[ রা জ নী তি ]

শুধু নির্বাচন নয়, গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার ব্যবহারিক রূপরেখা প্রয়োজন

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০১৩, ২১:১১
বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের ৪২ বছর এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের দীর্ঘ বাইশ বছর অতিক্রম করলেও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক ধাপ তথা সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা এখনো তৈরি করতে পারেনি। ক্ষমতার পালাবদলের ফল ভোগের জটিল সমীকরণের কারণে রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ের সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবস্থান এবং বিরোধী দলে থাকাকালীন অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী। এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ক্ষমতা থেকে অপসারিত হলে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পেশাবৃত্তিক স্বার্থের ক্ষেত্রে প্রান্তিক অবস্থায় পতিত হওয়া বা অস্তিত্বহীন হওয়ার সম্ভাবনার কারণেই। এই সম্ভাবনা ক্ষমতায় থাকা ও ক্ষমতায় আসার লড়াইকে সহিংস করেছে। যার ফলে সমগ্র রাজনৈতিক সমাজ অস্থিতিশীল হয়েছে। এই অবস্থায় প্রায়োগিক দিক বিবেচনা করে গণতান্ত্রিক রাজনীতির রূপরেখা নির্ধারণ ও তার বাস্তবায়ন প্রয়োজন। গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রথম শর্তই হলো গণতান্ত্রিক মনোভঙ্গির নাগরিক শ্রেণি তৈরি করা। এই নাগরিক শ্রেণি শুধুমাত্র গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সাথে নিজেদের খাপ খাওয়াবে না, তারা নতুন নতুন মূল্যবোধ তৈরি করে আরো বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে গণতান্ত্রিক সমপ্রদায়ের সাথে একীভূত করবে। তবে এই নাগরিক শ্রেণি তৈরি হয় একটি বিশেষ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। এই প্রক্রিয়াই রাজনৈতিক সামাজিকীকরণ ও অর্থনীতির ভিত্তিতে নিয়োগদান। রাজনৈতিক সামাজিকীকরণ হলো রাজনৈতিক দীক্ষা দান ও প্রশিক্ষণ। এটা সম্পন্ন হয় রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও মিডিয়ার ভূমিকার মাধ্যমে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলোর সে প্রশিক্ষণ দেয়ার মতো মানসিকতা ও সামর্থ্য নেই। কারণ তারা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রচার ও প্রসারে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটের মনোবৃত্তিকেই প্রাধান্য দেয়। এই অবস্থায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও মিডিয়া এই ভূমিকা রাখতে পারতো। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আশীর্বাদে বেড়ে উঠায় বা সরকারি আনুকূল্যে লাভের প্রত্যাশা থাকায় এরাও কার্যকর রাজনৈতিক সামাজিকীকরণে উদ্বুদ্ধ করতে পারে না। অন্যদিকে গণতান্ত্রিক মনোভঙ্গির জনগোষ্ঠী তৈরি করতে হলে নিয়োগ প্রক্রিয়া অর্জন নীতির ভিত্তিতে হতে হবে। এখানে সনাতন সমাজের আরোপণ নীতি বাদ দিতে হবে। অথচ সরকারি বা বেসরকারি উভয়ক্ষেত্রেই নিয়োগ প্রক্রিয়ার অধিকাংশই আরোপণ নীতির ভিত্তিতে হয়। এমনকি পিএসসির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আরোপণ নীতি (ঘুষ, রাজনৈতিক প্রভাব, আত্মীয়তার সম্পর্ক) প্রয়োগের অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে রাজনৈতিকভাবে প্রশিক্ষণ লাভ করেনি এমন কোনো নাগরিক যখন আরোপণ নীতির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্য সম্পাদন বা নেতৃত্বদানের সুযোগ লাভ করে তখন তার নিকট থেকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধসম্পন্ন আচরণ ও সুনির্দিষ্ট মানদণ্ডের কার্য সম্পাদন আশা করা যায় না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এখন এটাই প্রায়োগিক দিক। তাই বাংলাদেশে ইতোমধ্যে যে সকল প্রতিষ্ঠান (দুদক ও বিচার বিভাগ) স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা লাভ করেছে সেগুলোর নিয়োগ ও নিয়োগ পরবর্তী সময়ে ব্যক্তিদের কার্য সম্পাদনের বিষয়ে যথেষ্ট বিতর্ক উত্থাপিত হয়। এই অবস্থায় মিডিয়াকে ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। তবে এটা সম্ভব নয় যদি রাজনৈতিক দলগুলোর ছত্রছায়ায় বা আনুকূল্যে বেড়ে উঠে। তাহলে কি করণীয়? প্রাথমিক পর্যায়ে কাউকে এই জগদ্দল পাথরের অভ্যন্তর থেকে বের হয়ে আসতে হবে এবং দেশের অগ্রগতিকে লক্ষ্য রেখে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষায় ও তৈরিতে দীক্ষা নিতে ও দিতে হবে। এটাই প্রায়োগিক। এক্ষেত্রে বুদ্ধিবৃত্তিক সংকটকেও কাটিয়ে উঠতে হবে। এখানে রাজনৈতিক সমস্যার চরিত্র নির্ধারণে এবং এই সমস্যা সমাধানে বিজ্ঞান, ইতিহাস, সাহিত্য, সঙ্গীত, নৃত্যকলা, চলচ্চিত্র ও সাংবাদিকতা ইত্যাদি বিষয়ে ব্যুত্পত্তি অর্জনকারীকে সামনে নিয়ে আসলে হবে না। রাজনৈতিক বিষয়াদিতে ব্যুত্পত্তি অর্জনকারী কোনো ব্যক্তি যেমন সঙ্গীতে পদ্ধতিগত বিশ্লেষণ দিতে পারেন না (ব্যতিক্রম ছাড়া), তেমনি কোনো বিশেষ মিডিয়া বা মিডিয়া পরিচালকের সাথে বা সুনির্দিষ্ট সংবাদকর্মীর সাথে সখ্যতার সুযোগে রাজনৈতিক বিষয়ের বিশ্লেষণের জায়গায় নিজেকে উপস্থাপন করা যাবে না। তবে সঙ্গীতের কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক বিষয়ে বিশেষ জ্ঞান থাকলে তা একাডেমিক গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণ দিতে হবে। আমাদের সকলের নিকট মনে হয় রাজনৈতিক বিষয়াদির বিশ্লেষণ সবচেয়ে সহজ। এটা দুই কারণে হতে পারে। প্রথমত, আমাদের সার্বিক জীবন রাজনীতির মধ্যে ডুবে থাকে এবং অতি আদিকাল থেকে আমরা তা চর্চা করে আসছি। দ্বিতীয়ত হলো, আপাতদৃষ্টিতে তা টেকনিক্যাল মনে হয় না। অথচ রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সবচেয়ে বেশি টেকনিক্যাল। কারণ এখানে মানুষের রাজনৈতিক আচরণের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয় এবং এক্ষেত্রে রাজনৈতিক ব্যাকরণের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অবলম্বন করতে হয়। তাছাড়া, মানুষের প্রতিটি আচরণই স্বাতন্ত্র্য এবং মানুষের রাজনৈতিক সমাজের মিথস্ক্রিয়া ও প্রকৃতি জটিল। অথচ এর বিশ্লেষণই সবার নিকট সহজ মনে হয়। এটা অনেক সময় অজ্ঞতা থেকেও হতে পারে। মনে রাখতে হবে নোম চমস্কির উদাহরণ নিয়ে আসলে তার মতো পদ্ধতিগত গবেষণার মাধ্যমে একাডেমিক বৈধতা অর্জন করতে হবে। অন্যথায় ভুল লোকের নির্দেশনায় রাষ্ট্র ও রাজনীতি ভুল পথে পরিচালিত হতে পারে। গণতান্ত্রিক রূপরেখার দ্বিতীয় বিষয়টি হবে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ। এক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট আইন ও নীতিমালার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠান গড়তে হবে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যই সুনির্দিষ্ট থাকবে না, বরং সে কার্য সম্পাদনের ক্ষেত্রে নাগরিক সমাজের সাথে প্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগণের আচরণ আইনে সুনির্দিষ্ট থাকবে। তখন রাষ্ট্রের সম্পদ লুট না করে আইনি প্রক্রিয়ায় বিএনপি বা আওয়ামী লীগ এবং তাদের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর স্বার্থ প্রতিষ্ঠান রক্ষা করতে পারবে। এক্ষেত্রে বণ্টন নীতির সমস্যাও দূর হয়ে যাবে। প্রতিষ্ঠান গঠনের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী অফিস থেকে শুরু করে প্রশাসনের সকল স্তরে ক্ষমতা সম্পর্ক ও পার্থক্যগুলো সুনির্দিষ্ট করতে হবে। যে সম্পর্ক ও পার্থক্যের ভিত্তিতে শাসন বিভাগ সত্যি সত্যি আইন বিভাগের নিকট জবাবদিহি করতে বাধ্য হবে এবং শাসন বিভাগ ও আইন বিভাগের কার্যক্রমের আইনি ব্যাখ্যা কার্যকরভাবে বিচার বিভাগের মাধ্যমে করতে হবে। বিচার বিভাগের কার্যক্রম এমন হতে হবে যেন জনগণ এই বিভাগের উপর আস্থাশীল হয়। একইভাবে নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ও নিয়োগ প্রক্রিয়া শাসন বিভাগের আওতামুক্ত একটি স্বাধীন কমিশনের পরিচালনায় নিয়ন্ত্রিত হতে হবে। রাষ্ট্রপতিকে নামসর্বস্ব ও আলঙ্কারিক ব্যক্তি থেকে অন্তত তার নিজের গণ্ডিতে কার্যকর ব্যক্তি হিসেবে তৈরি করতে হবে। সুতরাং এভাবে রাজনৈতিক সামাজিকীকরণের মাধ্যমে সুনির্দিষ্টভাবে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে প্রশিক্ষিত নাগরিক শ্রেণি যদি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব প্রদান করে তাহলে প্রকৃত গণতন্ত্রের ফসল সবার নিকট পৌঁছাতে বিলম্ব হবে না। এভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর তথাকথিত স্বার্থের দ্বন্দ্বও নির্মূল হবে এবং কারোর ক্ষমতায় আরোহণের ফলে অন্যের ব্যবসায়িক ও সামাজিক স্বার্থও ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। কারণ উভয়ের স্বার্থই আইনি প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে। ফলে রাজনৈতিক হানাহানি বিলীন হবে এবং সত্যি সত্যি গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে। এটাকে সুনিশ্চিত করার জন্য বড় ধরনের কিছু সাংবিধানিক সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। তন্মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট হিসেবে কোনো ব্যক্তি দুইবারের বেশি ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না, কোনো ব্যক্তি কোনো দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে দুই মেয়াদের বেশি থাকতে পারবেন না এবং প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পর (মেয়াদকালীন সময়ে) কেউই আর দলের কোনো পদে থাকতে পারবেন না, স্পিকার দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকবেন, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্যসহ (বিস্তারের আলোচনা প্রয়োজন) বিভিন্ন ধরনের কিছু সাংবিধানিক সংস্কার আনয়ন করতে পারলে গণতন্ত্রকে প্রতি পাঁচ বছর পরপর নতুন করে শুরু করতে হবে না। সুতরাং রাষ্ট্রে যদি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সংবিধান (সংস্কার পরবর্তী) সমুন্নত হয় তাহলে শুধু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র না, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সুখ আমরা লাভ করবো। লেখক :শিক্ষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইমেইল : [email protected]