আর কত প্রাণ এভাবে বলি হবে?

আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০১৩, ২০:৫৬
মরছে শ্রমিক। কখনও ভবন ধসে, কখনও পায়ের তলায় পিষ্ট হয়ে, কখনও বা আগুনে পুড়ে। শ্রমিকদের এই করুণ মৃত্যু থামানোর যেন কেউ নেই। সাভারের রানা প্লাজায় ২৪ এপ্রিল ভবন ধসে শত শত মানুষ যেভাবে করুণ মৃত্যুর শিকার হলো তা গোটা জাতিকে শোকে স্তব্ধ করে ফেলেছে। ভবনটিতে বিপজ্জনক ফাটল দেখা দেয়া এবং সতর্কবাণীর পরও ভবন ও কারখানা মালিকরা এই ভবনটি ব্যবহার অব্যাহত রেখেছেন। তারা শ্রমিকদের বাধ্য করেছেন ওই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে কাজ করতে। তারই পরিণতিতে এমন করুণ মৃত্যু আমাদের দেখতে হলো। এর আগে গত বছরের ২৩ নভেম্বর আশুলিয়ার তাজরীন গার্মেন্টস কারখানায় শতাধিক মানুষ পুড়ে ছাই হয়েছিল। জীবনের ন্যূনতম দাবি মেটাতে তীব্র বেকারত্বের এই দেশে সামান্য মজুরিতে যারা কাজ করতে আসছে, দেখা যাচ্ছে, মালিকপক্ষের উদাসীনতা, অব্যবস্থাপনা, লোভের কারণে একের পর এক শ্রমিক মারা পড়ছে। কখনও আগুনে পুড়ে, কখনও ধসে পড়া ভবনের নিচে চাপা পড়ে সীমাহীন যন্ত্রণা, অসহায়তা নিয়ে একটু একটু করে দমবন্ধ হয়ে মারা পড়ছে মানুষগুলো। প্রশ্ন হলো, একবিংশ শতকে এসেও এমন অমানবিক নারকীয় পরিস্থিতি আমরা কীভাবে মেনে নেবো? যারা মরে গেছে তাদের গরিব পরিবারগুলোর কথা না হয় বাদই দিলাম, তারা আমাদের কাছে জবাবদিহি চায়নি, কখনও চাইবেও না, কিন্তু কীভাবে বুঝ দেবো নিজের বিবেককে? এই ভবনের নিচে চাপা পড়ে মরা অসহায় গরিব মানুষগুলোর জন্য আমরা কোন্ বাক্য রচনা করবো? কী প্রতিশ্রুতি দেবো? আমাদের দেশে দুর্ঘটনা কেন ঘটল—সে প্রশ্নের মীমাংসা কখনই হয় না। এবারও তা হবে কিনা জানি না। সরকারের কর্তাব্যক্তিরা পর্যন্ত নানা রকম বালখিল্য মন্তব্য করছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ভবন ধসের কারণ সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, হরতালকারীরা ভবনের পিলার ও কলাপসবিল গেট ধরে নাড়া বা ঝাঁকি দেয়ায় এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে বিএনপি নেতা হান্নান শাহ বলেছেন, গার্মেন্টস খাত ধংস করতে সরকারি ষড়যন্ত্রে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। চরম শোক দুর্যোগের মুহূর্তে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের এ ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য জাতি হিসেবে আমাদের দীনতাকেই প্রকাশ করে। এ ধরনের মন্তব্য ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের পক্ষে কখনই সহায়ক হয় না। এর আগেও সরকারের পক্ষ থেকে ভবন ধস, পোশাক কারখানায় অগ্নিকাণ্ড বা শ্রমিক বিক্ষোভের ঘটনাগুলোকে ষড়যন্ত্র বা নাশকতা হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু সরকার কোনো ঘটনারই পেছনের কারণ উদঘাটন করতে পারেনি। কোনো ষড়যন্ত্রের জালই ছিন্ন করতে পারেনি। এবার অবশ্য এখনও তেমন ষড়যন্ত্রের কথা সরকারিভাবে বলা হচ্ছে না। সচেতনমহল থেকে এই দুর্ঘটনার জন্য ভবনের মালিক ও পোশাক কারখানার মালিকদের দায়ী করা হচ্ছে। ভবনের মালিক হিসেবে সরকারি দলের সমর্থক এক নেতার নাম উচ্চারিত হওয়ায় বিষয়টি একটি নতুন রাজনৈতিক মাত্রাও পেয়েছে। পুরো বিষয়টিকে অনেকেই দেখছেন সরকারি দলের এক জুলুমবাজ নেতার অপকর্ম হিসেবে। এতে করে সরকারের ভাবমূর্তি চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। এ ধরনের ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির বিধান করতে না পারলে ভবিষ্যতে সরকারকে মূল্য দিতে হতে পারে। মনে রাখতে হবে যে, আমাদের দেশে যে কোনো দুর্ঘটনার দায় শেষ পর্যন্ত সরকারের উপর গিয়ে চাপে। এর পেছনেও কারণ আছে। একের পর এক আগুনে পুড়ে, ভবন ধসে শ্রমিকের মৃত্যু হলেও সরকার অপরাধীদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করে না। এর আগে স্পেকট্রাম গার্মেন্টস ভবন ধসে, তাজরীন গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ডসহ বিভিন্ন সময়ে অগ্নিকাণ্ডে, ভবন ধসে অসংখ্য শ্রমিকের মৃত্যু হলেও কোনো ঘটনারই বিচার হয়নি। উপরন্তু, সরকার ও বিজিএমইএ অপরাধীদের রক্ষা করার জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা চালিয়ে যায়। ফলে, ‘হত্যাকাণ্ড’ বেড়েই চলে। আর সরকারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আর কতদিন অসহায় শ্রমিকরা এভাবে অকাতরে মরতেই থাকবে? এর কী কোনোই প্রতিবিধান নেই? বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পে ভবন ধস ও আগুনে প্রাণহানির ঘটনা প্রায়ই খবরের শিরোনাম হচ্ছে। মালিক-রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর দাবি অনুযায়ী ১৯৯০ সাল থেকে ২০১০ পর্যন্ত ২১২টি ঘটনায় অন্তত ২৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। যদিও মৃত্যুর এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি। নিয়মিত বিরতিতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। অথচ প্রতিকারের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না। প্রতিবার সেই একই কারণ, একই অজুহাত, একই তোড়জোড়। এবারও এর কোনো ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে না। এবারও দেখা যাচ্ছে, শ্রমিকদের বেতন কেটে রাখার ভয় দেখিয়ে, জোর করে ওই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছিল। এটাকে অনেকেই দেখছেন, ‘ডেকে এনে হত্যা’ হিসেবে। একের পর এক পোশাক কারখানায় দুর্ঘটনা ঘটছে, অথচ আজ পর্যন্ত কোনো মালিক এর দায় নেননি। তাদের মধ্যে কোনো অনুশোচনা-বোধও দেখা যায় না। বরং মালিকদের হাবভাব দেখে মনে হয়, তারা নামমাত্র মজুরি দিয়ে শ্রমিকের জানমাল পর্যন্ত কিনে ফেলেছেন। বাংলাদেশে প্রায় ৫০০০ তৈরি পোশাক কারখানা রয়েছে। এ সব কারখানায় প্রায় ৫০ লাখের মতো শ্রমিক কাজ করে। শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি পোশাকশিল্পকে নিয়মিতই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। অথচ কাজের পরিবেশ উন্নয়নে কখনই কার্যকর কোনো গ্রহণ করা হয় না। ফলে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটা এবং শ্রমিক মরার ঘটনাকে অবহেলামূলক হত্যাকাণ্ড বললে মোটেও বাড়িয়ে বলা হয় না। আমরা চাই, এবারের এই ট্রাজেডিকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করে মামলা করা হোক। দোষীব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগে বিচার করতে হবে। অগ্নিকাণ্ড এবং এর ফলে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির জন্য মালিকশ্রেণির যে দায় রয়েছে সেটি উপেক্ষা করার কারণেই পোশাক কারখানায় প্রাণহানি নৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। একথা অস্বীকার করা যাবে না যে, মালিকদের অতি-মুনাফার লোভ দেশের লাখ লাখ শ্রমিককে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য করছে। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রশাসক হয়ে সরকার তাদেরকে নিরাপত্তা দিতে পারছে না বা দিচ্ছে না। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কি কেবল শিল্পমালিকদের? রাষ্ট্রে তাহলে শ্রমিকদের স্থান কোথায়? তারা কি শিল্পমালিকদের মতই ভোটার নন? মনে রাখা দরকার বাংলাদেশের সংবিধান সকল নাগরিককে সমান অধিকার দিয়েছে। সুতরাং সরকার মালিকদের পক্ষাবলম্বনের যে নীতি নিয়েছে, তা স্বাধীন বাংলাদেশের মৌলিক চেতনার পরিপন্থী। আমাদের দেশে শিল্পমালিকরা সব সময়ই সরকারের কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করেন। কারণ সরকারের সঙ্গে থাকলে বা পক্ষে থাকলে সব রকম পাপ থেকে রেহাই পাওয়া যায়। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশে সরকারকেও শিল্পমালিকদের প্রতি একটু বেশি রকম নতজানু হতে দেখা যায়। সরকার সব সময় মালিকশ্রেণীর পক্ষে ভূমিকা পালন করে। সরকারের এই অবস্থান কোনো মতেই গ্রহণযোগ্য নয়। মালিকরা কারখানাকে কেবল টাকা বানানোর মেশিন হিসেবে ব্যবহার করবেন আর শ্রমিকদের ন্যূনতম মানবিক মর্যাদাও রক্ষা করবেন না তা হতে পারে না। যে শ্রমিকরা উত্পাদনের প্রাণ তাদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অধিকার কারও নেই। শ্রমিকরা বিগড়ে গেলে দেশের শিল্প, মালিকপক্ষ, সরকার—কারো জন্য শুভ হবে না। কাজেই মালিকদের অবশ্যই নিজেদের মনোভাব ও আচরণ বদলাতে হবে। শুধু কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবে শ্রমিকদের জন্য কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। যে কোনো মূল্যে শ্রমিকদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। মুনাফার টাকার পুরোটা নিজেদের পকেটে না তুলে শ্রমিকদের স্বার্থ ও সুবিধার জন্যও কিছু অংশ ব্যয় করতে হবে। এ ব্যাপারে মালিকপক্ষকে বাধ্য করার দায়িত্বটা সরকারকেই পালন করতে হবে। কারখানা ব্যবস্থাপনার একটা ন্যূনতম মানবিক মানদণ্ড নির্ধারণ করাও এ ক্ষেত্রে জরুরি কর্তব্য। শুধু কাজের পরিবেশ উন্নয়ন ও শ্রমিকদের নিরাপত্তা বিধান নয়, মজুরি বাড়ানোটাও পোশাক শ্রমিকদের একটি জরুরি দাবি। মজুরি বাড়ানোর কথা বললেই মালিকরা সমস্বরে বলেন, মজুরি বাড়ালে কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। যদিও তাদের এই বক্তব্যের কোনো ভিত্তি নেই। দেখা গেছে, বাংলাদেশের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি মজুরি দিয়েও চীন, তুরস্ক, ভারত, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম প্রভৃতি দেশ ব্যবসা করছে। সুতরাং মজুরি বাড়ালে লোকসান হবে এবং কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে এটি একেবারেই হাস্যকর দাবি। যখন একটি ভবন ধস বা অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে আর অনেক রকম বিধি-ব্যবস্থা গ্রহণের কথা শোনা যায়। এর পর ঘটনা একটু থিতু হয়ে এলেই সব কিছু চাপা পড়ে যায়। মালিকপক্ষের জুলুম, উদাসীনতা, অমানবিকতা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। এ ব্যাপারে সরকারের ভূমিকা সবচেয়ে হতাশাব্যঞ্জক। নিয়ম যারা মানে না, তাদের নিয়ম মানতে বাধ্য করার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু সরকার কখনও তা যথাযথভাবে করে না। বরং গার্মেন্টস মালিকদের স্বার্থ রক্ষা করাই যেন সরকারের একমাত্র দায়িত্ব। শ্রমিকরা পুড়ে মরুক, চাপা পড়ে মরুক, আর গোল্লায় যাক, তাতে যেন সরকারের কিছুই যায় আসে না। সরকারের ভূমিকা অন্তত তাই প্রমাণ করে। এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের। নিজেদের স্বার্থ, সুবিধা আর মুনাফার জন্য একদল লোভী মানুষ অপর একদল নিরীহ দরিদ্র মানুষকে হত্যা করবে, সরকার এই অনাচারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিয়ে লোক দেখানো তদন্ত কমিটি করবে, ঘটনা ধামাচাপা দিতে ষড়যন্ত্র আর নাশকতার কথা বলবে তা মোটেও কাজের কথা নয়। সরকারকে যে কোনো মূল্যে শ্রম আইন, ফ্যাক্টরি আইন ও বিল্ডিং কোড আইনের পূর্ণ বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে। পোশাকশিল্পের দরিদ্র শ্রমিকদের জীবনরক্ষা করতে হলে এ ছাড়া উপায় নেই। সাভারের মর্মান্তিক ঘটনার পরে পোশাক শিল্পের মালিকদের তোয়াজ করে চলার কোনো প্রয়োজন নেই। প্রয়োজনে এখন ‘লাঠি’ হাতে ঐ আইনগুলোর বাস্তবায়ন করতে হবে। তাতে যদি রপ্তানি আয় কিছুটা কমে, জিডিপি কিছুটা নেমেও যায়, তবু করতে হবে। কারণ রপ্তানি আয় বা জিডিপির চেয়ে শ্রমিকের জীবনের মূল্য অনেক বেশি। জীবন বাঁচলে রপ্তানি আয় আর জিডিপি দুটোই বাড়বে। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি-দাওয়া মনে নেয়া, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এ মুহূর্তে মালিকপক্ষ ও সরকারের প্রধান কাজ। তা না হলে বিক্ষুব্ধ মানুষ ভয়ানক কাণ্ড বাধিয়ে দিতে পারে। যা পোশাক কারখানা মালিকদের জন্য, সরকারের জন্য, এমনকি দেশের জন্য—কারো জন্যই তেমন কোনো শুভ ফল বয়ে আনবে না। লেখক :কলামিস্ট

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন