বাসার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করিবার জন্য সশস্ত্র সংঘাতে বিদ্রোহীদের সহিত অংশ লইতেছে ইউরোপ হইতে আগত যোদ্ধারা। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইইউ) গত বুধবার এই তথ্য জানাইয়াছে। এইদিকে, ইসরায়েলের উত্থাপিত দাবির উপর ভিত্তি করিয়া রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের দায়ে সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করিতে শুরু করিয়াছে বিদ্রোহীরা। ইইউ জানাইয়াছে, বর্তমানে পাঁচ শতাধিক ইউরোপীয় বিদ্রোহীদের পক্ষ হইয়া সিরিয়াতে বাসার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়িতেছে। ইহাদের মধ্যে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও আয়ারল্যান্ড হইতে আগত লোকের সংখ্যা অধিক বলিয়াও জানানো হইয়াছে। সংগঠনটির আশঙ্কা এই যে, সিরিয়াতে অবস্থানকালে তাহাদের কেহ কেহ ধর্মীয় উগ্রবাদী সংগঠনগুলির সহিত জড়াইয়া পড়িতে এবং পরবর্তীকালে ইউরোপের মাটিতে সন্ত্রাসী হামলা চালাইবার পরিকল্পনা লইতে পারে।
সিরিয়াতে দীর্ঘদিন ধরিয়া যে রক্তাক্ত সংঘাত চলিতেছে তাহা কোনভাবেই কাম্য নহে। বাসার নিঃসন্দেহে একজন স্বৈরাচার, যিনি অগণন মানুষের প্রাণের বিনিময়ে ক্ষমতা আঁকড়াইয়া রহিয়াছেন। এখানেই সমাপ্ত নহে— তিনি নিজ জনগণের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলিকে ব্যবহার করিয়া চলিয়াছেন অনুশোচনাহীনভাবে। অন্যদিকে, স্বৈরাচারী সরকারের বিরোধিতার নামে বিদ্রোহীরাও জনগণকেই জিম্মি করিয়া চলিয়াছে। এক্ষণে নূতন যেই খবরটি ইইউ-এর তরফ হইতে আসিয়াছে তাহা দুশ্চিন্তার বিষয় বটে। ধারণা করা যাইতে পারে যে, ইউরোপ হইতে আগত বিদ্রোহপক্ষের যোদ্ধারা নৃগোষ্ঠীর বিচারে অ-ইউরোপীয় এবং সুন্নী সম্প্রদায়ভুক্ত। সিরিয়াতে সংঘাতের ক্ষেত্রে শিয়া-সুন্নী বিভেদটিকে অন্যতম মূল কারণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। অবশ্য অনেকে এই তথ্য স্মরণে রাখাটা প্রয়োজন মনে করেন যে, বাসারের শাসন ব্যবস্থাটি মূলত শিয়াদের মধ্যে সংখ্যালঘু একটি অংশ আলওয়াত সমপ্রদায়ের নিয়ন্ত্রণাধীন। উল্লেখ্য, এমন এক সময়ে সরকারবিরোধী সুন্নী বিদ্রোহীদের পক্ষে ইউরোপীয় যোদ্ধা ব্যবহারের খবর আসিয়াছে যখন বাসারের সরকারের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের ইসরায়েলী অভিযোগ লইয়া মাঠ গরম করিতে শুরু করিয়াছে বিদ্রোহীরা।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির কূটজালে পড়িয়া সিরিয়ার পরিস্থিতি ঘোরতর বিপর্যয়কর জায়গাতে গিয়া ঠেকিয়াছে। লক্ষ্য করিবার মত বিষয় বটে, সরকারবিরোধীরা একদিকে পশ্চিমা বিশ্বের সহানুভূতি পাইতেছে, অন্যদিকে আবার সাম্প্রতিককালের পশ্চিমা-বিরোধী উগ্রবাদী সুন্নী গ্রুপগুলিও তাহাদের সমর্থনে মজুত আছে। আরও আশ্চর্য হইবার মত ব্যাপার এই যে, বাসারকে অভিযুক্ত করিবার জন্য বিরোধীরা গত কয়েকদিন ধরিয়া, অন্যত্র যাহারা ঘোরতর শত্রু হিসাবে পরিগণিত হইয়া থাকে সেই ইসরায়েলের দেওয়া তথ্য ব্যবহার করিয়া রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের দায়ে বাসারকে অভিযুক্ত করিতেছে। এইখানেই শেষ নহে, রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার প্রসঙ্গে মার্কিন প্রশাসন কেন কিছু করিতেছে না তাহা লইয়াও উষ্মা প্রকাশ করিতেছে। এইদিকে, বাসারও নিয়মিত বিরতিতে পশ্চিমা শক্তির উদ্দেশ্যে এই বার্তা দিয়া চলিয়াছেন যে, তাহাকে হটাইবার অর্থ হইবে সিরিয়াকে ধর্মীয় উগ্রবাদীদের হাতে তুলিয়া দেওয়া।
আফসোস এই যে, এমনি করিয়াই সিরিয়া ও সিরিয়ার মত অনেক দেশের ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতার দখল লইতে যারপরনাই উন্মত্ত হইয়া থাকা পক্ষগুলির বিভেদের সুযোগে বিবাদ-মীমাংসার দায়িত্ব চলিয়া যায় বহিঃশক্তির হাতে। খুব স্বাভাবিক যে, শক্তিমান বহিঃশক্তিগুলি বিবাদ মীমাংসা করিবার সময় স্বার্থনিরপেক্ষ হয় না। বরং অনেক সময় নিজেদের স্বার্থকেই অগ্রে স্থাপন করে। আর সিরিয়ার মত আরও অনেক দেশের রাজনীতিকেরাই এইসব বিষয়কে ধর্তব্যের মধ্যে না লইয়া যেনতেনভাবে ক্ষমতায় আসীন থাকা বা আসীন হওয়াকেই প্রধান করিয়া তুলিবার মাধ্যমে নিজ-নিজ দেশের মেরামত-অযোগ্য ক্ষতিসাধন করিয়া ফেলে।
