শান্তির পথে ফিরে আসুক দেশ

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০১৩, ২১:৩১
দেশজুড়ে কেবল অশান্তির দাবানল। জনগণ শান্তি চায়। উড়াল সড়ক চায় না, চায় না পাতাল সড়ক, পদ্মা সেতু কিংবা মেট্রোরেল। হরতাল চায় না ,ভাংচুর চায় না, জীবন্ত মানুষ পোড়ানো চায় না, গুলিবিদ্ধ লাশ চায় না, রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে মুক্তি চায়। ধন-দৌলত কিছুই চায় না, দেশে একটু শান্তি চায়। চুরি,ছিনতাই,গুম,হত্যা চায় না; দেশের প্রতিটা মানুষের সম্পদ আর স্বজনদের জীবনের নিরাপত্তা চায়, চায় একটু স্বস্তি। ঘুমানোর সময় সবাই ঘুমাতে চায়। সকালে সংবাদপত্র খুলে ভাল খবর পড়তে চায়। রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের মারামারি আর পুলিশের গোলাগুলি দেখতে দেখতে দেশের মানুষ আজ ভীত-সন্ত্রস্ত, ক্লান্ত। আর কতদিন এভাবে চলবে? রক্তমাখা লাশ! জ্বালাও পোড়াও? গোলাগুলি; নৈরাজ্য? এমন শান্তি চায় না জনগণ। বিরোধী দল আর সরকার দলের ক্ষমতার লড়াইয়ে বলি হতে চায় না সাধারণ মানুষ। হরতালের নামে দেশ স্তব্ধ করে দেয়া, আর সরকার দলের নিপীড়নে বড্ড অশান্তি; অস্বস্তিতে আছে দেশের আমজনতা। আগুন, ধ্বংসস্তূপ আর অসংখ্য লাশের সারির মাঝেও বিরোধী দলগুলোর মিছে শান্তির আশ্বাস আর সরকার দলের উন্নয়নের ফুলঝুরিতে জনগণ প্রচণ্ড বিরক্ত, ক্ষুব্ধ, ক্লান্ত। দেশে এখন রাজনীতির নামে চলছে হানাহানি, গালাগালি, খুনাখুনি, চুরি, ডাকাতি, লুণ্ঠনসহ যাবতীয় অরাজনৈতিক কর্ম। সভ্যতা, মানবতা , সহনশীলতা, ভালোবাসা আজ নির্বাসিত এদেশের রাজনীতি থেকে। ভদ্র, সভ্য, জ্ঞানী মানুষেরা রাজনীতির নাম শুনলে এখন আঁঁতকে ওঠেন। অসভ্যতা, নোংরামি, হিংস্রতা, দুর্নীতি, প্রতিহিংসা পরায়ণতা, সন্ত্রাস, খুনসহ অপরাধের সমস্ত কিছুই বর্তমান এদেশের রাজনীতিতে। রাজনীতি আজ নোংরা, ঘৃণ্য, অপাংতেয় ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এর নাম রাজনীতি হতে পারে না। আজ বিরোধী দলের জ্বালাও, পোড়াও নীতি। দিনের পর দিন হরতাল, ধাওয়া পাল্টা ধাওয়াসহ নানান অপকর্ম দেশের শান্তি প্রিয় সাধারণ মানুষসহ বিশ্ববাসীকেও হতাশ করেছে বৈকি। বৃহত্তর দুটি রাজনৈতিক দলের সহিংস চলমান রাজনীতি বর্তমানে এমন পর্যায়ে যে, এভাবে দীর্ঘদিন চলতে থাকলে নিজেদের হাতেই জাতি ধ্বংস হতে কতক্ষণ? কোথায় আজ সত্যিকারের রাজনীতি? রাজ কোথায়? আর নীতিই বা কোথায়? নির্বাচন আর ক্ষমতার পালাবদলের নামে যা হচ্ছে তা মোটেও রাজনীতি নয়। তা কেবলই সন্ত্রাস। ক্ষমতার মোহে অন্ধ হওয়া পথভ্রষ্ট নেতারাই কেবল তা করতে পারেন। জনগণ নিরপেক্ষ নির্বাচনের পক্ষে; সংঘাতের পক্ষে নয়। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতার পালাবদলের খেলায় জনগণ কেন বলি হবে? দেশের সম্পদ কেন এভাবে নষ্ট করা হবে? দেশের অর্থনীতিতে কেন আঘাত হানা হচ্ছে? আরও একটি বিষয়ের প্রতি অবশ্যই নজর দিতে হবে। এদেশে অসংখ্য ধর্মপ্রাণ মুসলমান আছে। তারা ধর্মের অবমাননা চায় না। এ কথাও সত্য যারা ধর্মের অবমাননা করেছে তা হাতে গোনা কয়েকজন। গুটিকয় নষ্ট মানুষের জন্য বিরোধী দলের যেমন গোটা দেশ অশান্ত করা সমীচীন নয়, তেমনই ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের চাওয়া পাওয়ার মূল্যও দিতে হবে সরকারকে। এক্ষেত্রে ইসলাম বিরোধী ব্লগারদের কোন প্রকার সময় ক্ষেপণ না করে চিহ্নিত করতে হবে। দেশের শান্তির লক্ষ্যে, ইসলামের স্বার্থে তাদেরকে দ্রুত বিচার আইনে বিচারের আওতায় আনতে হবে। যে কোন মূল্যে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তা ছাড়া আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোকে এমন প্রশ্নে কোন প্রকার উস্কানি কিংবা রাজনীতি করা থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে। আমি বিশ্বাস করি আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো উপরোক্ত বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় এনে বাস্তবে রূপ দিলে দেশে চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট আর থাকবে না। শক্তির খেলা অনেক হয়েছে। দেশের দুটি প্রধান রাজনৈতিক গোষ্ঠীর আচরণ তাই নির্দেশ করছে। দুটি বাহুবলী শিবির, দুটি হুঙ্কার ব্যবস্থা তাই বলছে। আমাদের জনগণও বুঝে গেছে, কি চাইছে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি। আর জামায়াত শিবিরের চাওয়া-পাওয়াতো দেশবাসীর কাছে স্পষ্টই। এই তিন-এর মরণপণ লড়াই, কার ভাগে কতো লোক, তা প্রমাণ করে রাজনীতি খেলার ফলাফল নিশ্চিত করার ইঁদুর-দৌড় চলছে তো চলছেই। আজকাল আমাদের নেতারাও রাজনীতি বলতে তাই বোঝেন, নেতাদের অনুসারী মনুষ্য সাধারণও রাজনীতির নামে তারই আরাধনা করেন। সংখ্যার বিরুদ্ধে সংখ্যা দিয়ে টক্কর, সমাবেশের বিরুদ্ধে সমাবেশ দিয়ে, কর্মসূচির বিরুদ্ধে পাল্টা কর্মসূচি দিয়ে, জানের বদলে জান নিয়ে খেলা চলছে দেশ জুড়ে। গণতন্ত্রের রাজনীতিতে তার অধিক আর কী চাই? সরকার পক্ষও জানে, বিরোধী পক্ষও জানে, গণতন্ত্রের অর্থই সংখ্যাতন্ত্র, রাস্তায় সংখ্যা নামিয়ে গুণে নেয়ার তন্ত্র। যাতে এর পর আদর্শ, উদ্দেশ্য, পথ, পাথেয়, কোনো তর্কেই আর অবকাশ না থাকে সে ব্যবস্থা করা। সুতরাং গত কয়েক মাস ধরে সেই এক ও অদ্বিতীয় সংখ্যাতন্ত্রের আরাধনা চলছে দেশজুড়ে। অবশ্য আরও কিছু সময় আগে থেকেই শুরু হয়েছে লড়াই। রাজনীতিতে টানটান অবস্থা দেশজুড়ে। দেখা গেল পিঠেপিঠি মিছিলের উচ্ছ্বাস, উেরাল, প্রতিযোগিতা, দেখিয়ে দিবার উত্তুঙ্গ শক্তি। বিরোধী পক্ষের একটি মিছিলের উত্তরে সরকার পক্ষের কোমর বেঁধে দু’দুটি মিছিলের ব্যবস্থা। ফলো-আপ কিংবা ফলো-অন, যে নামেই তাকে ভূষিত করা হোক না কেন, যুক্তিটি প্রকৃতপক্ষে অত্যন্ত সহজ। সরকারি ক্ষমতার প্রদর্শন বলে কথা। ক্ষমতার অর্থ কী, পুলিশ বাহিনী দিয়ে দলীয় স্বার্থ রক্ষা? সমাবেশে আসতে না দেয়া? পথরোধ করে দেয়া? আর হরতালের নামে আগের দিন থেকেই গাড়ি ভাংচুর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়া। সরকারি দল যেমনটা; অন্যদিকে বিরোধী দলও কম নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর টক্কর দেয়ার খেলায় ব্যবসা-বাণিজ্যে নিদারুণ ক্ষতি হচ্ছে। ব্যবসায়ী মহল থেকে বলা হচ্ছে তারা শিল্প-কারখানা গার্মেন্টস চালাতে পারছেন না। বন্ধ করে দিতে হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য। ব্যবসায়ীদের শত অনুরোধও বিরোধী দল মানলেন না। আজকাল জনসমর্থন অবশ্য বোঝা মুশকিল। কোন সমাবেশেই লোকসমাগমের কমতি দেখি না! বর্তমানে এরশাদের সমাবেশও তো মহাসমাবেশে পরিণত হয়। সমাবেশের লোক গুণে জনসমর্থন নিরূপণ মুশকিলই বটে। নিন্দুকেরা অবশ্য প্রশ্ন তুলতেই পারেন, বিরোধীরা সরকারি অপশাসনের ধোয়া তুলবেই, তাই তাদের মিছিলের যুক্তিটি যদিবা তর্কের খাতিরে মেনে নেয়া যায়, সরকারি মিছিলের উদ্দেশ্য কিংবা বিধেয়টি ঠিক কী? সরকার তো নিজেই প্রশাসন, তা হলে প্রশাসন স্তব্ধ করে সড়ক মহাসড়কে মানুষের ঢল নামিয়ে সরকারপক্ষ কী প্রমাণ করতে চায়? প্রতিটি হরতালের সময়ই দেখি মাঠ দখলে নেয় সরকারি দল। বাস্তব হলো, শোভনীয় না হলেও লোভনীয় অবশ্যই। আমাদের সরকারি দল তাই বৃহত্তর সংখ্যার ব্যবস্থা করতে ছুটছেন, কোনো ফাঁক রাখেননি, অকাতরে মানুষ আমদানি করা হচ্ছে চতুর্দিক থেকে। যেমনটা করেছেন আমাদের বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াও। চাই চাই তাদের লোক চাই। শক্তির কসরত চাই। যেন না হারি কিছুতেই। আর তাদের এমন চাওয়া-পাওয়ায় যে দেশের মানুষের জানকবজ হওয়ার জো হয় তা কি তারা ভাবেন কখনো। ভাবার কথা নয়, ভাবলে হয়তো সমঝোতার পথে আসতেন তারা। তা কখনোই হয়নি। হয়তো হবেও না। সমঝোতা হলে দেশের মানুষ সুখ পাবে; শান্তি পাবে। জনগণের এমন সুখ-শান্তির দরকারই বা কি আমাদের নেত্রীদ্বয়ের। যে যাই বলুক ঘুরে ফিরে চিত্র সেই একই। ‘যেই লাউ সেই কদু আর কি।’ মানুষ দেখবে না কোন পরিবর্তন। সহসা শান্তি আসবে না। স্বস্তি ফিরে পাবে না মানুষ। আমরা এর পরির্বতন চাই। প্রতিবাদ চাই, প্রতিরোধ চাই। রাজনীতি হোক মানুষের কল্যাণে। কোনভাবেই, কোন অজুহাতেই জনধ্বংস বা সম্পত্তি ধ্বংস বা গোলযোগ সৃষ্টি বা ‘কঠোর হাতে’ মোকাবিলা, বা কঠিন কর্মসূচি প্রত্যাশিত নয়। আশাকরি জনগণের তথা দেশের শান্তি সমৃদ্ধির কথা ভেবেই আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর শুভবুদ্ধির উদয় হবে এটাই প্রত্যাশা। লেখক :সাংবাদিক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন