আমাদের মানবাধিকার

আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০১৩, ২১:১৬
মানুষের অধিকার নিয়া কথা, পরিভাষায় মানবাধিকার। ব্যক্তি, সমষ্টি ও গোষ্ঠীর অধিকার ও অনধিকার লইয়া আমরা এই বাংলাদেশে আছি আমাদেরই মত। সুখ যতটুকু, তাহা আমাদের, দুঃখ যত তাহাও আমাদেরই। আমাদের মানুষের অধিকারের কথা ভাবিয়া যাহাদের ভ্রূকুঞ্চিত হয়, তাহারা কেমন করিয়া বুঝিবে আমাদের জীবনবেদ! এক ডলার দিয়া তাহারা যেইখানে একখানা ক্যান্ডি কিনিতে পারেন না, সেইখানে এই ব-দ্বীপের মানুষ এক ডলার ভাঙ্গাইয়া দুই কেজি চাউল কিনিয়া লইয়া আসিতে পারেন অনায়াসে। অতঃপর এই দুই দিগন্তের দুই মানুষের দুঃখ-সুখের, অধিকার ও অনধিকারের সংজ্ঞা এক হইবে কেমন করিয়া! তাহাদের দেখিবার ও বুঝিবার চক্ষু ও মনের মধ্যে ব্যবধান দুস্তর হইবে, তাহাই স্বাভাবিক। অপিচ, দূর হইতে আপন বিবেচনায় তাহারা বলে, বলিয়া আসিতেছে বত্সর বত্সর; মানবাধিকার ভাল না বাংলাদেশের। দূর হইতে মানবাধিকারের অভিধান খুলিয়া কে কি বলিল বা বলিবে, তাহাতে ভ্রূক্ষেপ করিবার আমাদের কী প্রয়োজন! আমাদের কী অধিকার আছে আর নাই, আমরা কী পারি আর না পারি তাহা তো আমরাই ভাল জানি। আমাদের বিদ্রোহী কবি বলিয়াছেন, ‘আমি অনিয়ম উচ্ছৃংখল, আমি দলে যাই যত বন্ধন, যতো নিয়ম-কানুন শৃঙ্খল। আমি মানি নাকো কোনো আইন।’ এই উচ্চকিত বাণীর স্থান-কাল পাত্রভেদ বিবেচনা করুক তাহারা, যাহারা সামান্যতে ভাবিত, বিচলিত। কিন্তু আমরা উহাকেই জীবনসূত্র করিয়া লইয়াছি। কোন অধিকার আমাদের নাই! আমরা কি না করিতে পারি! যাহা খুশি তাহা আলবত্ করিতে যে আমরা পারি তাহা কি চোখে আঙ্গুল দিয়া দেখাইয়া ও বুঝাইয়া দিবার প্রয়োজন আছে! ফুটওভার ব্রিজ পাছে ক্ষয় হইয়া না যায়; সেই জন্য ধাবমান যন্ত্রযানের ভিড় উপেক্ষা করিয়া এইখানে দৌড় দিয়া রাস্তা পার হওয়া কোনো ব্যাপার না, যদিও পার হইতে গিয়া কখনও কখনও অগস্ত্য যাত্রা ঘটিয়া যায়। শহরের পথে ট্রাফিক আছে কি নাই, সেই বিচার পরে, সবার আগে মান্য না করিবার সাহস ও অধিকার দুই-ই আমরা রপ্ত করিয়া লইতে পারিয়াছি। জলজ্ব্যান্ত মানুষ এইখানে হাপিশ করিয়া দেওয়া যে কঠিন নহে, তাহাও প্রমাণিত। এইখানে হরতাল ডাকা যায় দিনমান, এমনকি দুই-তিনদিনের জন্যও। হরতাল ডাকিয়া রাজপথে আগুন জ্বালানো যায়। গাড়ি ভাঙ্গা যায়, পোড়ানো যায়। এইখানে জীবন দেওয়া ও নেওয়া কত যে সহজ করিয়া লইতে পারিয়াছি আমরা, সেই কথা কি বলিবার অপেক্ষা রাখে! অনন্তর আমাদের ভোট আছে, গণতন্ত্র আছে, সংসদ আছে, বিচারালয় আছে, পুলিশ আছে, ডান্ডাবেড়ি আছে, টকশো আছে, আছে লাঠিচার্জ, পটকা-বোমা, অস্ত্র, গুলি আরো কত কী! আছে আনন্দ, আছে হা-পিত্যেশ। প্রতিদিন পত্রিকার পাতা ভরিয়া খবর আসে বহু বিচিত্র আনন্দ-বেদনার। আমাদের গার্মেন্টস বালিকারা কাকডাকা ভোরে টিফিন বক্সে খাবার লইয়া ছুটিয়া চলে কর্মস্থলে। ঘিঞ্জি ঘরে গাদাগাদি শুইয়া ঘুমায়, স্বপ্ন দেখে জীবনের। তাহারা আগুনে পোড়ে, কখনও মরে পায়ের তলায় পিষ্ট হইয়া। তবু নিজের মত নিজের অধিকার লইয়া বেশ আছি। সেই যে মহান এক কবি লিখিয়া গিয়াছেন, ‘বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে।’ তবে আর আক্ষেপ কিসে! শুকাইয়া যাওয়া, মরিয়া যাওয়া নদী-প্রান্তরের এই শস্য-শ্যামল দেশমাতার কোলে বেশ আছে ষোল কোটি বাঙালি সন্তান। রবীন্দ্রনাথের বাণী ধার করিয়া এক্ষণে আমরা প্রার্থনা করিতে পারি, ‘দুর্ভাগা দেশ হতে হে মঙ্গলময়, দূর করে দাও তুমি সর্ব তুচ্ছ ভয়/ লোকভয় রাজভয় মৃত্যুভয় আর।’ সবশেষে আরেকটা কথা, মানবাধিকার কিংবা অধিকার বলিতে আমরা যেমন বুঝি তেমনই আছি। ইহাতে অপরে মাথা ঘামাইলে আমাদের কী আসে যায়!

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন