বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি বিশ্লেষণে মহামনীষী কার্ল মার্কস অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। প্রাসঙ্গিক এই কারণে যে, তিনি ১৭৫ বছর পূর্বে বিশ্ব অর্থনীতি বিষয়ে যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন তা বহুলাংশেই বর্তমানে দৃশ্যমান। বিশ্ব অর্থনীতির মন্দাভাব চলছে বেশ কিছু সময় ধরেই। মন্দা কাটানোর জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতি আর্দশ অনুযায়ী বিশ্বব্যাংক, আই, এম, এফসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাসহ ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অবস্থার প্রেক্ষিতে নানান রকমের প্রেসক্রিপশন দিয়ে আসছেন। সাথে সাথে তারা আবার একথাও প্রচার করে থাকেন যে, কোন কোন দেশ মন্দা অবস্থা কাটিয়েও উঠেছেন। অবশ্য তারা কখনই তাদের প্রেসক্রিপশনে যেসব দেশের মহাসর্বনাশ হয়েছে সেসব দেশের সর্বনাশের বিবরণ দেন না ।
বিশ্বব্যাংক থেকে বের হয়ে আসা দুই-একজন কর্মকর্তা বিশ্ব অর্থনীতি সর্বনাশে বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কি ধরনের সর্বনাশ কিভাবে করেছে তা নিয়ে গবেষণামূলক লেখা প্রকাশ করেছেন। বিশ্বের কল্যাণকামী মানুষের তরফ থেকে তারা অবশ্যই সাধুবাদের যোগ্য।
পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, পৃথিবীর সম্পদ সীমিত কিন্তু মানুষের চাহিদা অসীম। সীমিত সম্পদ দিয়ে অসীম চাহিদা পূরণের সৃষ্ট সংকটই হচ্ছে অর্থনীতির কেন্দ্রীয় সমস্যা। সীমিত সম্পদ যদি সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু হয় তাহলে ভোগবাদ কিভাবে বিকাশিত হলো? উল্লেখিত সমস্যা ও ভোগবাদ কি বিপরীতমুখী নয়? ভোগবাদ লালন-পালন ও তার বিকাশ পৃথিবীতে মুষ্টিমেয় মানুষকে করেছে বিশাল সম্পদের মালিক। তাদের জীবনের গতি-প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করে সম্পূর্ণভাবে ভোগবাদ। যে কারণে প্রয়োজনীয়তা নামক বিষয়টি তাদের জীবনে হচ্ছে লাগামহীন। কথা হচ্ছে এই যে, একদিকে তৃতীয় বিশ্বের প্রায় ৫০ ভাগ মানুষ ক্রয় ক্ষমতার সংকটে ভুগেছে আর পাশাপাশি ভোগবাদের পেয়ালায় গুটি কয়েক মানুষ আকণ্ঠ ডুবে আছে। সম্পদের হচ্ছে অপচয়। প্রাপ্ত পরিসংখ্যান একথা বলছে যে, বেশ কয়েক বছর ধরে পৃথিবীতে শক্তির ভারসাম্য রক্ষায় তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়াচ্ছে সামরিক ব্যয়। এমতাবস্থায়, বিষয়টি কি দাঁড়ায়? রাষ্ট্রীয় সেবামূলকখাতের ব্যয় কমিয়ে, অভ্যন্তরীণ উন্নতির জন্য বরাদ্দ হ্রাস করার সাথে সাথে বৃদ্ধি করা হচ্ছে অনউত্পাদনমূলক সামরিক খাতের ব্যয়।
“পুঁজিবাদের ধ্বংসের বীজ তার মধ্যে নিহীত থাকে” একথাটি যেমন সত্য তেমনি আজকে সত্যিকার অর্থেই একথা সত্য যে, দৃশ্যমান বিশ্ব মন্দার ক্ষত চলমান পুঁজিবাদী অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ সংকট থেকে সৃষ্ট। কারণ, একদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোক্তাদের হাতে থাকবে না অর্থ, সম্পদ জমা হবে গুটিকয়েক মানুষের হাতে, ভোগের পেয়ালায় হবে সম্পদ অপচয়। পাশাপাশি পৃথিবীব্যাপী শক্তি প্রতিষ্ঠার জন্য চলবে সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির লাগামহীন প্রতিযোগিতা। এমতবস্থায়, আমার মতে বিশ্ব অর্থনীতিতে যা দেখেছি তা আসলে মন্দার লক্ষণ মাত্র। মন্দা নয়। পুঁজিবাদী অর্থনীতির সংকট যত বাড়বে, বিশ্ব সম্পদ বন্টন বৈষম্য যত বাড়বে, মন্দা ততই বাড়বে। এটাই বাস্তবতা। এটাই যথার্থ। মন্দা আবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে বিশ্ব ব্যবস্থায় আমুল পরিবর্তন অত্যাবশক। জোরা-তালিতে কোন কাজ হবে না। সরে আসতে হবে বৈষম্যমূলক অর্থনৈতিক অবস্থা, ভোগবাদ ও অস্ত্র নির্ভর রাষ্ট্র ব্যবস্থা থেকে।
লেখক :অর্থনীতিবিদ, চেয়ারম্যান, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, অতীশ দীপংকর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বনানী, ঢাকা
