সাভার ট্র্যাজেডিআরেকটি মানবসৃষ্ট মহাবিপর্যয়

আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০১৩, ২১:২১
প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ হিসাবে পরিচিত বাংলাদেশ এখন পরিণত হয়েছে মানবসৃষ্ট মহাদুর্যোগের দেশ হিসাবে। প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে প্রাণহানি, সম্পদহানির অবর্ণনীয়, দুঃসহ, যন্ত্রণাকাতর, করুণ ও মর্মান্তিক ঘটনাবলী। কয়েকদিন আগে সাভারের রানা প্লাজা ভবন ধসে পড়ার ঘটনা আরেকটি মানবসৃষ্ট হূদয়বিদারক মর্মস্পর্শী হতাহতের ঘটনা। মানবসৃষ্ট বলছি এ কারণে যে, এ সকল ঘটনার জন্য দায়ী স্বার্থান্বেষী, মুনাফালোভী, বঞ্চনাকারী, শোষক, নির্যাতক ব্যক্তি, গোষ্ঠী অথবা শ্রেণি। এ নিবন্ধ লেখার সময় পর্যন্ত ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৩৩২ জনের মৃতদেহ, আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় আড়াই হাজার শ্রমিককে এবং এখনও আটকা পড়ে আছেন শত শত জীবিত ও মৃত মানুষ। এ ঘটনায় সারা জাতি শোকে মুহ্যমান। যতটুকু জানা যায় রানা প্লাজা ভবনের ফাটল ও ত্রুটি আগেই ধরা পড়ে। এর ফলে ব্র্যাক ব্যাংকসহ কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সতর্কতা অবলম্বন করে এবং ঘটনার দিনের পূর্বেই ভবন ত্যাগ করে। ভয়ে-আতংকে ঐ ভবনে কর্মরত গার্মেন্ট শ্রমিকেরাও ঐদিন কাজে উপস্থিত হয়নি। কিন্তু গার্মেন্টস মালিকেরা মাইকে ডেকে এনে শ্রমিকদের ঐ ত্রুটিপূর্ণ ভবনে কাজ করতে বাধ্য করে। এর ফলাফল হয় ভয়াবহ। অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান হয়, এ যেন মানুষ হত্যাযজ্ঞের এক মহোত্সব। শ্রমিকদের ডেকে এনে হত্যা করা হয়েছে, তাই এটি পরিকল্পিত নির্মম গণহত্যা। এক্ষেত্রে গার্মেন্টস ও ভবন মালিক এ গণহত্যা সংঘটিত করেছে এবং এত শ্রমিকের নিহত- আহতের জন্য তারাই দায়ী। দেশবাসী তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে আজ সোচ্চার। সমগ্র জাতি এ দুঃখজনক ঘটনায় শোকে মুহ্যমান। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে এ যেন লাশের মিছিল। যতদূর চোখ যায় শুধু লাশ আর লাশ। ধসে যাওয়া ভবনের ভেতরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে আরো অসংখ্য লাশ। ভেতরে আটকা পড়ে আছেন অসংখ্য জীবিত মানুষ। তাদেরকে উদ্ধার করতে আরও কত সময় লাগবে কে জানে। একজন সাংবাদিক বন্ধু একটি দৈনিকে এ সম্পর্কে লিখেছেন:“রানা প্লাজা এখন মৃত্যুপুরী। শোকের এই উপত্যকায় মানুষের আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। বাতাসে লাশের গন্ধ। সেই গন্ধে লেপ্টে আছে নোনতা ঘামে ভেজা শ্রমজীবী মানুষের ছোপ ছোপ রক্ত। শ্রমিকের রক্তে যে আলপনা হয়ে আছে, সেখানে শ্রম দাসদের প্রতি পুঁজিবাদের বীভত্সতার কথাই লেখা হয়ে আছে। এ যুগে পুঁজির দাসদের নিয়তি যে কত নিষ্ঠুর ও ভয়াবহ, সেটা দেখার জন্য হলেও একবার সাভারের এই বর্ধিষ্ণু জনপদে চোখ ফেলা উচিত। শাসকদের ছত্রছায়ায় স্ফীত পুঁজির তলে কিভাবে পুঁজির দাসেরা জীবন দেয়, তার আরো একটি দৃষ্টান্ত রানা প্লাজা”। তিনি আরও বলেন:“সস্তায় শ্রম বিক্রি করে জীবনের ঘানি টানা আর এভাবে মর্মান্তিক মৃত্যুর সাথে আলিঙ্গন করাই যেন তাদের ললাটের লিখন।” এখানে তিনি যথার্থই তুলে ধরেছেন পুঁজিবাদী শোষণের নির্মম ও নিষ্ঠুর পরিণতির কথা। আমি তার সাথে সম্পূর্ণ একমত। রানা প্লাজার ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে যে, শ্রেণি বিভক্ত সমাজে শ্রেণি শোষণ কত তীব্র হতে পারে; উদ্বৃত্ত মূল্য (Surplus value) আত্মসাতের জন্য মালিক শ্রেণি (বুর্জোয়া শ্রেণি) কতটা মরিয়া হতে পারে। সোহেল রানা ও তার সহযোগীরা শোষক বুর্জোয়া শ্রেণির প্রতিভূ; তাই ধসে পড়তে পারে নিশ্চিত জেনেও শ্রমিকদের ডেকে এনে কাজ করতে বাধ্য করে। শুধু শ্রমিক শ্রেণিকে শোষণ করে মুনাফার পাহাড় গড়ে তোলা এবং ভোগ-বিলাসে জীবন অতিবাহিত করাই তাদের উদ্দেশ্য। এদের কোন জাতীয় চরিত্র (national character) নাই, নাই দেশের প্রতি আনুগত্য, নাই দেশপ্রেম। এদের বলা যেতে পারে মুত্সূদ্দি শ্রেণি (comprador bourgeois )। বর্তমান শাসক শ্রেণি তাদেরই প্রতিনিধি। শ্রেণি শোষণের করুণ ও মর্মান্তিক ছবি আজকের সাভারের শ্রমিক হত্যাযজ্ঞের ছবি। তবে দ্বান্দ্বিক নিয়মে শ্রেণি সংগ্রামের (class struggle) মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের বার্তাও রেখে গেছেন দার্শনিক কার্ল মার্কস। তিনি তার The Capital গ্রন্থের পাতায় পাতায় পুঁজিবাদী সমাজে শ্রেণি শোষণের নির্মমতার কথা উল্লেখ করেছেন। পুঁজিবাদের চরম বিকাশে শোষণের তীব্রতায় শ্রমিক মানুষ কিভাবে তার উত্পাদিত দ্রব্য এবং সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন (alienation) হয়ে যায় তা অত্যন্ত সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তবে শ্রমিক শ্রেণি তথা সর্বহারা শ্রেণি বুর্জোয়া শ্রেণির শোষণের চরম পর্যায়ে তাদের বিরুদ্ধে স্বশস্ত্র বিপ্লব রচনা করে বুর্জোয়া রাষ্ট্রের পতন ঘটিয়ে সর্বহারার রাজত্ব কায়েম করবে এটাই ইতিহাসের শিক্ষা। এভাবে শ্রমজীবী তথা মেহনতি মানুষের মুক্তি আসে। আমাদের দেশে শ্রমিক সংগঠনগুলো দুর্বল। কারণ তাদের শ্রেণি সচেতনতার অভাব। শক্তিশালী শ্রেণি সংগঠন তাদের সংগঠিত করতে পারে। আমাদের দেশে আশি ও নব্বই-এর দশকে তৈরি পোশাক শিল্পের দ্রুত প্রসার ঘটে। আমার যতটুকু মনে আছে প্রথমদিকে গার্মেন্টস শিল্প বিকাশে তেমন কোন বাধা-বিপত্তি ছিল না এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে এর প্রাথমিক বিকাশ ও প্রসার ঘটতে থাকে। পর্যায়ক্রমে এ খাতটি আমাদের দেশের সবচেয়ে বৃহত্ ও সম্ভাবনাময় শিল্প খাতে পরিণত হয়। এই গার্মেন্টস শিল্পের মাধ্যমেই দেশের সর্বাধিক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধানতম দুইটি রফতানি খাতের একটি হলো গার্মেন্টস শিল্প বা তৈরি পোশাক শিল্প, যা রফতানি করে আমরা প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করি; আর অন্যটি হলো জনশক্তি রফতানি, যা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে অন্যতম। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে জনশক্তি রফতানির হার বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এর ফলে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু তারপরও গার্মেন্টস শিল্প খাতই হলো বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় খাত। তাই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক শিল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ কথা অনায়াশে বলা যায় যে, এর কৃতিত্ব তৈরি পোশাক শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিক শ্রেণির। লক্ষ লক্ষ শ্রমিক এই দ্রুত প্রসারমান শিল্পে নিয়োজিত হয়েছে। লক্ষণীয় যে, এদের অধিকাংশই (প্রায় ৮০ ভাগ) নারী শ্রমিক। এ কারণে দেশের শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু শ্রমিকের যে ন্যায্য মজুরি, শ্রমিকের যে অধিকার তা আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনা অহরহ ঘটছে। এ নিয়ে শাসক শ্রেণির কোন মাথাব্যথা নাই। শ্রমিক হত্যার দায়ে এদেশে কোন মালিককেই শাস্তি পেতে হয়নি। শ্রমিকদের প্রাণ হরণকারী মালিক শ্রেণি আইনের ঊর্ধ্বেই থেকে গেছে। মালিক শ্রেণি সব সুবিধা ভোগ করে, আর শ্রমিকের স্বার্থ হয় উপেক্ষিত। রানা প্লাজা ধসে এত হতাহতের ঘটনা যে একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এ নিয়ে আজ আর কারো সংশয় নাই। এ মহাবিপর্যয়ে বাংলাদেশের পোশাক ক্রেতা ও রফতানি গন্তব্যের দেশগুলোতে যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে এতে কোন সন্দেহ নাই। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি সুবিধা বন্ধ করে দিতে পারে। কোন কোন ক্ষেত্রে আবাসিক ভবন হিসাবে নির্মাণের পর সেখানে পোশাক কারখানা স্থাপন করা হয়েছে। তাছাড়া ইমারত নির্মাণের নিয়ম-কানুন যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না। বিশেষ করে সরকারদলীয় নেতা- কর্মীরা এসব নিয়ম-কানুন, বিধি-বিধানের তোয়াক্কা করে না। রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানা সরকারি দলের একটি অঙ্গ সংগঠনের নেতা। তাই সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত এক ব্যক্তির পুকুর দখল করে সেখানে রানা প্লাজা নমক ভবনটি নির্মাণ করেন। রানা গার্মেন্টসের মতো ত্রুটিপূর্ণ আরো অনেক কারখানা এখানে- সেখানে দেখা যাবে। কিন্তু এসব বিষয় নিয়ে সরকার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এ ধরনের মর্মন্তুদ ঘটনা আরো ঘটতে পারে। এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নিলে আরও শত-সহস্র নিরীহ পোশাক শ্রমিকের জীবন বিপন্ন হবে। আমাদের অর্থনীতির প্রাণ তৈরি পোশাকের রফতানি বাজারও ধীরে ধীরে সংকুচিত হবে; এমনকি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আমাদের দেশকে, দেশের মানুষকে এজন্য চরম মূল্য দিতে হবে। আমি এ মর্মান্তিক মানবসৃষ্ট দুর্যোগে নিহত শ্রমিকদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করি এবং তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করি, আর আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করি। লেখক:ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য, সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী ও নৃবিজ্ঞানী

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন