হরতাল চলাকালে কোন দোকান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কিংবা যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হইলে তাহার ক্ষতিপূরণ দেওয়া হইবে। গত সোমবার গণভবনে আওয়ামী লীগ সংসদীয় বোর্ডের বৈঠকে এই বিষয়ে আলোচনা হইয়াছে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই তথ্য জানাইয়াছেন বৈঠকে অংশ নেওয়া কয়েকজন নেতা। শুধু তাহাই নহে, সংসদীয় বৈঠক শেষে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাত্ করিতে গেলে তাহাকেও এই হরতালের কারণে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বলিয়াছেন বলিয়া জানা যায়। হরতালের কারণে দেশের অর্থনীতি যখন নিদারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে তখন হরতালের সরকারি ক্ষতিপূরণের বিষয়টি আলোচনার দাবি রাখে।
উল্লেখ্য, হরতালে সরকার ক্ষতিপূরণ দিবে, এই বিষয়টি একেবারে নূতন নহে। হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদের শাসনামলে যখন আন্দোলনকারী বিরোধী দলগুলি একের পর এক হরতাল আহবান করে, তখনও এমন দাওয়াই দেওয়া হইয়াছিল। কিন্তু তাহা শুধু কথার কথাই ছিল। কার্যক্ষেত্রে বাস্তবায়িত হয় নাই। স্বৈরাচারী সরকার তাহা বাস্তবায়ন করিতে পারে নাই তাহাতে কী যায় আসে! নিশ্চয়ই নির্বাচিত ও গণতান্ত্রিক সরকার তাহা করিতে সক্ষম হইবেন বলিয়া আশা করা যায়। কেননা গণতান্ত্রিক সরকারের পিছনে জনসমর্থন থাকে বিধায় এই সরকার অনেক শক্তিশালী। পুরুষকে নারী আর নারীকে পুরুষ করা ছাড়া অনেক অসম্ভবকেও সম্ভব করিয়া তুলিতে পারে এই সরকার। হরতালে দেশ ও দশের যে অপরিসীম ক্ষতি সাধিত হইতেছে সেইজন্য নিশ্চয়ই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মন কাঁদে, প্রাণ কাঁদে। তিনি বিচলিতবোধ করেন বৈকি! তবে এইখানেই বসিয়া থাকিলে চলিবে না। ইহা বাস্তবায়ন করিতে হইলে সর্বাগ্রে দরকার পৃথক ফাণ্ড বা তহবিল গঠন। সেই তহবিল হইতে হরতালে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিপূরণ লাভ করিবেন।
অবশ্য হরতালের ক্ষতিপূরণ দিতে গিয়া সরকারকে বহুমাত্রিক বিড়ম্বনার মধ্যেও পড়িতে হইতে পারে। এমন ঘটাও বিচিত্র নয় যে, যাহার পুরাতন ও লক্কর-ঝক্কর মার্কা গাড়ি আছে তিনি কেবল হরতালের দিনই তাহা রাস্তায় বাহির করিবেন এবং হয় তাহা নিজে ভাঙচুর করিবেন বা কাহাকেও দিয়া আগুন লাগাইয়া ক্ষতিপূরণ পাইবার ব্যবস্থা করিবেন। যাহারা ব্যবসায়িকভাবে সাফল্যের মুখ দেখিতে পাইতেছেন না, তাহারা অনুরূপভাবে পরিকল্পিত উপায়ে নিজেদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত দেখাইয়া ক্ষতিপূরণ চাহিয়া বসিতে পারেন। কেননা সকল সম্ভাবনার দেশ এই বাংলাদেশ। এমতাবস্থায় শুধু তহবিল গঠন করিলেই চলিবে না, এজন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালাও তৈরি করা জরুরি হইয়া পড়িবে।
এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়, তাহা হইল, হরতাল সব সরকারের আমলেই কম-বেশি হইয়াছে। বিরোধী দল সরকারি দলে গিয়া সেই কথা বেমালুম ভুলিয়া যায় বা নিজস্ব যুক্তি খাড়া করে। তবে এই বিষয়টি আমাদেরকে বিচলিত না করিয়া পারে না যে, সরকার হরতাল প্রতিরোধের কথা বলিলেও কাজের সাথে কর্মের তেমন একটা মিল পাওয়া যায় না। সরকারি যানবাহন রাস্তায় নামানোর তেমন কোন উদ্যোগও দেখা যায় না। বাংলাদেশে যত সরকারি গাড়ি আছে তাহা যদি হরতালের দিন একযোগে রাস্তায় বাহির হয়, তাহা হইলে সেই হরতালকে সফল বলিবার কোন উপায় থাকে না। আমাদের জানা মতে, দেশে তিন লক্ষাধিক সরকারি গাড়ি রহিয়াছে। অন্যদিকে যখন যেই সরকার ক্ষমতায় আসে, অমনি পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা সেই দিকে ঝুঁকিয়া পড়েন বটে, কিন্তু তাহারাও গাড়ি বাহির করেন না, বরং গাড়িগুলি টার্মিনালগুলিতে বসিয়া থাকিতে দেখা যায়। ফলে সামান্য হরতালেও দূরপাল্লা বা আন্তঃজেলা পরিবহনের কোন গাড়ি চলে না। এইভাবে হরতাল শতভাগ না হউক, অন্তত নব্বই ভাগই সফল হইয়া যায়।
যদি সরকার হরতালে যানবাহন চলার জন্য তেল-মবিল দেয়, সরকারি গাড়ির ক্ষয়ক্ষতির জন্য অতিরিক্ত ট্যাক্স ধার্য করে বা জরিমানা আদায় করে, তাহা তাইলে কাজ হইলেও হইতে পারে। যাহা হউক, কথার সহিত কাজের মিল রাখাটাই অতীব গুরুত্বপূর্ণ। কেননা আল্লাহ তায়ালা বলিয়াছেন, ‘তোমরা যাহা করো না, তাহা বলো না’।
