জ্বালানি মূল্য, নিরাপদ শক্তি ও আবহাওয়ার পরিবর্তন- এ সমস্ত কিছু বিবেচনা করে নবায়নযোগ্য শক্তির প্রচলন আশু প্রয়োজন। সর্বসাধারণের ব্যবহারযোগ্য বিদ্যুত্ উত্পাদনের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে । নবায়নযোগ্য শক্তি হচ্ছে প্রায় অফুরন্ত শক্তির উত্স সূর্য হতে প্রাপ্ত শক্তি যা কোন প্রকার জ্বালানি ব্যবহার করে না। নবায়নযোগ্য শক্তি হিসেবে সৌরশক্তি সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও সহজলভ্য। প্রতি মিনিটে যে পরিমাণ সৌরশক্তি ভূ-পৃষ্ঠে পতিত হয় তা দিয়ে এই পৃথিবীর এক বছরের শক্তি চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। বিদ্যুত্ উত্পাদনের জন্য আমরা আমাদের ঘর-বাড়ি কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আলোক সংবেদনশীল “সোলার প্যানেল” ব্যবহার করতে পারি। কয়লা, তেল কিংবা নিউক্লিয় শক্তি দিয়ে বিদ্যুত্ উত্পাদনের বিকল্প হিসেবে এটি কাজ করতে পারে। কয়লা, তেল ও নিউক্লিয় শক্তি ব্যবহার ঝুঁকিপূর্ণ এবং আমাদের পরিবেশের উপর এগুলোর সূদুরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে।
বিদ্যুত্ উত্পাদন প্রক্রিয়া :সূর্যশক্তি এমন এক শক্তি যা বিদ্যুত্ উত্পন্ন করে সরাসরি সূর্যরশ্মি ব্যবহার করে। এই শক্তি উত্পন্ন হয় সোলার ফটোভোলটেইক পদ্ধতির মাধ্যমে। যখন সূর্যরশ্মি সোলার কোষের উপর তীব্রভাবে পড়ে, তখন এটি ইলেকট্রন ছেড়ে দেয় সোলার কোষের p-n সংযোগ থেকে, যা অন্য ইলেকট্রনগুলোকে ধাক্কা দিতে থাকে আড়াআড়িভাবে একটি প্রচ্ছন্ন বাধা বা ইলেকট্রিক ক্ষেত্র তৈরির জন্য। এই ইলেকট্রনগুলো তখন পুরো একটি বাইরের সার্কিট ঘুরে আসে আগের অবস্থানে এবং এই প্রক্রিয়ায় বিদ্যুত্শক্তি উত্পন্ন হয়।
ফটোভোলটেইক প্রক্রিয়া এমন একটি মৌলিক প্রক্রিয়া যা বিদ্যুত্ উত্পন্ন করে ফটোভোলটেইক কোষের মাধ্যমে, সরাসরি সূর্যের আলো থেকে। সূর্যরশ্মি ফোটন নামক বিভিন্ন মাত্রার আলোকশক্তির প্যাকেট দ্বারা আবদ্ধ থাকে। এই ফোটনগুলো বিভিন্ন তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের হয়ে থাকে। যখন ফোটনগুলো ফটোভোলটেইক কোষকে তীক্ষভাবে আঘাত করে, এগুলো তখন প্রতিফলিত, শোষিত অথবা p-n সংযোগ দিয়ে পরিবাহিত হতে পারে। শোষিত ফোটনগুলো p-n সংযোগের ভিতর বিদ্যুত্ উত্পন্ন করে।
সৌরবিদ্যুত্ উত্পাদনের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণগুলো নিম্নরূপ: সোলার প্যানেল। ব্যাটারি। চার্জ কন্ট্রোলার। বৈদ্যুতিক সংযোগের জন্য প্রয়োজনীয় তার এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক যন্ত্রাংশ।
সোলার প্যানেল-সৌরবিদ্যুত্ উত্পাদনের প্রধান উপকরণ হলো সোলার প্যানেল, যা অনেকগুলো সৌর কোষের সমন্বয়ে গঠিত। সৌর কোষ সিলিকন পদার্থের তৈরি। সৌর কোষগুলোর মডিউল এমনভাবে বিন্যস্ত করা হয় যেন সূর্যের আলোর উপস্থিতিতে বিদ্যুত্ উত্পন্ন হয়।
সোলার সিস্টেমের বিদ্যুত্ উত্পাদন ক্ষমতা সাধারণ অর্থে সিস্টেমের সোলার প্যানেলের আকার, সংখ্যা, কর্মক্ষমতা ইত্যাদির উপর নির্ভর করে। বাসগৃহে সাধারণত যে সোলার প্যানেল আমরা ব্যবহার করি তার প্রতিটিতে ৪০টি সৌর কোষ থাকে। চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুতের পরিমাণ ও তদনুসারে সোলার প্যানেলের সংখ্যা নির্ণয়পূর্বক দালানের ছাদে বা রৌদ্র প্রাপ্তির অন্য কোন সুবিধাজনক স্থানে স্থাপন করে সৌরবিদ্যুত্ তৈরি করা হয়। পৃথিরীজুড়ে সৌরশক্তির ব্যবহার নিয়ে যেসব বৈজ্ঞানিক গবেষণা চলছে তা মূলত এই সৌর কোষ তথা সোলার প্যানেলের কর্মক্ষমতা কিভাবে বাড়ানো যায় তা নিয়ে। এখন পর্যন্ত বাণিজ্যিকভাবে আমরা যে প্যানেলগুলো ব্যবহার করছি তার কর্মক্ষমতা মাত্র শতকরা ১২ থেকে ১৮ ভাগ। একটি চমত্কার রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে বিজ্ঞানীরা একটি সোলার প্যানেলের কর্মক্ষমতা শতকরা ৪৫ ভাগ পর্যন্ত বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন। তবে এসবই হয়েছে গবেষণাগারে, যা এখনও সাধারণের ব্যবহার উপযোগী করা সম্ভব হয় নাই। আশা করা যেতে পারে, অতিশীঘ্রই শতকরা অন্তত ২৫ ভাগ কর্মক্ষমতাসম্পন্ন সোলার প্যানেল ব্যবহার করে বিদ্যুত্ উত্পাদন করা যাবে।
সোলার প্যানেল স্থাপনের জন্য উপযুক্ত স্থান হলো যে কোন খোলা জায়গা, যেমন -দালানের ছাদ, খোলা ময়দান, টিনের বা শনের ঘরের চালা ইত্যাদি। এমনকি দালানের সাউথ এলিভেশন বরাবর প্যানেল স্থাপন করা যেতে পারে, আবার প্যানেলের সাহায্যে ঘরের চালাও তৈরি করা যেতে পারে। তবে আসল কথা হলো প্যানেলের অবস্থান এমন হতে হবে যেন তা দিনের বেলা অধিকাংশ সময় সর্্বোচ্চ সূর্যালোক থেকে বঞ্চিত না হয়। সোলার প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে উত্পাদিত বিদ্যুত্ ব্যবহারের কয়েকটি উদাহরণ নিম্নে দেয়া গেল।
দালানের ছাদে বা পানির ট্যাংকে সোলার প্যানেল স্থাপন করে বাসাবাড়ি বৈদ্যুতিক আলোয় আলোকিত করা যায়।
আমাদের দেশের বড় বড় শহরগুলোতে (যেমন-ঢাকা, চট্রগ্রাম) যেসব শপিংমল বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দক্ষিণমুখী, সেগুলোর বাইরে সাধারণ কাচের পরিবর্তে সোলার প্যানেল স্থাপন করে উক্ত মলের বিদ্যুত্ চাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশ মিটানো যেতে পারে ।
ফিলিং স্টেশন, টোল স্টেশন, হাইওয়ে প্রভৃতি খোলা জায়গায় সোলার প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে ঐসব স্থাপনার বিদ্যুত্ চাহিদা মিটানো যায়।
চা বাগানের সেডট্রি, স্ট্রিট লাইট পোস্ট ইত্যাদির সাথে সোলার প্যানেল স্থাপন করে বাতি জ্বালানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
ব্যাটারি-সোলার প্যানেল সিস্টেমের অপরিহার্য উপাদান হচ্ছে ব্যাটারি। ব্যাটারির কাজ হলো দিনের আলোয় উত্পাদিত সৌরবিদ্যুত্ জমা করে প্রয়োজনমত ব্যবহারের জন্য তা সরবরাহ করা। সৌরবিদ্যুত্ উত্পাদন ও ব্যবহার প্রক্রিয়া দুই ধরনের ।
ক. অন-গ্রিড, খ. অফ-গ্রিড
ক. অন-গ্রিড পদ্ধতি:অন-গ্রিড পদ্ধতিতে ব্যাটারি ব্যবহার করা হয় না। কারণ এক্ষেত্রে বিদ্যুত্ জমা করার প্রয়োজন পড়ে না। এই প্রক্রিয়ায় সোলার প্যানেলে উত্পাদিত বিদ্যুত্ সরাসরি বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ, যেমন-বৈদ্যুতিক বাতি, পাখা প্রভৃতিতে ব্যবহার করা হয়। তবে এটি রাতের বেলা বা মেঘ-বাদল দিনে ব্যবহার করা যায় না। অর্থাত্ অন-গ্রিড পদ্ধতিতে সৌরবিদ্যুত্ ব্যবহারের জন্য একটি রৌদ্রময় দিনের প্রয়োজন। এই পদ্ধতিতে বিদ্যুত্ উত্পাদন ও ব্যবহার ধারাবাহিকভাবে একই সাথে চলতে থাকে।
খ. অফ-গ্রিড পদ্ধতি:আমরা সৌরবিদ্যুতের যে পদ্ধতি ব্যবহার করি তা হলো অফ-গ্রিড পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে সূর্যের আলো থেকে উত্পাদিত বিদ্যুত্ সঞ্চয় করে রাখা হয়, যা প্রয়োজনে রাতের বেলা বা বৃষ্টির দিনে ব্যবহার করা যায়। বিদ্যুত্ সঞ্চয়ের জন্য আমরা ব্যাটারি ব্যবহার করে থাকি। সোলার প্যানেলে উত্পাদিত বিদ্যুত্ রিচার্জের মাধ্যমে ব্যাটারিতে জমা হয় এবং এই জমাকৃত বিদ্যুত্ তাত্ক্ষণিকভাবে বা পরবর্তীতে প্রয়োজনমত ব্যবহার করা যায়। ঠিক যেভাবে লোডশেডিং-এর সময় আমরা অতি পরিচিত আইপিএস ব্যবহার করে থাকি। তবে আইপিএস-এর ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিদ্যুত্ ব্যবহার করে ব্যাটারি চার্জ করা হয় এবং ব্যাটারি চার্জের জন্য অতিরিক্ত বিদ্যুত্ বিল গুনতে হয়। কিন্তু সোলার প্যানেল ব্যবহার করে আমরা অতি সহজেই সৌরবিদ্যুত্ দিয়ে ব্যাটারি চার্জ করে অতিরিক্ত বিদ্যুত্ বিলের হাত থেকে রেহাই পেতে পারি।
চার্জ কন্ট্রোলার:চার্জ কন্ট্রোলারের কাজ হলো ব্যাটারিকে মাত্রাতিরিক্ত চার্জ থেকে রক্ষা করা। মাত্রাতিরিক্ত চার্জের কারণে ব্যাটারি যাতে নষ্ট হয়ে না যায় সেজন্য এটি সেফগার্ড হিসাবে কাজ করে।
সংযোগ তার ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ:সোলার প্যানেল সিস্টেমের বিভিন্ন যন্ত্রাংশকে বৈদ্যুতিক তারের সাহায্যে পরস্পরের সাথে সংযুক্ত করা হয়। সোলার প্যানেল, প্যানেল স্ট্যান্ড, চার্জ কন্ট্রোলার, ব্যাটারি, ইনভার্টার, ফিউজ, সার্কিটব্রেকার, কানেক্টর প্রভৃতি সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ সোলার এনার্জি সিস্টেম তৈরি করা হয়।
কেন আইপিএস-এর পরিবর্তে সোলার প্যানেল?
সোলার প্যানেল আমাদের দেশে ইদানীং যথেষ্ট সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে গ্রামীণ শক্তি, হাইড্রন বাংলাদেশ এবং আরও অনেক বেসরকারি সংস্থা সোলার প্যানেল সরবরাহ, স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজ করে থাকে। সোলার প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যুত্ উত্পাদন ব্যয়ও খুব বেশি নয়। বর্তমান সময়ে কেউ যদি একটি টিউব লাইট ও একটি বৈদ্যুতিক পাখার জন্য সোলার প্যানেল স্থাপন করতে চান তাহলে তাকে প্রায় ত্রিশ হাজার টাকা খরচ করতে হবে, যা একটি আইপিএস-এর মূল্যের চেয়ে কম। তবে বিদ্যুতের ব্যবহার অনুযায়ী নিম্নরূপে সোলার প্যানেলের সংখ্যা নির্ণয় করা হয়।
ধরি, একটি বাসগৃহে ৩টি ২৫ ওয়াট ক্ষমতার এনার্জি সেভিং বাল্ব ও ৮০ ওয়াট ক্ষমতার ২টি সিলিংফ্যান চালানোর জন্য সোলার প্যানেল স্থাপন করতে হবে। একটি সোলার প্যানেলের (সাইজ-৩র্৭র্ (১৯.র্৫র্ (র্২র্ ) বিদ্যুত্ উত্পাদন ক্ষমতা ৫০ ওয়াট। বিদ্যুত্ ব্যবহারের পরিমাণ=৩টি ২৫ ওয়াট বাল +২টি ৮০ ওয়াট ফ্যান= ৩(২৫+২(৮০=৭৫+১৬০=২৩৫ ওয়াট।
সুতরাং প্যানেল সংখ্যা=২৩৫ ÷ ৫০ =৪.৭০ অর্থাত্ ৫টি প্যানেল স্থাপন করতে হবে। এজন্য ১২ ভোল্ট রেটিং-এর ব্যাটারি এক বা একাধিক স্থাপন করা যেতে পারে। ব্যাটারি সংখ্যা যত বাড়ানো যায়, সোলার প্যানেল সিস্টেমের ব্যাকআপ টাইম তত বেশি হয়।
সোলার প্যানেল ও আইপিএস-এর মূল পার্থক্য হলো সোলার প্যানেল সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুত্ উত্পন্ন করে ব্যাটারিতে জমা করে; পক্ষান্তরে আইপিএস বিদ্যমান বিদ্যুত্ ব্যবস্থার বিদ্যুত্ দিয়ে ব্যাটারি রিচার্জ করে। অর্থাত্ আইপিএস ব্যবহার করলে ব্যাটারি রিচার্জের জন্য অতিরিক্ত বিদ্যুত্ বিল গুনতে হয়। বিদ্যুত্ লাইন থাক বা না থাক যে কোন রৌদ্রোজ্জ্বল স্থানে সোলার প্যানেলের মাধ্যমে বিদ্যুতের সুবিধা গ্রহণ করা যায়। কিন্তু কেবলমাত্র বিদ্যমান বিদ্যুত্ ব্যবস্থায় লোডশেডিংয়ের সময় আইপিএস কাজে লাগে। এছাড়া আইপিএস-এর ব্যাটারি রক্ষণাবেক্ষণ সোলার প্যানেল সিস্টেমের ব্যাটারি রক্ষণাবেক্ষণের চেয়ে জটিল। সর্বোপরি সোলার প্যানেল সিস্টেম একটি ব্যয় সাশ্রয়ী পরিবেশবান্ধব শক্তি ব্যবস্থা।
লেখক :তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, যশোর গণপূর্ত সার্কেল, যশোর
