ধরাজনৈতিক অস্থিরতায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে শহর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জ, পথে-প্রান্তরে। একের পর এক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অস্থির হয়ে উঠছে সারাদেশ। এই অস্থিরতা থেকে শিক্ষাঙ্গনও মুক্ত নয়। ধারাবাহিকভাবে হরতালের ফলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন আজ হুমকির মুখে। ভয়াবহ সেশনজটের কবলে তাদের শিক্ষাজীবন। ভেঙ্গে পড়ছে সারাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা। যদিও শিক্ষার্থীরা সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধন করে বিরোধী দলকে হরতাল না দেয়ার আহবান জানিয়েছে। কিন্তু বিধি বাম! বিরোধী দল উক্ত কোমলমতি শিক্ষার্থীদের অহিংস আহবানকে কোনরকম পাত্তা দেয়াতো দূরের কথা, বরং শুরু করেছে লাগাতার হরতাল-অবরোধের মত সহিংস কর্মসূচি। ফলে সারা দেশের স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক শিক্ষা কার্যক্রম বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। সদ্য সমাপ্ত এসএসসি পরীক্ষার মত চলমান এইচএসসি পরীক্ষার রুটিনও একের পর এক পরিবর্তন করতে হচ্ছে। এভাবে রুটিন পরিবর্তন করেও শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা যথাসময়ে শেষ করা যাবে না ওই আশংকাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ছুটির দিন শুক্র ও শনিবারেও পরীক্ষা গ্রহণ করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুক্রবারে ক্লাস-পরীক্ষা নিচ্ছে। কিন্তু কেবলমাত্র ছুটির দিনগুলোতে ক্লাস-পরীক্ষা নিয়ে শেষপর্যন্ত উক্ত ক্ষতি কতটুকু কাটিয়ে ওঠা যাবে সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
হরতালের কারণে একের পর এক রুটিন পরিবর্তন সত্ত্বেও চলমান এইচএসসি পরীক্ষা যথাসময়ে শেষ করা সম্ভব হবে না, সে কথা হলফ করে বলা যায়। বিপত্তি দেখা দেবে, ব্যবহারিক পরীক্ষার ক্ষেত্রেও। উপরন্তু, গণজাগরণ মঞ্চসহ ২৭টি সংগঠন হেফাজতের গণজমায়েতকে কেন্দ্র করে শুক্র ও শনিবার হরতাল দিয়ে যে নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তাতে সেই আশায়ও গুড়েবালি। ভবিষ্যতে গণজাগরণ মঞ্চকে অনুসরণ করে অন্যকোন সংগঠন ছুটির দিনগুলোতেও হরতাল আহবান করে, তবে শিক্ষার্থীদের পড়া-লেখা শিকেয় তুলে রাখা ছাড়া গত্যন্তর নেই। শুধু এসএসসি পরীক্ষা নয়, প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রের শিক্ষাব্যবস্থা আজ ভেঙ্গে পড়ছে। দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে শিক্ষা কার্যক্রমে এত বড় বিপর্যয় স্বাধীন বাংলাদেশে এবারই প্রথম। ইতিপূর্বে রাজনৈতিক দলগুলো হরতাল আহবানের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার তারিখগুলো বিবেচনা করত। তারা যেদিন এসএসসি অথবা এইচএসসি পরীক্ষা থাকত ওইদিনে কখনো হরতাল আহবান করেনি। কিন্তু এবার সব নীতি নৈতিকতা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির ব্যত্যয় ঘটিয়ে এসএসসি পরীক্ষার দিন হরতাল আহবান করা হয়েছে। চলমান এইচএসসি পরীক্ষার সময়ও একই ঘটনা ঘটছে। ফলে বিপাকে পড়েছে পাবলিক পরীক্ষাতে অংশ নেয়া হাজার হাজার শিক্ষার্থী।
সাধারণত ফেব্রুয়ারি থেকে মে— এই সময়টা শিক্ষার্থীদের জন্য পিক আওয়ার। জানুয়ারিতে নতুন শিক্ষা বর্ষে উত্তীর্ণ হওয়ার ফলে সবকিছু গুছিয়ে নিতে নিতে ফেব্রুয়ারি এসে যায়। তাই স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাতে ফেব্রুয়ারি মাসে এসে পুরোদমে পড়ালেখা শুরু হয়। মার্চ ও মে মাস টানা ক্লাস চলে। এরপর শিক্ষার্থীদের খুব বেশি শ্রেণীকক্ষে পাঠ গ্রহণের সুযোগ নেই। অর্ধ-বার্ষিকী পরীক্ষা, গ্রীষ্মের ছুটি, ঈদ, পূজা-পার্বণ এবং শীতের ছুটির মধ্যদিয়ে তাদের শিক্ষাবর্ষ শেষ হয়। জানুয়ারি থেকে মে সরকারি হিসেবেও ছুটির সংখ্যা কম। তাই ওই সময় সরকারি ছুটি ও উত্সব প্রায় না থাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে একটানা ক্লাস চলে। ওই সময়ে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানসমূহ শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখর থাকে। কিন্তু এই বছর শিক্ষার্থীদের ওই পিক আওয়ারে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে প্রায় দিনই অঘোষিত ছুটি পালিত হচ্ছে। এই কারণে যথাসময়ে সিলেবাস শেষ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবর্ষ শেষ করতে চাইলে সিলেবাস অসম্পূর্ণ রেখেই অথবা সিলেবাস থেকে অনেক কিছু বাদ দিয়েই পরীক্ষা গ্রহণ করতে হবে। এই পদ্ধতিতে হয়ত শিক্ষার্থীরা পরবর্তী শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হবে অথবা তাদেরকে উত্তীর্ণ করা হবে এবং এভাবে তাদেরকে সনদপত্র দেয়া হবে অথবা তারা সনদপত্র লাভ করবে -সেটা যাই হোক না কেন; বাস্তবতা হচ্ছে, এভাবে সার্টিফিকেট অর্জন করা গেলেও শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য অধরা থেকে যাবে। উপরন্তু, যেখানে সারাবছর শিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করার পরও এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা নিয়ে আজ প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাতে উভয় পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া অধিকাংশ শিক্ষার্থী ফেল করছে। সেখানে এই রকম তড়িঘড়ি করে পাঠদান সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীদের মান কেমন হবে, তা সহজে অনুমান করা যায়।
পরিশেষে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি যদি আরো দীর্ঘায়ু লাভ করে, তবে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন আরো দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হবে, তাতে সন্দেহ নেই। সরকারি ও বিরোধী দল পরস্পর আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে ভাল হয়। বর্তমানে অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ভেঙ্গে পড়া শিক্ষাব্যবস্থাকে শক্ত করে দাঁড় করিয়ে তা অব্যাহত রাখতে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। উপরে যে কয়টি দাবি পেশ করা হয়েছে সে বিষয়ে জাতীয় সংসদে আইন পাস করা যেতে পারে। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনের মালিক মহাজোট সরকার চাইলেই এমন আইন পাস করা অসম্ভব নয়। আর আমরা বিশ্বাস করি যে, এই আইনগুলো পাস ও তার বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা শনির রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত হবে। বন্ধ হবে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে নষ্ট রাজনীতির খেলা।
লেখক : শিক্ষক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
