আসন্ন বাজেট নিয়া চলিতেছে আলোচনা-সমালোচনা। বিভিন্ন মহল হইতে তুলিয়া ধরা হইতেছে তাহাদের দাবি-দাওয়াসমূহ। অর্থ মন্ত্রণালয়ও বিচার বিবেচনা করিতেছেন বিভিন্ন দাবি-দাওয়ার। তবে বাজেটের ক্ষেত্রে যত আলোচনা-পর্যালোচনা চলে আমাদের সংবাদ মাধ্যমে, বাজেট আসিলে ততটা পরিবর্তন বহিয়া আনে না পূর্ববর্তী বত্সরের তুলনায়। তাহার কারণ আমাদের বাজেট মূলত ইনক্রিমেন্টাল বা প্রসারণমূলক। অর্থাত্ আগের বত্সরের তুলনায় বরাদ্দ বাড়ানো হয় দশ/পনের কিংবা বিশ শতাংশের মতো। যাহা বাড়ানো হয় তাহার একটা বৃহত্ অংশ চলিয়া যায় পূর্বের বরাদ্দের খাতগুলিতে মূল্যস্ফীতিজনিত বর্ধিত খরচ বহন করিতে গিয়া। অর্থাত্ প্রতিটি খাতেই মূল্যস্ফীতির নেতিবাচক প্রভাবকে মাথায় রাখিয়া বরাদ্দ বাড়ানো হয়। অন্যদিকে, রক্ষণাবেক্ষণ ও অবক্ষয়জনিত কারণে খানিকটা বরাদ্দ বাড়াইতে হয়। কিন্তু বরাদ্দের ক্ষেত্রে বড় ধরনের কোন পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় না। এই সব কারণ ছাড়াও দাবির প্রেক্ষিতে বরাদ্দ বাড়ানোর ক্ষেত্রে যে মন্ত্রণালয় যতটা প্রভাবশালী বা যে মন্ত্রী যতটা প্রভাবশালী সেইখানে বরাদ্দ বাড়ে তত বেশি। এই হইলো রাজস্ব বাজেটের চিত্র। আর উন্নয়ন বাজেটের ক্ষেত্রে যে বরাদ্দ দেওয়া হয় তাহার ক্ষেত্রেও অর্থনৈতিক দক্ষতা-অদক্ষতার বিবেচনা খুব একটা পাত্তা পায় না। তাহার পরেও বাজেট নিয়া চলে বিস্তর আলোচনা। এইবারের বাজেট বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ বাজেট বলিয়া নির্বাচনী বাজেট হইবে কিনা তাহা ল্ইয়াও হইতেছে কথাবার্তা। অনেকেই এই বাজেট যেন হয় একটা সংযমী বাজেট সেই দিকে জোর দিতেছেন। চাহিতেছেন সংকোচনমূলক সরকারি বাজেট।
তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে এই বাজেট বর্তমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নিম্নগতির প্রতি খেয়াল রাখিয়া করা উচিত। বর্তমানে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে আমাদের প্রবৃদ্ধি কমিয়া যাইতেছে। কারণ ব্যক্তি-বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি কমিয়া যাইতেছে। যে আমদানির প্রায় পঁচাত্তর শতাংশ উত্পাদনের কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতি, তাহাও কমিয়া যাইতেছে। এই সবই ভবিষ্যতে আমাদের সেবা ও উত্পাদনের পরিমাণ কমিয়া যাওয়ার ইঙ্গিত দিতেছে। ফলে ব্যক্তি-বিনিয়োগের স্বল্পতাকে কাটাইয়া উঠিবার জন্য সরকারি খাতের বিনিয়োগকে বাড়াইতে হইবে। অর্থাত্ আমাদের উন্নয়ন ব্যয় বাড়াইতে হইবে। অর্থাত্ আমাদের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির প্রসার ঘটাইতে হইবে। ফলে সংকোচনমূলক সরকারি বাজেট প্রণয়ন করার সময় ইহা নহে এই কথা সবাইকে মনে রাখিতে হইবে। আবার বিশাল উন্নয়ন বাজেট প্রণয়ন করিয়া তাহা নির্বাচনী বৈতরণী পারাপারের জন্য ব্যবহার করিলে তাহাও হইবে এই অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতমূলক। তাহার মানে আমাদের এই বাজেট হওয়া উচিত সম্প্রসারণমূলক। কিন্তু উন্নয়ন বরাদ্দের ক্ষেত্রে মাথায় রাখিতে হইবে অর্থনীতি, নির্বাচন নয়। রাজস্ব নীতি সম্প্রসারণমূলক হওয়ার আরেক অর্থ হইলো মুদ্রানীতির উপর সমপ্রসারণের জন্য চাপ। কারণ সরকার ঘাটতি বাজেটের মাধ্যমে উন্নয়ন ব্যয় বাড়াইলে তাহার অর্থায়ন করিতে হইবে মূলত ব্যাংকিং খাত হইতে ঋণের মাধ্যমে। আর এই ঋণ প্রদান সম্ভব করিতে হইলে বাংলাদেশ ব্যাংককে বাড়াইতে হবে মুদ্রা সরবরাহের প্রবৃদ্ধি। এই সকল বিষয় বিবেচনায় রাখিয়াই আসন্ন বাজেট প্রণয়ন করা হইবে বলিয়া আমাদের প্রত্যাশা।
