গ্যালারীতে মা শাহীনা বেগম তাকিয়ে দেখছেন ছেলে দৌড়াচ্ছে। ১০০ মিটার স্প্রিন্টে ছেলে মেজবা আহমেদ পারবেন না সেটা তার জানা। কারণ সেনাবাহিনীর মোহন খান লন্ডন অলিম্পিকে দৌড়ে এসেছেন। সেখানে দশম শ্রেণীর ছোট এই ছেলেটি কিই বা করতে পারবে। কিন্তু মায়ের আশংকা ভুল প্রমাণ করে বিকেএসপির এসএসসি পরীক্ষার্থী মেজবা আহমেদ ১০.৭৫ সেকেন্ড সময় নিয়ে দেশের দ্রুততম মানবের খেতাবটা মাথায় তুলে নিলেন। অপরদিকে দ্রুততম মানবীর আসনটি ধরে রাখলেন বিজেএমসির নাজমুন নাহার বিউটি। পুরোন রানী বিউটির (১২.৫১) পাশে নতুন রাজা মেজবাকে (১০.৭৫) পেল দেশের ক্রীড়ামোদীরা, গতকাল বুধবার অষ্টম বাংলাদেশ গেমসের স্প্রিন্টে।
বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে তপ্ত দুপুরের পরই প্রথমে মেয়েদের এবং পরে ছেলেদের ১০০ মিটার স্প্রিন্ট ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হয়। ছেলেদের ইভেন্ট দিয়ে খেলা শুরু হতে যাচ্ছিল। কিন্তু স্টার্টাররা ভুল করায় সিদ্ধান্ত বদলে মেয়েদের ১০০ মিটার আগে শেষ হয়। নাজমুন নাহার বিউটি দুই দিন আগে ২০০ মিটার স্প্রিন্টে হেরেছিলেন বিকেএসপির ছাত্রী জাকিয়া সুলতানা সুবর্ণার কাছে। হেরে কোনো আফসোস ছিল না তার। কারণ ওই হারকে জেদে পরিণত করে আত্মবিশ্বাসি মেয়েটি কাল ১০০ মিটার স্প্রিন্টে আসল লড়াইয়েই জিতে এলেন। দৌড় শেষে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘জেদ কাজে লেগেছে। সময় মতো খেলাটা খেলতে পেরেছি।’ নোয়াখালী সরকারি কলেজের এই মাস্টার্স পরীক্ষার্থী আরো বলেন, ‘আমার পায়ে ব্যথা, খেলবো কী। এই নিয়ে আটবার ১০০ মিটার স্প্রিন্টে স্বর্ণ জয় করলাম। আর সব মিলিয়ে তো পদকের সংখ্যাটা অনেক গুণ বেড়ে যাবে।
বিউটির কাছে হার মাথা পেতে নিয়েছেন ২০০ মিটার স্প্রিন্টে স্বর্ণ জয়ী জাকিয়া সুলতানা। ১০০ মিটারে লড়াই করে জাকিয়া (১২.৫৫) বলেন, ‘বিউটি আপা অনেক সিনিয়র। তার সাথে এখনই পেরে উঠা সম্ভব না। আমাদের অনেক সময় আছে। আগামীতে আমি চেষ্টা করবো।’ বিকেএসপির আরেক শিক্ষার্থী শিরিন আক্তার তৃতীয় হয়েছেন, ১২.৬১ সেকেন্ড সময় নিয়ে। পুরুষদের ১০০ মিটার স্প্রিন্টে স্বর্ণ এবং রৌপ্য দু’টি পদক নিয়ে গেছে বিকেএসপি। তরুণ মেজবা আলোচনায় ছিলেন না। কাল বিকালের পড়ন্ত বেলায় তাকে নিয়ে হৈচৈ পড়ে গেল। টিভি ক্যামেরাগুলো ছুটল তার পেছনে। বেশ উচ্ছল এই তরুণ। দারুণ খুশি। মাঠের বাইরে চেয়ারে বসা মাকে জড়িয়ে ধরে সোনার পদকটা গলায় পরিয়ে দিলেন তিনি। দারুণ টাইমিং করেছেন। গত দুই আসরে মেজবা প্রথমে তৃতীয় এরপর দ্বিতীয় হয়েছিলেন। এবার তো অন্যদের ভালভাবে পেছনে ফেলে প্রথম হলেন। সাফল্যের রহস্য কি জানতে চাইলে মেজবা বললেন, ‘আমার ছেড়া রানিং স্যুটাই আমার লাকি। ৬০ মিটার দৌড়ানোর পর আমি অন্যদের পেছনে ফেলতে পেরেছি। ভালো রানিং সু্যুটার কারনে।’ মেজবার পরিবার খেলার মাঠেরই। মা অ্যাথলেটিকস করতেন। ভাই নৌবাহিনীতে ফুটবল খেলেন। কাজেই এমন কৃতিত্ব তাকেই মানায়। দেশের নতুন দ্রুততম মানবটি জানালেন কাল বিকেএসপিতে নিজের রুম থেকে বেরিয়ে আসার সময় সতীর্থ আবু রায়হানকে বলেছিলেন ‘বন্ধু আমরাই সেরা হবো।’ কথা রেখেছেন তিনি। মেজবার তারুণ্যের ঝলকানি মুগ্ধ করেছে ততৃীয় স্থান পাওয়া (১১.১২) মোহন খানকে। লন্ডন অলিম্পিক গেমসে অংশ নেয়া মোহন খান (১১.২৫) বাংলাদেশ গেমসের ব্যর্থতা প্রসঙ্গে বললেন, ‘ওরা খুব বেশি ভালো দৌড়েছে। এটা অবিশ্বাস্য।’ তার প্রশ্ন এতো কম বয়সে মেজবা কিভাবে এই টাইমিং (১০.৭৫) করল। এ ব্যাপারে বিস্তারিত কিছুতে না গিয়ে ২২ বছর বয়সের স্প্রিন্টার মোহন খান শুধু বললেন, ‘দেখা যাক এটা কত দিন টেকে। কারণ টিকে থাকাটাই আসল’।
