জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গ

আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০১৩, ২১:৫৭
এই দেশটিতে মনে হয় এখন একে একে সকলেরই কাণ্ডজ্ঞান লুপ্ত হইতে চলিয়াছে। সবকিছু ফ্রি স্টাইলে চলা যেন এখনকার নিয়ম। তাই আমরা যেন কাহারও মধ্যেই কোন প্রকার স্থিরমতিত্ব দেখিতে পাইতেছি না। ইহা যে কি নিদারুণ দুঃখের বিষয় তাহা বোধ করি কাহাকেও বলিয়া বুঝাইবার প্রয়োজন পড়ে না। নৈরাজ্য-বিশৃঙ্খলা এইগুলি সৃষ্টির মধ্যেই যেন আমাদের অধিকাংশ মানুষ আনন্দ পায়। তাহা না হইলে কথায় কথায় ধর্মঘট, লাগাতার হরতাল, ভাঙচুর ইত্যাদি ঘটনার এত প্রসার লাভ ঘটিতেছে কেন। অবিশ্যি ইহা অস্বীকার করা যাইবে না এ দেশের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের মাথা এমনি এমনি এতটা গরম হইয়া যায় নাই। ইহার পেছনে অনেক অনেক কারণ রহিয়াছে আর সে সকল কারণ এ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিরাই বিভিন্ন সময়ে নিজেদের সংকীর্ণ ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থে সৃষ্টি করিয়াছে আর তাহারই ভয়াবহ পরিণতি আমরা এখন সকলে মিলিয়া টের পাইতে শুরু করিয়াছি। এতগুলি কথা বলা হইতেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে হল নির্মাণের দাবিতে বিক্ষোভ, অবরোধ সম্পর্কিত একটি খবরের প্রেক্ষাপটে। গতকাল একটি নেতৃস্থানীয় দৈনিকে প্রচারিত এই খবরটিতে বলা হইয়াছে যে, ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ে নূতন হল নির্মাণ, বেদখলে থাকা ১০টি ছাত্রাবাস উদ্ধারসহ পাঁচ দফা দাবিতে শিক্ষার্থীরা দুই/তিন দিন ধরিয়া আন্দোলন চালাইয়া যাইতেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া ছাত্ররা যথারীতি গুলিস্তান-সদরঘাট সড়কের ৭টি স্থানে টায়ার প্রজ্বলিত করিয়া প্রায় আড়াই ঘন্টা যাবত্ সড়ক অবরোধ করিয়া রাখে। তাহারা মিছিল করে এবং ‘মেসে আর থাকব না, হল আমার ঠিকানা’ এই শ্লোগান দিয়া বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর সাত বত্সরকাল অতিক্রান্ত হইলেও অদ্যাবধি কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকটের সমাধান করিতে পারেন নাই। আর সেজন্যই শিক্ষার্থীদের মনের ধূমায়িত রোষ এখন প্রশাসনের প্রতি বর্ষিত হইতেছে। শিক্ষার্থীরা তাহাদের দাবি পূরণ না হইলে আগামী সপ্তাহ হইতে ক্লাস বর্জন ও লাগাতার ধর্মঘট পালনেরও হুমকি দিয়াছে। কথায় কথায় হরতাল ধর্মঘট অবরোধ এইসব কর্মসূচি জনসাধারণের জন্য কি ভয়াবহ দুর্ভোগ ডাকিয়া আনে উহা কি এই শিক্ষার্থীরাও বুঝিতে চাহিবে না? দাবি আদায়ের জন্য আলাপ-আলোচনা এবং অন্য নানান কৌশল অবলম্বন করা যাইতে পারে, কিন্তু শিক্ষাঙ্গনের বাহিরে সড়ক অবরোধ করিয়া জনদুর্ভোগ সৃষ্টির কোন অর্থ থাকিতে পারে কী! আরেকটি বিষয়ও শিক্ষার্থীদের ভাবিতে হইবে। উহা এই যে, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা করা কোন ধনী দেশেও কি সম্ভব? বিশ্বের নামি-দামি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ডরমেটরীতেও সীমিত সংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য আসনের বন্দোবস্ত থাকে। অবশিষ্ট ছাত্ররা তাহাদের নিজেদের ব্যবস্থা নিজেরাই করিয়া লয়। আর সেক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি অবস্থিত ঘর-বাড়ীগুলিতে শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা প্রত্যাশা করাটাও বাতুলতা বৈ নহে। এমতাবস্থায় শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উভয় পক্ষকেই বিষয়টির সন্তোষজনক সমাধানকল্পে ভাবাবেগ বর্জিত হইয়া ও বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় লইয়া আলোচনায় বসিতে হইবে। ইহার কোন বিকল্প নাই। অযথা মাথা গরম করিয়া বা উত্তেজিত হইয়া ধর্মঘট, ভাঙচুর, জনদুর্ভোগ ইত্যাদি কোন সুবিবেচনার পরিচয় বহন করিবে না নিশ্চয়ই। কর্তৃপক্ষকেও ছাত্রছাত্রীদের আবাসন সংকট বাস্তবসম্মতভাবে যতটুকু সাধ্যমত মেটানো সম্ভব সেইটুকু করিতে হইবে অত্যন্ত আন্তরিকভাবে। এই ক্ষেত্রে কোন প্রকার নির্লিপ্তি কিংবা গড়িমসি বা অমনযোগ পরিস্থিতিকে যে কেবল জটিলই করিয়া তুলিবে সে কথা তো বলাই বাহুল্য!

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন