয়ে থাকতো। অনিশ্চয়তার মাঝেও পর্যায়ক্রমে ঘটনার পর ঘটনা এক সময় নিশ্চিত হয়ে ওঠে। কি ঘটবে সে সম্পর্কে সময় আসলে ভবিষ্যত্ বাণীও করা যায়। দেশের রাজনীতিতে ঠিক এই মুহূর্তে ‘অনেক বিকল্পই উন্মুক্ত’ মর্মে বিশ্লেষণটি সঠিক হলেও, এই অনিশ্চয়তার ধুম্রজাল এভাবেই সব সময় চলতে থাকবে, সে কথাও ঠিক নয়। অনেক বিকল্পের মাঝে এক সময় কোনো একটির বাস্তবায়নের সম্ভাবনা পরিপক্ক হয়ে উঠবে। তখনই কেবল তা ঘটার বিষয়টি নিশ্চিত হবে। দেশের রাজনীতিতে সেই নিশ্চিত হওয়ার সময়টি কাছে এসে গেছে। সংবিধান বহাল থাকলে ৭/৮ মাসের মধ্যে বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ হবে এবং সরকারকে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। কার কাছে সে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে? সে জবাব এই সময়ের মধ্যেই মীমাংসা করতে হবে। নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা দিতে হলে দেশে নির্বাচন করতে হবে। নির্বাচন সবাইকে নিয়ে হবে, না একতরফা হবে? নির্বাচন অনুষ্ঠান কোন্ সরকারের ও কি ব্যবস্থার অধীনে হবে? নাকি সবকিছুতে গোলমাল লাগায় নির্বাচিত সরকারের বদলে অন্য কারো কাছে ক্ষমতা চলে যাবে? এসব প্রশ্নের জবাবের ওপর নির্ভর করছে যে কোন্ বিকল্পের পথে দেশ যাবে। দেশের জন্য স্বাভাবিক বিকল্প হলো, দেশের প্রধান সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং যে শক্তি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পাবে তাদের দ্বারা গঠিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর। কিন্তু এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটি ধরে দেশের এগিয়ে যাওয়াটা বর্তমানে তেমন সহজ নয়। বরঞ্চ সেক্ষেত্রে জটিলতা প্রচুর। জটিলতার একটি প্রধান উত্স হলো, কি ধরনের ও কোন্ সরকারের অধীনে নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হবে যে বিষয়টি, সে বিষয় নিয়ে চলছে মতবিরোধ। এই মতবিরোধ এখন চূড়ান্ত অচলাবস্থার জন্ম দিয়েছে। দেশের বড় দুটি দল হলো আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পরিচালিত আন্দোলনের ফলে ৩ মাসের জন্য গঠিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান সম্বলিত ত্রয়োদশ সংশোধনী দেশের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। সে সময় বিএনপি এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে থাকলেও গণ-আন্দোলনের চাপে তাকে সে দাবি মেনে সংবিধান সংশোধন করতে হয়েছিল। এরপর তিনটি জাতীয় নির্বাচন এই ব্যবস্থার অধীনে হয়েছে। অবশ্য ২০০৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার সেনা সমর্থন নিয়ে ৩ মাসের জায়গায় সংবিধান লঙ্ঘন করে ২ বছর ক্ষমতায় থেকেছে। বর্তমানে বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সমর্থকই শুধু হয়ে ওঠেনি, তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ছাড়া তারা নির্বাচনে অংশ নেবে না এবং নির্বাচন হতেও দেবে না। এদিকে আওয়ামী লীগ এখন সমর্থকের বদলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিরোধী হয়ে উঠেছে। শুধু তাই নয়, তারা বলেছে যে দেশে কোনো অবস্থাতেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা হবে না। ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করিয়ে নিয়েছে। কোনোরকম আলোচনা-সমঝোতা ছাড়াই, এমনকি সংবিধান সংশোধনী বিষয়ক সংসদীয় কমিটির বছরাধিককাল সময় ধরে চলা বৈঠকে বিষয়টি যথাযথ সময় নিয়ে আলোচনা না করেই, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানটি বাতিল করার সিদ্ধান্তটি শেষ মুহূর্তে উত্থাপন ও পাস করা হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের একটি প্রধান যুক্তি হলো, সুপ্রিম কোর্টের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক বলে আখ্যায়িত করে তা বাতিল বলে ঘোষিত হয়েছে। তাই, সংসদ সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধাচরণ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখতে পারে না। সেরূপ করলে তা আদালতের রায় অমান্য করার মতো অপরাধমূলক কাজ হবে। আওয়ামী লীগের এই যুক্তি সঠিক নয়। কারণ সুপ্রিম কোর্টের সেই একই রায়ে আগে-ভাগেই বলে দেয়া হয়েছিল যে আগামী ২ মেয়াদের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রেখে (তবে সে ক্ষেত্রে সদ্য বিদায়ী প্রধান বিচারপতি ব্যতীত অন্য কাউকে প্রধান উপদেষ্টা করার ব্যবস্থা রাখতে হবে) সংসদে আইন প্রণীত হলে তা সংবিধানের লঙ্ঘন বলে বিবেচিত হবে না। সুতরাং দুই মেয়াদের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান রেখে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী করার বিষয়ে কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকলেও, তা করার ষোলআনা সুযোগ ও অধিকার আওয়ামী লীগের ছিল। সে যে সেই পথ গ্রহণ করেনি সেটি একান্তই তার রাজনৈতিক বিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত ছিল, সেটি সংবিধানসম্মত বা আইনসম্মত হতো কি-না, সেই বিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত তা মোটেও ছিল না। সচেতন মহলের অনেকের ধারণা হলো, বিএনপির জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণ অসম্ভব করে তোলার রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসাবেই আওয়ামী লীগ এভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিধান বাতিল করেছে। তার প্রকৃত ‘খেলাটি’ হলো দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য আওয়ামী সরকারের শাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে থাকতে বাধ্য করে একতরফা নির্বাচনে জিতে আসা। তাদের হিসেব হলো, যদি এভাবে বিএনপিকে একটানা ১২ বছর ক্ষমতার বাইরে রাখা যায় তাহলে বিএনপির মতো দল টিকে থাকতে পারবে না। এভাবে বিএনপি সমস্যার স্থায়ী সমাধান (!) ঘটানো সম্ভব হবে। তার বিবেচনায় এই কৌশলের ক্ষেত্রে সমস্যা শুধু একটিই। তা হলো সেরূপ নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা। সে ক্ষেত্রেও তার বুদ্ধি আঁটা আছে। জাতীয় পার্টিকে বিরোধী দল হিসেবে মাঠে নামাতে হবে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও জামায়াতের নিষিদ্ধকরণ প্রশ্নে তাদের সাথে দর কষাকষি করে জামায়াতকে নির্বাচনে অংশ নিতে বাধ্য করাতে হবে। বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনাপূর্ণ বিএনপির বেশ কিছু নেতাকে দ্রুত বিচার আদালতে সাজা দিয়ে তাদের প্রার্থী হওয়ার পথ রুদ্ধ করাতে হবে। তাছাড়া, সম্ভব হলে বিএনপিকে ভাগ করে একটি অংশকে দিয়ে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করাতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের পরিকল্পনা এই কৌশলেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ইস্যুটি এভাবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে বিরোধের প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে। কি ব্যবস্থায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এই বিষয়ে সমঝোতা প্রতিষ্ঠা করে সে মোতাবেক ব্যবস্থা নিয়ে সরকার যদি অগ্রসর হয়, তাহলে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া স্বাভাবিক ধারায় অগ্রসর হবে। কিন্তু যদি এই ইস্যুতে সমঝোতা না হয় তাহলে সরকার বিএনপিকে বাদ দিয়ে একতরফা নির্বাচনের পথ গ্রহণ করতে পারে। সেক্ষেত্রে অবশ্য বিএনপির জন্য ‘কোনো কিছুই বিনা চ্যালেঞ্জে যেতে দেবো না’ বলে নির্বাচনী লড়াইয়ে সামিল হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। এক্ষেত্রে অবশ্য বিএনপির জন্য অন্য বিকল্পটি হলো নির্বাচন বর্জন করে ‘প্রহসনের নির্বাচন’ প্রতিহত করার জন্য রাজপথে সংগ্রাম করা। এ ধরনের সংঘাতের পরিস্থিতির মধ্যে একতরফা নির্বাচন টেকিনক্যালভাবে করিয়ে নিতে পারা সম্ভব হলেও, দেশে নৈরাজ্যমূলক অনিশ্চয়তার পরিস্থিতি যেন অব্যাহত না থাকে তা নিশ্চিত করা এর দ্বারা সম্ভব নাও হতে পারে। ফলে দেশের রাজনীতির সংকট দূর না হয়ে তা নতুনভাবে যে জেগে উঠবে না তার কোনো নিশ্চয়তা অর্জন এভাবে সম্ভব না হওয়ার আশংকাই বেশি। কিন্তু গোটা পরিস্থিতি এর আগেই সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে মোড় নিতে পারে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে। জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ করার আওয়াজও জোরদার হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে জামায়াত-শিবির মরিয়া হয়ে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একধরনের যুদ্ধাভিযান চালাচ্ছে। জামায়াতের সহিংস তাণ্ডবে চতুর্দিকে এক বিপজ্জনক অবস্থা তৈরি হয়েছে। ক্ষমতার ইস্যুতে বিএনপিও মরিয়া। জামায়াতের ঘর পোড়ার মধ্যে বিএনপি আলু পোড়া দিয়ে সুবিধা নিতে নেমেছে। পরিস্থিতি আরো অনিয়ন্ত্রিত হয়ে উঠলে সরকার জরুরি আইন জারি করে অবস্থা সামাল দেয়ার চেষ্টা করতে পারে। এদিকে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রী উভয়ই একাধিকবার বলেছেন যে, দেশে ওয়ান-ইলেভেনের প্লেয়াররা নিষ্ক্রিয় নয় এবং ওয়ান-ইলেভেনের এ্যাজেন্ডা এখনো সচল রয়েছে। তাই, সেনা সমর্থিত ‘হস্তক্ষেপের’ বিকল্প দৃশ্যপটের আবির্ভাবের আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। বিপরীত দিক থেকে হিসেব করলে বলা যায় যে, সাম্রাজ্যবাদী বিদেশি শক্তি তাদের ভূ-রাজনৈতিক স্ট্র্যাটাজির প্রয়োজনে এদেশে একটি দুর্বল সরকার ও নিয়ন্ত্রিত নৈরাজ্যের অবস্থা সৃষ্টি করে রাখার জন্য হয়তো ‘হস্তক্ষেপের’ ফর্মুলায় মদদ দিয়ে চলছেন। সেই পরিণতির দিকে দেশকে নিয়ে যাওয়ার জন্য তারা মুখে গণতন্ত্র, নির্বাচন ইত্যাদি সম্পর্কে বড় গলায় বক্তব্য দিলেও পেছন থেকে জামায়াতের তাণ্ডবকে উস্কানী দিবে এবং আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সম্পর্কে মতপার্থক্য বাড়িয়ে তুলে দেশকে অচলাবস্থার দিকে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করবে। কোন্টা কারণ ও কোন্টা ফলাফল— তা নিয়ে দু’রকম কথা বলার সুযোগ আছে। অস্থিরতা থেকে দেশকে উদ্ধারের জন্য ‘হস্তক্ষেপ’ ঘটা যেমন সম্ভব, ঠিক তেমনি ‘হস্তক্ষেপের’ প্রেক্ষাপট প্রস্তুতের জন্য অস্থিরতা, সহিংসতা, অচলাবস্থা সৃষ্টির পাঁয়তারা করা হচ্ছে এমনটিও অসম্ভব নয়। তিন দিক থেকে খেলা চলছে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও ‘হস্তক্ষেপের’ শক্তি— এগুলোই হলো সেই তিন প্লেয়ার। কোন পথে দেশ আগাবে সে সম্পর্কে অপশন বা বিকল্প আছে অনেকগুলো। সময় হয়ে এসেছে স্থির হয়ে যাওয়ার যে, কোন্ বিকল্প শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে। কিন্তু যে অপশনেই দেশকে নিয়ে যাওয়া হোক না কেন, যতোদিন এই তিন পক্ষ দেশের রাজনীতির মূল প্লেয়ার হয়ে থাকবে, তাদের কারো নেতৃত্বে সংগঠিত কোনো অপশনই দেশের ‘অনিশ্চয়তার’ উপাদানকে অপসারিত করতে পারবে না। তা করতে হলে দেশবাসীকে ভাবতে ও চলতে হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে ও ভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি ও সামাজিক শ্রেণি শক্তির নেতৃত্বে। লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি E-mail : [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন