নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও উদ্ধারকাজের অগ্রগতি সন্তোষজনকই বলিতে হইবে। মনে রাখিতে হইবে যে কংক্রিট ও লোহালক্কড়ের বিশাল ধ্বংসস্তূপের ভিতর হইতে দুই সহস্রাধিক নারী-পুরুষকে জীবিত উদ্ধার করা কোনো সামান্য ব্যাপার নহে। ইহার মূল কৃতিত্ব অবশ্যই উদ্ধারকাজে নিয়োজিত সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব ও ফায়ার সার্ভিসসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহের। দুর্ঘটনার পর হইতে এইসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও কর্মীদের একদিকে যেমন বিরতিহীনভাবে উদ্ধারকাজ চালাইয়া যাইতে হইতেছে, অন্যদিকে তেমনি সামাল দিতে হইতেছে নানাবিধ অনভিপ্রেত পরিস্থিতিরও। শোকাহত স্বজনদের চাপ তো আছেই। ইহা অপ্রত্যাশিত নহে। কিন্তু কৌতূহলী মানুষের ভিড় ও বিশৃঙ্খলার কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হইলেও সেইদিকে কাহারও নজর নাই। বরং দুর্ঘটনাস্থলেই বিক্ষোভ প্রদর্শন, এমনকি উদ্ধারকর্মীদের দিকে ইট-পাটকেল নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটিয়াছে। শুধু তাহাই নহে, উদ্ধারকর্মীরা যখন আহার নিদ্রা ভুলিয়া অমানুষিক পরিশ্রম করিয়া চলিয়াছেন— তখনো কিছু মানুষ ব্যস্ত ছিদ্রান্বেষণ এবং কাদা ছোঁড়াছুঁড়িতে। জাতির এই সংকটময় মুহূর্তে দল-মত ও শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে সকলেরই যখন ঐক্যবদ্ধভাবে ধৈর্যের সাথে দুর্গতদের পাশে দাঁড়ানো দরকার, তখনো বন্ধ হয় নাই নির্বিচার গাড়ি ভাঙচুর এবং শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা ও অগ্নিসংযোগ। বিশেষ করিয়া উন্নয়নশীল গুটিকয় দেশ ছাড়া বর্তমান বিশ্বে এই ধরনের দায়িত্বহীন ও নৈরাজ্যকর আচরণের উদাহরণ অত্যন্ত বিরল।
ইহা অনস্বীকার্য যে উদ্ধারকাজে সর্বস্তরের মানুষ যেইভাবে সহমর্মিতা ও সহযোগিতার হাত প্রসারিত করিয়াছেন তাহার কোনো তুলনা হয় না। অসংখ্য মানুষ রক্ত দিতে আগাইয়া আসিয়াছেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে। আহতদের সর্বতোভাবে সেবাশুশ্রূষা করিয়া চলিয়াছেন দিনরাত্রি। দেখভাল করিতেছেন দূর-দূরান্ত হইতে আগত হতাহতদের শোকবিহ্বল আত্মীয়-পরিজনকে। সর্বোপরি, নিজের জীবন বিপন্ন করিয়া ঝাঁপাইয়া পড়িয়াছেন ধ্বংসাবশেষের মধ্যে অবরুদ্ধ মানুষের উদ্ধারকাজে। ইহা যে মনুষ্যত্ব ও মমত্ববোধের অনন্য দৃষ্টান্ত তাহাতে সন্দেহ নাই। তবে মনে রাখিতে হইবে যে শুধু আবেগ দিয়া এই ধরনের মহাবিপর্যয় সামাল দেওয়া যায় না। ইহার জন্য প্রয়োজন সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রশিক্ষণ, পেশাদারিত্ব ও শৃঙ্খলা। কারণ সামান্য ভুলের কারণে বিপর্যয়ের মাত্রা আরও বাড়িতে পারে। ঘটিতে পারে বড়ো ধরনের দুর্ঘটনা। বিপন্ন হইতে পারে আরও বহু মানুষের জীবন। উদ্ধারকাজে নিয়োজিত সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা বিষয়টি জানেন। জানেন এই ধরনের উদ্ধারকাজের উপযুক্ত কৌশল ও কর্মপদ্ধতি। কারণ এই বিষয়ে তাহাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ রহিয়াছে। উদ্ধারকাজ সমন্বয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনাবাহিনীর উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বারবার তাহা স্মরণ করাইয়া দিলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনভিপ্রেত সমালোচনা, দায়িত্বহীন মন্তব্য ও বিশৃঙ্খলা থামার কোনো আলামত দেখা যাইতেছে না।
গুরুতর প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও দায়িত্বহীনতাই যে স্মরণকালের ভয়াবহতম এই ট্র্যাজিডির জন্য দায়ী তাহাতে তিলমাত্র সন্দেহ নাই। ভবন নির্মাণের অনুমতি ও তদারকি হইতে শুরু করিয়া কয়েক হাজার মানুষকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলিয়া দেওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রেই চরম গাফিলতি পরিলক্ষিত হইয়াছে। কে বা কাহারা ইহার জন্য দায়ী— তাহাও ইতিমধ্যে মোটামুটি স্পষ্ট হইয়া গিয়াছে। সর্বোপরি, বিচার বা প্রতিকারহীনতার কারণেই যে পোশাক শিল্পখাতে একের পর এক ট্র্যাজিডির সৃষ্টি হইতেছে— তাহাও সর্বজনবিদিতই বলা চলে। আশার বিষয় হইল, সাভারের এই অভূতপূর্ব মানবিক বিপর্যয়ের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের ক্ষমা নাই— এই বিষয়ে জাতি আজ একাট্টা। ক্ষমতাসীনরা দেশবাসীর এই মনোভাব বুঝিতে পারিলে ভালো। না পারিলে ইহার সকল দায় যে সুদে-আসলে তাহাদেরকে মিটাইতে হইবে তাহাও বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে ভুলিলে চলিবে না যে ইতোমধ্যে মৃতের সংখ্যা তিনশত ছাড়াইয়া গিয়াছে। মৃত্যুর এই কাফেলা কোথায় গিয়া থামিবে বলা মুশকিল। উদ্ধারকারীদের প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, এখনো ভিতরে অবরুদ্ধ হইয়া আছে অসংখ্য মানুষ। তাহাদের মধ্যে অনেকেই জীবিত। কী দুঃসহ অবস্থার মধ্যে গত তিনটি দিন উদ্ধারের আশায় তাহারা প্রহর গুণিতেছে তাহা ভাবিতেও হূদয় বিদীর্ণ হয়। বাস্তবিকই জাতির জন্য ইহা এক অভাবনীয় পরিস্থিতি। এই সংকটময় মুহূর্তে সব চাইতে বেশি প্রয়োজন ঐক্য, শৃঙ্খলা ও সংযম। ভুক্তভোগীদের রাগ-ক্ষোভ থাকিতেই পারে। কিন্তু তাহা প্রদর্শন কিংবা তাহাতে ঘৃতাহুতি করিবার সময় যে ইহা নহে— সংশ্লিষ্ট সকলকেই তাহা অনুধাবন করিতে হইবে।
