[ দু র্ঘ ট না ]

সাভারে ভবন ধস

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০১৩, ২১:৩৩
‘ভাইরে, মনে অইতেছিল যেন কবরে আছিলাম, আল্লায় কেমনে বাঁচাইলো-’ হাসপাতালের বিছানা থেকে গ্রামের বাড়ির ভাইকে মোবাইলে কেঁদে বলছিল এক শ্রমিক। তাকে সদ্য উদ্ধার করেছে ভবনের স্তূপের মধ্য থেকে। কতদিনের জন্য কবর থেকে তার এই বেঁচে যাওয়া কে বলবে? ২০০৫ সালের ভয়াবহ স্পেকট্রাম ভবন দুর্ঘটনায় প্রায় দুইশ’ শ্রমিক নির্মমভাবে নিহত হয়েছিল। ভবনে ফ্যাক্টরি করার উপযুক্ততার অভাবেই আগুনও লাগে। আগুন ও নানা দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল বেড়েই চলছে। যে শাসন ক্ষমতা আইনের প্রয়োগের মাধ্যমে তা থামাবে তারাই তো গার্মেন্টস ব্যবসায়ী তথা সেই মুনাফাখোর। তাদের লাভের হিসেবের কাছে গৌণ হয়ে যায় মানুষের জীবনের হিসেব। ২০০৫ সালে আশুলিয়াতে একটি ৯ তলা ফ্যাক্টরি ভবন ধসের পর নানা আলোচনা ও বিশ্লেষণ হয়েছিল। সেখানে উদ্ধার অভিযানের ব্যর্থতা ও প্রস্তুতির অভাব এবং ভবন নির্মাণের ত্রুটিগুলো উঠে আসছিল, সংগে এর প্রতিকারের নানা পরামর্শ ছিল। জাতীয় অগ্রগতির ধারায় যে বড় বড় অবকাঠামো ও শিল্প গড়ে উঠছে, তার ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণে এ জাতি কতটা উপযুক্ত সে প্রশ্ন উঠেছিল। আশা করা যাচ্ছিল, এরপর এরকম বড় দুর্ঘটনা আর ঘটবে না এবং সে অভিজ্ঞতা থেকে অবকাঠামো গড়া ও রক্ষণাবেক্ষণে সতর্ক হবে সংশ্লিষ্ট সকলে। কিন্তু আশ্চর্য হলো, একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা (ইউএনও, তিনি প্রকৌশলী বা ভবন বিশেষজ্ঞ নন) আগেরদিন ভবনটি পরিদর্শন করে ক্যামেরার সামনে বললেন, এটা সামান্য প্লাস্টার খসে পড়া, কোন ভয় নেই। পরদিনই ভবনটি ধসে পড়ে। একজন সরকারি কর্মকর্তার নজরে বিষয়টি গেলে তার ব্যবস্থাপনা কৌশল থেকে পদক্ষেপ নিলে এত প্রাণহানি ঠেকানো যেত। আসলে পুরো সরকারের চিত্রটাই এরকম। এ কর্মকর্তা যেমন দায়িত্বহীনতার দায় থেকে বেঁচে যাবেন, সরকারও বেঁচে যাবেন হয়তো, রয়ে যাবে সাধারণ গরিব মানুষের মৃত্যুঝুঁকি। ভবনে ত্রুটির অনুসর্গ হলো crack বা ফাটল দেখা। সকল ক্রাকই বিপজ্জনক নয়। কোনটা আস্তরের সংকোচন বা প্রসারণের কারণে হতে পারে বা পার্টিশান দেয়ালের মাঝ বরাবর বিমের বা স্লাবের নরমাল ডিফ্লেকশনের (deflection) কারণে হতে পারে। এগুলোকে নন-স্ট্রাকচারাল ক্রাক (non-structuarl crack) বলে। এগুলো মেরামত করে দিলেই চলে। structural crack কাঠামোর ক্ষতি করতে পারে। সব স্ট্রাকচারাল ক্রাক যে ভবন ধসের সৃষ্টি করবে তা নয়। যেমন-একটি বড় শিল্প গ্রুপের প্রধান ভবনে ২০০৫ সালে আমি চাকরি করতাম। তাদের ৯ তলা ভবনের মাঝের একটি জায়গায় প্রতিতলায় ক্রাক দেখা গেল। দেখলাম একটি কলাম মাইনর সেটেলমেন্ট (minor settlement) করেছে তথা কয়েক মিলিমিটার বসে গেছে। ফাউন্ডেশনের মাটি লাল সিল্টি ক্লে (radish silty clay) তথা অরিজিনাল সয়েল। ডোবা বা পুকুর ছিল না। নির্মাণ কোয়ালিটি ভালো। সুতরাং কলামটি ধসে যাওয়ার কথা নয়। হয়তো ফাউন্ডেশনের ফুটিং পর্যাপ্ত ছিল না। সেটাতে কোন বিপদ ঘটবে না। তবে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। তার মানে যখনই ক্রাক হয় তখন তার ধরন ও ভবন নির্মাণের ইতিবৃত্ত জানতে হবে ও ভবনের তাত্ক্ষণিক কনক্রিটের মান ও স্ট্রাকচারাল ডিজাইন চেক করতে হবে গুরুত্ব বুঝে। ক্রাক কিভাবে ঘটছে তা দেখলে অভিজ্ঞ প্রকৌশলী বিশেষ করে প্রকৌশলী শিক্ষকরা এটা ধরতে পারেন, বলতে পারেন সেটা স্ট্রাকচারাল ক্রাক কি-না। ক্রাক ডিজাইন বিষয়ক একটি চ্যাপ্টারই সিভিল প্রকৌশলে পড়ানো হয়। একটি বিমের বা আপনার মাথার উপরের স্লাবের ক্রাক কিভাবে ঘটছে দেখলেই বুঝা যায় এটা প্লাস্টার ক্রাক নাকি স্ট্রাকচারাল ক্রাক। যেমন আপনার মাথার উপরের স্লাবে যদি চারকোণা থেকে চুল ক্রাক (hair crack) হয়েছে দেখেন, তবে বুঝতে হয় তা স্ট্রাকচারাল ক্রাক। কিন্তু ছাদের এ ক্রাক নিয়ে ভবন তার পুরো লাইফ টাইম টিকতে পারে, যদি তা লাগোয়া বিমে দেখা না যায়। বিম না থাকলে সেই ক্রাক অন্যভাবে হবে এবং সেটা বিপজ্জনক হতেও পারে। আবার ধরুন বিমের মাঝে কোন ক্রাক দেখা যায়। তা লাগোয়া কলামের প্রচণ্ড টান (tension/stress)-এর কারণে টানমুক্ত (stress release) হতে ঘটে। সেটাও বিপজ্জনক না হতে পারে, যদি তা কলামে দেখা না যায়। সেজন্য ভূমিকম্পের সময় কলাম ঠিক থেকে বিমে ক্রাক হলে অনেক সময় টানমুক্ত হয়ে ভবনের বিপদ কমে যায়। সেজন্য বলে stronger column & weaker beam is better. কিন্তু যখন বিমের গোড়ার দিকে ক্রাক ঘটে তখন নিম্নমানের কনক্রিট বা কলাম ত্রুটি এরকম বিপজ্জনক বিষয়কে জানান দেয়। স্পেকট্রাম ভবনটি ধসে গিয়েছিল ভবনের একটি কর্নার কলামের নির্মাণ ত্রুটির কারণে। ভবনটি ফ্লাট প্লেটে নির্মিত ছিল বলে এবং কনক্রিটের মান নিম্ন পর্যায়ে ছিল বলে ভবন ধসে পড়ার আগে বেশি সময় ওয়ার্নিং দিতে পারেনি। তবুও ভেঙ্গে পড়ার আগে ওয়ার্নিং দিয়েছিল বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা দেয়ার মাধ্যমে। কিন্তু সেখানেও কোন বিশেষজ্ঞ ডাকা হয়নি। কিছু হবে না বলে অগ্রাহ্য করা হয়েছিল। ফ্লাট প্লেটে নির্মিত না হলে কনক্রিটের মান উত্তম হলে কর্নার কলামটির ত্রুটি আরো বেশি সময় ধরে দেখা দিত। এখানেও ভবনটি কলাপস করার আগে ফাটল দেখা দেয় এবং তা জনৈক প্রকৌশলী ও ইউএনও দ্বারা পরিদর্শন করার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু কিছু হবে না বলে অগ্রাহ্য করার পরিণতি একই হলো। যদিও একজন প্রকৌশলী বলেছিল শীঘ্র বুয়েটের পরামর্শ নেয়ার জন্য। কিন্তু মালিক রাজনৈতিক কর্মী বলে কথাগুলো গুরুত্ব পায়নি। জানা যায়, পৌরসভা থেকে ৫ তলা ভবনের অনুমোদন নিয়ে তিনি করেন ১০ তলা ভবন। তার মানে একটি কলাম ডিজাইন হয়ে থাকতে পারে ৫ তলার, তার উপর ওজন দিয়েছে ১০ তলার। এটা টিকবে কিভাবে? একটা ভবন সঠিকভাবে নির্মিত হলে তার ফ্যাক্টর অব সেফটি থাকে ২.৫ বা ৩। তার মানে তিনগুণ লোড দিলেও তা টিকে থাকতে পারে। সেজন্য তলা বাড়ালেও রাতারাতি পড়ে যায় না। ভবন তার ফ্যাক্টর অব সেফটি লিমিট অতিক্রম করলে কলাপস করে। স্পেকট্রাম ভবনটিও এক প্রভাবশালী মালিকের, যার সংগে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ছিল। এ ভবনটিও তাই। প্রভাবশালীর শক্তি দিয়ে অনেক কিছু হতে পারে, মাস্তানি হতে পারে আরো বেশি; কিন্তু টেকনোলজিক্যাল বিষয়ের নিয়ন্ত্রণ তো তা দিয়ে হয় না। একটি কনক্রিটের কলাম ৫ তলার লোড নিতে পারার মতো নির্মাণ করলে কোন প্রভাব দিয়ে তার উপর তো ৯ তলা করা যাবে না। ভবনটি কত তলার ফাউন্ডেশন ছিল তা জানা যায়নি। কলামের যে আকার, ভেঙ্গে পড়া কনক্রিটের যে প্রকার তাতে কেমন করে এ কলাম ও কনক্রিট দিয়ে ৯ তলা ভবন নির্মিত হলো তা আশ্চর্যই লাগে। কনক্রিট খুব ঝুরঝুরে। (দরকার ছিল ক্রাক দেখা দেয়ার পর ভবনের তলা উপর থেকে ভেঙ্গে কমিয়ে দেয়া।) সে ভবনে আবার গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি চলছিল। তার মানে সেখানে ভবনের ডেড লোড ছাড়াও ছিল নানা ধরনের মোভিং লোড তথা লাইভ লোড, মেশিনের ভাইব্রেশনের জন্য ইমপেক্ট লোড প্রতিদিন ক্রিয়াশীল ছিল। এ ভবনটিও মূলত ফাউন্ডেশন ফেইল্যুর। ডিফারেন্সিয়াল সেটেলমেন্ট হওয়াতে ক্রাক দেখা দেয়। কলামও চিকন হওয়াতে খুব সহজেই জয়েন্টে ভেঙ্গে পড়ে। ৮টি স্লাব ক্র্যাক-এর মতো হয়ে পড়ে। কোটি কোটি টাকার যান্ত্রিক শিল্প গড়ে তুলতে হলে যে প্রকৌশলী হতে হয় তা নয়; কিন্তু প্রকৌশলীসহ নানা ডিসিপ্লিনের লোককে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর ব্যবস্থাপনা কৌশল (management mechanism) তো জানতে হবে। না হলে সে শিল্প করার যোগ্যতা তার নেই। সেখানে এরকম একটি সেক্টর গড়ে উঠতে ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সেরকম সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে সরকারকে। সরকারের কি সে প্রচেষ্টা কখনো ছিল? যে কোনভাবে একটি ভবন করলেই তাতে একটি কারখানা দেয়া যায় না। সকলের বোঝার জন্য বলছি। ধরুন একটি ভবন আবাসিক ভবন হবে। তাহলে তাতে প্রতি বর্গফুটে লাইভ লোড (কনক্রিটের চেয়ে অতিরিক্ত আরোপিত ওজন) হয় ৪০ পাউন্ড। যখন সেটা অফিস ভবন হয় তখন ৬০ পাউন্ড ধরা হয়। যখন মার্কেট বা ক্রাউড হয় তখন ১০০ পাউন্ড। যখন কারখানা ভবন হয় তখন হালকা মেশিনারির জন্য ১২৫ পাউন্ড এবং ভারি মেশিনারির জন্য ২৫০ পাউন্ড হয়। ওজন যত বেশি বাড়ে কলাম তথা পিলারে লোড তত বাড়ে। ছাদের রড ও কনক্রিটের মান ও পরিমাণ বাড়াতে হয়। অনেকে বিশাল শক্তির রডের নানা কায়দায় বিজ্ঞাপন দেন এবং বলেন, ভবনের জন্য রডের ব্যবহারই আসল। আসলে কনক্রিট হলো আরো বেশি আসল। তার সাথে রড হলো একটি ককটেল আইটেম। কনক্রিটের গুণগত মান কম হলে উচ্চ শক্তির রড ব্যবহার করলেও সে শক্তির আংশিকই কাজে লাগে, পুরোটা কাজে লাগে না। আবার কনক্রিট ছাড়া রড খাড়া লোড নিতে পারে না, যদি তা মোটা জয়েন্ট না হয়। সুতরাং ভালো রড ব্যবহার করতে হলে ভালো কনক্রিট হতে হবে। তাহলে একটি আবাসিক ভবন বা অফিস ভবন হিসেবে কোন ভবনের ডিজাইন করে তাতে কারখানা করা যায় না। যখনই কোন দেশের অবকাঠামো বিশাল হয় তখন তার জন্য কঠোর নিয়ম আরোপ করতে হয়। আছে অকুপেন্সি সার্টিফিকেট (occupancy certificate) নেয়ার পদ্ধতি। মানে ভবনটি কি হিসেবে নির্মাণ করার অনুমোদন নেয়া হয়েছে, সেভাবে ডিজাইন ও নির্মাণ হয়েছে কি-না তা স্থপতি ও প্রকৌশলী থেকে সার্টিফিকেট নিতে হবে। সে প্রত্যয়ন সঠিকভাবে পেলে ভবনে বিদ্যুত্, পানি, গ্যাস, টেলিফোন ইত্যাদি কানেকশনের অনুমোদন দেয়া হয় ও কানেকশন দেয়া হয়। স্পেকট্রাম ভবন ধসের পর এরকম অকুপেন্সি সার্টিফিকেট নেয়ার আইন করা হয়। তাতে বলা হয়, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ও ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড অমান্য করে ভবন নির্মিত হলে যদি কোন আর্কিটেক্ট বা স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার সে ভবনের পজিটিভ অকুপেন্সি সার্টিফিকেট দেয় তবে ৭ বছর সশ্রম কারাদণ্ড হবে। কিন্তু আইনটি কার্যকর হয়নি। এ পর্যন্ত কোন ভবন ব্যবহারে কোন সেবা প্রতিষ্ঠান অকুপেন্সি সার্টিফিকেট নেয়নি। প্রতি ৫ বছর পরপর প্রতিটি ভবনের ব্যবহার সার্টিফিকেট দেয়ারও কথা। ভবনটি যেভাবে ডিজাইন হয়েছে তা থেকে কোন লোডেড কাজে ব্যবহার হয় কি-না। সুতরাং আইন করা আছে; কিন্তু কার্যকর নেই। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীকে কাজের সাথে জড়িয়ে থাকতে হলে তিনি নির্মাণের প্রতি পরতে পরতে রডের ব্যবহার ও মান, কনক্রিটের মান, টেস্ট রেজাল্ট, এসব পরিদর্শন ও অবলোকন করতো। এখন যেমন প্রকৌশলীর একটি সহজ জবাব আছে, বলে, সে সঠিকভাবে ডিজাইন করেছে; কিন্তু মালিক কাজটি সঠিকভাবে করেনি। যদি তাকে অকুপেন্সি দিতে হতো তবে মালিক তাকে কাজে লাগিয়ে রাখতে হতো। আসলে সবক্ষেত্রে একটিই নিয়ম পালন করলে ও অকুপেন্সি সার্টিফিকেট পদ্ধতির মাধ্যমে সার্ভিস লাইনের অনুমোদন হলে গ্রামগঞ্জ সবখানে ভবন নির্মাণ ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে, যদি অনুমোদনের জন্য যেখানে বিশেষ কোন কর্তৃপক্ষ নেই তথা সিটি করপোরেশনের বাইরের জন্য দায়িত্বটা হাইরাইজ ভবনের অনুমোদনের ক্ষেত্রে পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদের হাতে না থেকে সরকারের গণপূর্ত বিভাগের হাতে দেয়া হয়। কেবলমাত্র ৬ তলা পর্যন্ত ভবন অনুমোদন ক্ষমতা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হাতে রাখা যেতে পারে। স্পেকট্রাম ভবন ধসের পর উদ্ধার কাজের সক্ষমতা নিয়ে বিশাল প্রশ্ন ছিল। বড়-ছোট তেমন যন্ত্রপাতির ব্যবহার খুব কম ছিল। এরপর সরকার বেশকিছু পদক্ষেপ নিলেও এই ভবন ধসের পর দেখা গেল কনক্রিটের ছাদ ছিদ্র করতে পাবলিকের হাতুড়ি-বাটালই ব্যবহার করছে। কোথায় কনক্রিট কাটার মেশিন? এবারে সেনাবাহিনী ও দমকল বাহিনীর তত্পরতা আগের চেয়ে উত্তম তা বলাই বাহুল্য। খুব দ্রুত সাভার ক্যান্টনমেন্টের নবম ডিভিশনের মতো শক্তিশালী বাহিনীর নানা শাখা কাজে লেগে যায়। চিকিত্সা টিমগুলো অতি পরিশ্রম ও আন্তরিকতার সাথে উদ্ধার কাজ করে ও জরুরি চিকিত্সা দেয়। রাতে শুনলাম তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে যাদের হাত বা পা বা কোন অংগ কনক্রিটে আটকে থাকার জন্য তাদেরকে উদ্ধার করা যাচ্ছে না তাদের ঐ অংগ কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এসব উদ্ধার তত্পরতাও একটি ইঞ্জিনিয়ারিং। যেমন কারো উপর অনেকক্ষণ কোন ভারী লোড চাপা হয়ে থাকলে বিশেষ ব্যবস্থা না নিয়ে উক্ত ওজন হঠাত্ সরালে ঐ ব্যক্তি মারা যাবে। তাকে আগে স্যালাইন দিয়ে পরে চাপা পড়া খণ্ডটি সরাতে হয়। ফায়ার ব্রিগেডের লোকবলের পরিমাণ ও তত্পরতাও বেশ ভালো। যন্ত্রপাতির ব্যবহার কম হওয়ায় ক্ষেপে যায় পাবলিক। তারা পুলিশকেও ধাওয়া দিয়েছে। অবশ্য সেনাবাহিনী যা বলেছে, বড় যন্ত্রপাতি ব্যবহার করলে যারা ভেতরে আটকা পড়ে বেঁচে আছে তারা ঝুঁকির মধ্যে চলে যাবে। মেশিন ব্যবহারের ফলে আবার কোন ঝাঁকুনি খেলে ভবন আড়মোড়া ভেঙ্গে পড়ার মতো কোন কোন অংশের তলায় জীবিতরা নতুন করে চাপা পড়তে পারে। যত সক্ষমতাই থাকুক, কনক্রিটের কোন বড় কাঠামোকে রাতারাতি সরানোর কোন পথ নেই, যদি সেখানে মানুষ আটকা পড়ে বাঁচার আর্তি শোনা যেতে থাকে। ভবনের কোন ছাদের তলায় আটকে থেকে একটি মেয়ে বিকেলেও চিত্কার করছিল ‘ভাইরে, আমরা ত্রিশজনের মতো বাঁইচা আছি, আমাগরে বাঁচান’। খুবই হূদয়বিদারক আর্তনাদ। ১৬ কোটি মানুষের সরকার, দুই লক্ষ কোটি টাকা বাজেটের সরকার, প্রায় ২ লাখ সেনাবাহিনীর দেশ, এরকম আর্তনাদ শুনতে হলে সে জাতির লজ্জাজনক অসহায়ত্ব কোথায় রাখা হবে! প্রকৌশলীদের ঠিকমত কাজে লাগায় না শক্তিমান ব্যবসায়ীরা। সেটা এখানে প্রমাণিত হলো। একবার আমি একটি ফ্যাক্টরি নির্মাণ কাজ পরিদর্শনে নতুনভাবে গেলাম। দেখলাম, ইটের গুঁড়ার আধিক্য দিয়ে কলাম কাস্টিং হচ্ছে। আমি সব বাতিল করে কাস্টিং বন্ধ করে দিয়ে এলাম। পরদিন গিয়ে দেখলাম সবগুলো কলামই কাস্টিং হয়ে গেছে একই ইটের গুঁড়া দ্বারা। সাব-কন্ট্রাক্টর বললো, কোম্পানির চেয়ারম্যান বলছে করে ফেলার জন্য। সেখানে প্রকৌশলীর করার কি আছে। আমি সেখানে আর বেশিদিন থাকিনি প্রকৌশল ব্যবস্থাপনায় বেশি খবরদারি সহ্য হয়নি বলে। স্পেকট্রাম ভবন ধসের পর আমরা জানাচ্ছিলাম, সেনাবাহিনীর একটি ডিভিশন থাকা উচিত দুর্যোগপূর্ণ এ দেশে জনগণকে দুর্যোগ বা যে কোন বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য সকলভাবে সক্ষম করে রাখা। তাদের সকল ধরনের পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি থাকবে, বিশেষ প্রশিক্ষণের লোকবল থাকবে, ইত্যাদি। যেভাবে ঢাকা শহরে বা দেশের বিভিন্ন শহরে ভবন নির্মিত হয়েছে, বিশেষ করে সিলেট ও চিটাগাংয়ের মতো ভূমিকম্প জোনে, যদি ভূমিকম্প হয় এবং কয়েক ডজন ভবন ধসে পড়ে, তবে সময়মতো উদ্ধার করা না গেলে উক্ত শহর পরিত্যক্ত হয়ে পড়বে। বেশকিছু ভবন এখনো নির্মিত হচ্ছে বিপজ্জনকভাবে। চিকন চিকন কলাম দিয়ে নিম্নমানের কনক্রিট ব্যবহার করে ফ্লাট প্লেটে তৈরি হয়েছে ভবন। নাড়া খেলে এসব ভবন কলাম ও স্লাবের জয়েন্টে পাঞ্চিং হয়ে ধসে পড়বে। অন্তত নিচতলায় কলাম বিম দিলে ঝুঁকি কম হতো। কিন্তু কেবল ফ্যাক্টরি ভবন নয়, আবাসিক ভবনও অনেক অযোগ্য লোকের তত্ত্বাবধানে নির্মিত হচ্ছে। যত অসুবিধাই সৃষ্টি হোক বা কোন সেক্টরের ব্যবসায় আপাতত ধস নামুক, আইনের কঠোরতা শুরু হতেই হবে ও তা অনবরত চলতে হবে। কেউ ভবন নির্মাণ করলে তাকে আইন মেনেই করতে হবে। অন্য কোন অজুহাত বা যুক্তি চলবে না। না হলে জাতির অভিজ্ঞতায় কেবল সমুদ্রের সাইক্লোনের ধ্বংসের মতো হূদয়বিদারক ঘটনা চলতেই থাকবে, যা জাতিকে মানসিক সবলতা দিবে না, যা একটি জাতির উন্নয়নশীল অবস্থা বজায় রাখার জন্য জরুরি। ধসে পড়া ভবনের মধ্য থেকে উদ্ধারের পর এক শ্রমিক বলছিল, ‘ভবনটি ধসে পড়তে থাকলে আমরা ২৫ জন শক্ত কাটিং টেবিলের নিচে ঢুকি। কিছুক্ষণ পর দেখি সবে বাঁইচা আছি। নিজেরা বলি, ভাই, হয় একসাথে বাঁচবো বা একসাথে মরবো।’ ভাবছি, এরকম দৃঢ় ঐক্য থাকলে সরকারও আইনের শাসন নিশ্চিত করতে বাধ্য হবে, অন্য কোন পথ সবই বৃথা গেল। এ সূত্রে মনে পড়ে সে কথাটি ‘শৃঙ্খল ছাড়া হারাবার কিছু নেই, জয় করে নেয়ার আছে দুনিয়াটাই।’ লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট এন্ড এনভায়রনমেন্ট ফোরাম (বিডিইএফ) e-mail: [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন