আমরা কম্পিউটার ব্যবহারকারীরা একটি সফটওয়্যার প্রোগ্রাম ব্যবহার করার সময় খুব সহজভাবে মেনু দেখে, নির্দেশ দিয়ে, চোখের পলকে মাউসের ক্লিকে আমাদের প্রয়োজনীয় কাজগুলো— হোক সে তথ্য-উপাত্ত নিয়ে কাজ, লেখালেখি, হিসেব-নিকেশ বা গান শোনা—কম্পিউটারকে দিয়ে করিয়ে নেই। কিন্তু আমরা কখনো কি ভেবে দেখেছি যে সফটওয়্যার প্রোগ্রাম ব্যবহার করা হচ্ছে এর সৃষ্টির পেছনে, তৈরির প্রক্রিয়ায় কত চিন্তা, কত শ্রম, কত অর্থ, কত সময় ব্যয় করা হয়েছে! একটি সফটওয়্যার তৈরির জন্য কম্পিউটার হার্ডওয়্যার, ডাটাবেজ, অপারেটিং সিস্টেম, বিশেষ ভাষা, সিস্টেম এনালিস্ট, ডিজাইনার, প্রোগ্রামার, কোডার, সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি ইত্যাদি কত আয়োজন, কত কর্মকাণ্ডের যে প্রয়োজন হয় আমরা সাধারণ ব্যবহারকারীরা তা ভেবে দেখি না। না ভাবার কারণ বোধ হয় এই যে, আমরা অধিকাংশই সফটওয়্যারটি কিনে ব্যবহার করি না। অর্থের বিনিময়ে সফটওয়্যারটি ব্যবহার করা হলে এর যথাযত মূল্য অনুধাবন করা যেত।
আসুন আমরা বোঝার চেষ্টা করি কেন মেধাভিত্তিক কোনকিছু কিনে ব্যবহার করা উচিত। আপনি যদি একজনকে একটি মাছ দেন সে একদিনে খেয়ে ফেলবে। আপনি যদি তাকে মাছ ধরা শিখিয়ে দেন তবে প্রতিদিন সে নিজে মাছ শিকার করে খাবে। ধরা যাক একজন নদীতে মাছের অবস্থান, কোন ধরনের মাছ কোথায় থাকে ইত্যাদির জন্য গবেষণা করে, প্রযুক্তির ব্যবহার ও অর্থ বিনিয়োগ করল এবং সেই শুধু এসব জানল। এখন সে যদি অন্য সবাইকে জানিয়ে দেয়, তাহলে সহজেই তারা সব মাছ শিকার করে নিয়ে যাবে। তাহলে তাকে যেটা করতে হবে তা হচ্ছে নদীতে একটি সীমানা তৈরি ও মাছ ধরার কিছু নিয়ম-কানুন করে দিতে হবে। এভাবেই অন্যের জন্য মত্স্যক্ষেত্র ব্যবহারের অনুমোদন দেয়া হবে এবং যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী তথ্য ও জ্ঞানের অনুমোদিত ব্যবহার করতে পারবে। এই মত্স্যক্ষেত্র যার পছন্দ নয় বা অনুমোদন নেয়ার সামর্থ্য নেই সে অন্য মত্স্যক্ষেত্র খুেঁজ নেবে। মেধাভিত্তিক যে কোনকিছু বই, গান, চিত্রকলা বা ছায়াছবি এসবও এই মত্স্যক্ষেত্রের মতোই যেগুলো আমরা আমাদের প্রয়োজনে ব্যবহার করি ঠিকই; কিন্তু এগুলোর জন্য যথাযত মূল্য দিই না। আর এই না দেয়াটাই মেধাভিত্তিক কোনকিছুর অবৈধ ব্যবহার, মেধাস্বত্ব আইনের লঙ্ঘন। ধরা যাক আপনি একটি বই পড়ছেন। বইটি আপনার হাতে; কিন্তু বইয়ের লেখাগুলোর মালিক হচ্ছেন তিনি যিনি বইটি লিখেছেন। বই বা গানের মতো সফটওয়্যারও একটি মেধাভিত্তিক সম্পদ, যেটি যিনি বা যারা তৈরি করেছেন তারাই এর স্বত্ব সংরক্ষণ করেন এবং অর্থের বিনিময়ে অন্যদের ব্যবহার করতে দিতে পারেন।
সফটওয়্যারের স্বত্বাধিকার অন্যান্য মেধাভিত্তিক সম্পদের চেয়ে একটু ভিন্ন। কারণ সফটওয়্যারের কোন ভৌত কাঠামো নেই, অন্য দ্রব্যের মতো দেখা বা ধরা-ছোঁয়া যায় না। সফটওয়্যার একটি জ্ঞানভিত্তিক উপকরণ। এর স্বত্বাধিকার সাধারণত চুক্তিপত্র বা দলিল দিয়ে সংরক্ষণ করা যায়। ব্যবহারকারী ও সফটওয়্যার উন্নয়নকারীর মধ্যে সফটওয়্যার বিক্রি ও ব্যবহার অধিকারের চুক্তিপত্র তাই একটি আইনি দলিল। যে কোন বাণিজ্যিক সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানকে সফটওয়্যার তৈরি ও বিতরণের মূল্য, পরবর্তী উন্নত সংস্করণ তৈরির খরচ, বিক্রয়োত্তর সেবা ইত্যাদির জন্য প্রয়োজনীয় মূল্য ক্রেতার কাছ থেকে নিতে হয়। আর এসব কারণেই অবৈধভাবে কপি বা অনুলিপি করে সফটওয়্যার ব্যবহার করাকে আইনত অপরাধ বলে গণ্য করা হয়।
শুধু এমএস ওয়ার্ড কেন, আমাদের দেশে তৈরি নিকাশ, কর্মী, বিজয়, প্রশিকা, লেখনি, ত্রয়ী ও অন্যান্য সফটওয়্যার যদি আপনি না কিনে ব্যবহার করেন তবে শুধু পাইরেসির মতো অপরাধই করছেন না, দ্রুত বিকাশমান একটি শিল্পের সরাসরি ক্ষতি করছেন। তাছাড়া ভাবুন তো একজন কিছু বিশুদ্ধ চিন্তা করছেন, চিন্তাকে বাস্তব রূপ দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো তৈরি করছেন, একে মানুষের প্রয়োজন ও ব্যবহার উপযোগী করে তুলছেন। তিনি তার সৃষ্টিকে মানুষের প্রয়োজনে ও কল্যাণে মানুষের হাতে তুলে দিচ্ছেন; কিন্তু তিনি এর বিনিময়ে কিছুই পাচ্ছেন না। তার মানে দাঁড়াচ্ছে, যে সমাজে যে সাংস্কৃতিক বলয়ে আমরা বাস করি সেখানে সৃষ্টিশীল কর্মের মূল্যায়ন হয় না। সৃষ্টিশীল মানুষের নাম, শ্রম, প্রচেষ্টা হারিয়ে যাচ্ছে এবং এভাবেই অন্য সৃষ্টিশীল মানুষ তাদের কাজে নিরুত্সাহিত হচ্ছে। সিডি কিংবা ডিস্ক থেকে কম্পিউটারে কপি করে ব্যবহার করাই শুধু পাইরেসি নয়, ইন্টারনেট থেকে অনুমোদিত নয় এমন কিছু ডাউনলোড করা, কম্পিউটার ভেন্ডারের ইনস্টল করে দেয়া সফটওয়্যার, একই ধরনের নকল সফটওয়্যার অল্প মূল্যে কিনে ব্যবহার ইত্যাদিও পাইরেসির আওতায় পড়ে।
তথ্য-প্রযুক্তি এখন এগিয়ে চলেছে দুর্বার গতিতে। ব্যবসা, গবেষণা, উন্নয়ন কাজকর্ম থেকে শুরু করে দৈনন্দিন বিনোদন ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে কোথায় নেই তথ্য-প্রযুক্তি। আগামী কয়েক বছরে বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগের ব্যাপক ব্যবহারের ফলে পাল্টে যাবে মানুষের জীবনধারা। বিভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ড ও সেবাসমূহ তথ্য, চিত্র, ভিডিও আকারে চলে আসছে মানুষের হাতের মুঠোয়, আঙুলের ডগায়। আর এই সবকিছুর মূলে থাকবে কম্পিউটার প্রযুক্তির আওতায় তৈরি, উন্নয়ন ও পরিবর্ধনকৃত বিভিন্ন বিষয় বৈচিত্র্যের অগণিত সফটওয়্যার প্রোগ্রাম। এসব সফটওয়্যার প্রোগ্রামের স্বত্বাধিকার ও ব্যবহারবিধি যে দেশ, যে জাতি যত ভালোভাবে সুকৌশলে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে সে তত লাভবান হবে। বাংলাদেশ GATT ও WTO চুক্তিতে সই করেছে, WIPO-এর সদস্য, সংসদে IPR পাস হয়েছে। এখন প্রয়োজন এসবের যথাযত অনুসরণ ও প্রয়োগ। এর পাশাপাশি সফটওয়্যার ব্যবহারের ক্ষেত্রে সকলের নৈতিক সচেতনতা অত্যাবশ্যক। জ্ঞানভিত্তিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় উত্তরণের জন্য মেধাস্বত্ব সংরক্ষণ করা ও এর অননুমোদিত ব্যবহার রোধ করা এখনই জরুরি হয়ে উঠেছে। আর তা না করতে পারলে তথ্য-প্রযুক্তি দিয়ে আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বপ্ন শুধু স্বপ্ন হয়েই থেকে যাবে না, আমরা জ্ঞানে-প্রযুক্তিতে একটি অনগ্রসর জাতি হয়ে রইব।
লেখক: তথ্য-প্রযুক্তি পেশাজীবী, ঢাকা
