আলোকপাত

প্রসঙ্গ :ধর্মনিরপেক্ষতা

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০১৩, ২১:০২
১৯৭০ সালের পাকিস্তানে যে নির্বাচন হয়েছিল সে নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগকে শতকরা ৯৮% ভাগ ভোট দিয়ে বিপুলভাবে জয়যুক্ত করেছিল। পূর্ব পাকিস্তানের মোট ১৬৯টি আসনের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ১৬৭টি আসনে জয়লাভ করে। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জনসভায় দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু বলতেন- ৬ দফা বাস্তবায়ন করতে হবে এবং তার মাধ্যমে বাঙালিদের উপর দুঃশাসন ও শোষণ বন্ধ করতে হবে। তিনি আরো বলতেন- দেশের মূলনীতি হবে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ। বঙ্গবন্ধু বলতেন, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। সকল ধর্মের ধর্মপালনে সমান অধিকার থাকবে। প্রতিটি মিটিং-এ ঢাকা থেকে শুরু করে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামে পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু জনসভা করেছেন ও বাঙালিদের ধর্মনিরপেক্ষ দেশ হবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সাড়ে সাত কোটি মানুষ মনে-প্রাণে দেশে ধর্মনিরপেক্ষতা মেনে নিয়েছেন। বাঙালিরা সবসময়ই জানত বঙ্গবন্ধু ছিলেন খুবই ধার্মিক ও ধর্মনিরপেক্ষ। ১৯৭০ সালে প্রকৃতপক্ষে পুরো দেশের সিদ্ধান্ত বঙ্গবন্ধুর উপর ছেড়ে দিয়েছিল। সমগ্র বাঙালির যেখানে সবাই ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে বিশ্বাস স্থাপন করেছে সেখানে জামায়াতে ইসলামীর মত একটি অতি ক্ষুদ্র দল দেশটিকে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র বানানোর অপচেষ্টা হিসাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে ও জনগণের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। জনগণের উপর জামায়াতে ইসলামীর আক্রোশ সৃষ্টি হল। তারা জনগণের উপর আঘাত হেনে বদলা নিতে চায়। পাকিস্তানিরা যখন বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা না দিয়ে বাঙালি নিধন করার জন ২৫ মার্চ রাতে বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল তখন বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার মাধ্যমে সাড়ে সাত কোটি মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ল। এ অবস্থায় এদেশের কিছু মানুষ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষ অবলম্বন করে বাঙালি নিধনে মেতে উঠল। পাকিস্তানি সৈনিকরা ও কিছু পথভ্রষ্ট মিলে এদেশের ৩০ লাখ মানুষ হত্যা করল, ২ লাখ মা-বোনের ইজ্জত লুণ্ঠন করল। বাঙালিদের ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিল। বাঙালিরা বীরবিক্রমে যুদ্ধ করে মাত্র ৯ মাসে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকার-আলবদর, আল-শামস পিস কমিটির সদস্যদের পরাজিত করে দেশ স্বাধীন করল। অবশেষে বাঙালিরা একটি গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ সৃষ্টি করল। এ দেশের রাজাকার-আলবদর, আল-শামস বন্দী হল এবং যুদ্ধাপরাধী বিচারের সম্মুখীন হল। বাঙালিরা রাজাকারদের নির্বিচারে হত্যা করতে পারত। কিন্তু তা না করে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে রাজাকারদের বিচারের সম্মুখীন করল। যুদ্ধাপরাধীর বিচার চলছিল। ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ বিশ্বে সুনামের সঙ্গে আগাচ্ছিল। এমতাবস্থায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করলো। দেশের রাজনীতির পটপরিবর্তন হলো। গণতন্ত্র বন্দি হলো সেনাবাহিনীর হাতে। তারা আলবদর-আলশামসকে আবার স্বীকৃতি দিল এবং তাদের হাতধরে ক্ষমতায় এলো। এর পরের ইতিহাস সবারই জানা। শুধু তাই নয়, রাজাকাররা ক্ষমতার মসনদে আরোহণ করলো। কেউবা উপদেষ্টা হলো, কেউবা মন্ত্রী। ভোট ডাকাতির নির্বাচন করে নিজেকে জয়যুক্ত দেখালো। সংবিধান পরিবর্তন করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বিসর্জন দিয়ে সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দিয়ে একটি মধ্যযুগীয় ও সাম্প্রদায়িক সংবিধান তৈরি করল। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত হল। বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে দেয়া হল। এভাবে ২১ বছর বাংলাদেশ অন্ধকারে অবস্থান করে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ইতিহাসকে মুক্ত করলেও সংবিধান সংশোধন করবার মত প্রয়োজনীয় আসন পেল না। ২০০৯-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তিন-চতুর্থাংশ আসন পাওয়ার পর সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা স্থান পেল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানে বিসমিল্লাহ এবং রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল রাখল, বাংলাদেশ বর্তমানে গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। ব্লগে যারা ইসলাম ও রসুলকে (সঃ) কটূক্তি করে তাদেরকে সরকার গ্রেফতার করেছে। সরকার সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করেছে। অর্থাত্ ইসলাম-বিরোধী, ধর্ম-বিরোধী যে কোন তত্পরতার বিরুদ্ধে সরকার পদক্ষেপ নিয়েছে। এরপরেও দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে যুদ্ধাপরাধীর বিচার বানচাল করার চেষ্টা করা হলে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ। দেশে চলছে আজ অরাজকতা। ধ্বংস হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য, ধ্বংস হচ্ছে শিল্প-কারখানা, হিংস্র হরতালে কেড়ে নিচ্ছে তাজা প্রাণ। জানি না দেশ কোথায় কি ঠেকবে। যারা যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে চায়, যারা হরতাল দেয় তাদেরকে একদিন বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। লেখক :সাবেক ব্যাংকার ও ছাত্রনেতা

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন