সাভারে মালিকি অবহেলায় আর তার লাগামহীন মুনাফা অর্জনের মনোবৃত্তির যূপকাষ্ঠে ভবন ধসে এখন পর্যন্ত মারা গেলেন ৩৪৮ জন শ্রমিক, আহত হলেন হাজারের অধিক আর এখনও আটকা পড়ে আছেন শত শত! না, সিরিয়ায় বোমা হামলায় বিধ্বস্ত হয়ে নয়, মারাত্মক সন্ত্রাসী হামলায় ধসে যাওয়া টুইন টাওয়ারের মত নয়, মার্কিন জঙ্গি বিমানের হামলায় ইরাক-আফগানিস্তানে বিধ্বস্ত কোন ভবনের মত নয়, এটা আমাদের প্রিয় বাংলাদেশের বিধ্বস্ত হয়ে যাওয়া ৯ তলা ভবন রানা প্লাজার চিত্র! কি ভয়াবহ! এক মুহূর্তে রানা প্লাজায় যত মানুষ মারা গেল যুদ্ধ পরিস্থিতেও এতো লোক মারা যায় না! সাভার পরিণত হয়েছে লাশের শহরে, সারি সারি লাশ রাখা আছে অধরচন্দ্র স্কুলের মাঠে, পিক আপ ভ্যানে, এনাম মেডিক্যালে! আমরা কি এমন রাষ্ট্র চেয়েছিলাম যে রাষ্ট্রে মানুষের জীবনের চেয়ে মুনাফার মূল্য বেশি? আমরা কি এমন সমাজ চেয়েছিলাম যেখানে উন্নয়নের নামে, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নামে, জিডিপি’র প্রবৃদ্ধির নামে নিয়মিত শ্রমিক শ্রেণীকে এমন পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য করা হবে যেখানে স্ট্রাকচারাল হত্যাকাণ্ডই নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে? আমরা কি এমন দেশ চেয়েছিলাম যে পোশাক শ্রমিকদের শ্রমে রক্তে ঘামে আমাদের অর্থনীতির চাকা সক্রিয় তাদেরই আমরা মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিব? সাভারে রানা প্লাজা ধসে গিয়ে শত শত শ্রমিকের নিহত হবার ঘটনা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে এই ভবন শুধু ধসে যায় নি আগেই ধসে গিয়েছে এদেশের রাষ্ট্রযন্ত্রের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা আর সামাজিক মূল্যবোধ ও সভ্যতা! যে লুণ্ঠন-লুটপাট-রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন-পুঁজিবাদী শাসন-শোষণ আর সর্বোপরি মানবিক মর্যাদাহীনতার যে সংস্কৃতি আমরা তৈরি করেছি তার ভারেই মূলত ধসে পড়েছে সাভারের এই ভবনটি ! এই একটি মাত্র ভবনের আত্মকাহিনী বলে দেয় বাংলাদেশ নামক যে ভূখণ্ডে আমাদের বসবাস সেখানে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা কত কম, সেখানে শ্রমিকের জীবনের মূল্য এমনকি পোশাকের চেয়েও কত সস্তা, সেখানে মানুষের মানবিক অধিকার কি করে মালিক শ্রেণী আর রাজনৈতিক নেতাদের সীমাহীন লোভের কাছে পদদলিত হচ্ছে। এই ভবনের আত্মকাহিনী আমাদের বলে দেয় এই উত্তর আধুনিক যুগে এসেও কি করে আমরা অধিক মুনাফার লাভের জন্য শত শত শ্রমিককে নির্বিচারে মৃত্যুর কোলে ঠেলে দিতে কুণ্ঠাবোধ করি না, আমাদের বলে দেয় সমগ্র আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা কি করে বাঁচিয়ে রাখে পুঁজিবাদী লোভ-লালসায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত মালিক গোষ্ঠীর আধিপত্য!
আগের দিন রানা প্লাজায় ফাটল ধরা পড়ার পরও ভবন নামের ঐ মৃত্যুকূপে হাজার হাজার শ্রমিককে কাজ করতে বাধ্য করে কারখানার যে মালিক শত শত শ্রমিককে হত্যা করেছে, আহত করেছে তার কোন বিচার হবে কিনা জানি না, ফাটল ধরার পর থানা প্রশাসন মেরামতের কথা বললেও ‘এটা কোন ব্যাপার না, প্লাস্টার করলেই ঠিক হয়ে যাবে’ বলে ভবনের যে মালিক হত্যাযজ্ঞের ক্ষেত্র প্রস্তুত করল, আরও পিছনে গেলে লক্ষ টাকা লোপাট করার তাগিদে যে ডেভেলপার কোম্পানি এমন ঠুনকো (মাত্র ৩-৪ বছরেই তা ধসে পরল) ভবন তৈরি করে এই হত্যাযজ্ঞের অনিবার্য কারণ জারি রাখল তাদেরও কোন বিচার এই রাষ্ট্র করবে বলে মনে হয় না, এই রাষ্ট্র বরং এসব পুঁজিপুত্রদের সমস্ত লুণ্ঠন, শোষণ আর জুলুমকে নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিয়েছে! ঐ বুর্জোয়া মালিক কি জানত না এই মৃত্যুকূপে কাজ করলে ভবন ধসে পড়ে নির্ঘাত শ্রমিক মারা যাবে? অবশ্যই জানত। তার চোখের সামনেই তো ভবনের ব্যাংক, বীমা আর বিপণি বিতানের কর্মকর্তারা তাদের কর্মচারীদের ছুটি দিয়ে দিয়েছে সেদিন, তাহলে পোশাক মালিক কেন ঝুঁকির মধ্যে কাজ করতে শ্রমিকদের বাধ্য করল ? কারণ তার চোখে এই হাজার হাজার শ্রমিক মানুষ না, এরা কেবলি উত্পাদনের যন্ত্র! যন্ত্রের চেয়েও মূল্যহীন এদের জীবন। এই মুনাফাখোর মালিকের কাছে তৈরি পোশাকের অর্ডার সময়মত সম্পন্ন করাই মূল্যবান। তার কাছে সময় মানেই অর্থ, প্রতি মিনিট মানেই প্রতি ডলার মুনাফা। শ্রমিকের জীবনের দাম তার কাছে এক পয়সাও না। তাই তাদের জোর করে বাধ্য করা হল কাজে যোগ দিতে। এসব মালিককে পুঁজিবাদী বা বুর্জোয়াও বলা যায় না, পুঁজিবাদেও শ্রমিককে বাঁচিয়ে রাখা হয় উত্পাদনের স্বার্থেই। এই রাষ্ট্র কাঠামোর কাছে এদের বিচার চাওয়া এখন সবচেয়ে হাস্যকর বিষয়ে পরিণত হয়েছে! শুধু শোক প্রকাশ করে যেসব নাগরিক লাগাতার শ্রমিক হত্যার প্রেক্ষিতে নিজেদের মানবিক দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখতে চান তারা নিজেরাও এই তাদের পরোক্ষ সহযোগী। এই বর্বরতা যদি আমরা আর না দেখতে চাই, এই নৃশংস হত্যাযজ্ঞ যদি আমরা আর না দেখতে চাই তাহলে চলমান নিপীড়ক সোশ্যাল অর্ডার ভেঙ্গে ফেলতে হবে। প্রত্যাখ্যান করতে হবে শ্রমিক বিরোধী চলমান উন্নয়ন দর্শন। তার জন্য যে বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক তত্পরতা দরকার তাতে শামিল না হয়ে কেবল শোকে চোখের পানি ফেললে শ্রমিকের রক্ত ঝরা বন্ধ হবে না, বন্ধ হবে না এই স্ট্রাকচারাল হত্যাকাণ্ড! আমাদের বুঝতে হবে এবং মালিকদেরও বুঝাতে হবে শ্রমিকদের শ্রম শোষণ করে, তাদের কম বেতন দিয়ে, মাসের পর মাস তাদের বেতন বকেয়া রেখে মাত্রাতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের যে পুঁজিবাদি মনোভাব তারা লালন করে এসেছেন তা সমাজে আর চলতে দেয়া যাবে না। কারখানার মালিক ও বিজিএমইএসহ তাদের সংস্থাসমূহকে বুঝতে হবে, শ্রমিকদের রক্তক্ষরণ করে আর তাদের মৃত্যুকূপে কাজ করতে বাধ্য করে অর্থনৈতিক উন্নয়নের যে শোষণমূলক উন্নয়ন দর্শন তারা প্রতিষ্ঠিত করেছেন এইদেশে তা আর ফাংশন করবে না! শ্রমিকরা কঠোর পরিশ্রম করে কোনরকমে জীবন ধারণের জন্য উপযুক্ত বেতন পাবে না, আর তাদের শ্রম শোষণে এমনকি শ্রমিক নিধনের মধ্য দিয়ে হলেও চালু রাখতে হবে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাকা, এই ধরনের বৈষম্যমূলক, শোষণমূলক বুর্জোয়া অর্থনীতি শুধু সমাজের ধনিক শ্রেণীরই লুটপাটের ক্ষেত্র প্রস্তুত করবে, অন্য কিছু নয়। আমরা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পক্ষে তবে তা হতে হবে অবশ্যই শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার পূরণের মাধ্যমেই। দেশের সব শাসকগোষ্ঠীই এমন এক রাষ্ট্রযন্ত্র আমাদের উপহার দিয়েছেন যা নিম্নবর্গীয় প্রলেতারিয়েতের অধিকার পূরণকে কখনই নিজের দায়িত্ব মনে করে নাই, অভিজাত বুর্জোয়া সমাজের শোষণের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে বিদ্যমান রাষ্ট্রকাঠামো। আমরা মনে করি, নিজের ভালোর জন্যই মালিকদের উচিত শ্রমিকদের ন্যায়সঙ্গত দাবি মেনে নিয়ে তাদের বেতন বৃদ্ধি করা ও তাদের নিরাপদ কাজের পরিবেশ সুনিশ্চিত করা। পোশাক কারখানার যাবতীয় ভবন বিল্ডিং কোড অনুযায়ী তৈরি হয়েছে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখতে হবে, যেসব ভবন ঝুঁকিপূর্ণ সেগুলো এখনি ভেঙ্গে ফেলে নতুন করে তৈরি করতে হবে। প্রত্যেকটি নতুন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বিল্ডিং কোড মানা হয় কিনা তা দেখভাল করতে হবে রাজউক ও বিজিএমইএ’কে। যেসব কারখানা নিয়ম অনুযায়ী ভবন নির্মাণ করবে না এবং ভবনে নিরাপদ কাজের পরিবেশ সৃষ্টি করবে না তাদের লাইসেন্স সাথে সাথে বাতিল করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের শ্রম মন্ত্রণালয় ও শিল্প মন্ত্রণালয়কে কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। সাভারে মালিক প্রযোজিত এই শ্রমিক হত্যাযজ্ঞের সাথে জড়িত ভবন মালিক, পোশাক কারখানার মালিক, ভবনের ইঞ্জিনিয়ার ও ডেভেলপার কোম্পানিকে অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে। রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে বুর্জোয়াদের স্বার্থ রক্ষা না করে সাধারণ মজুরি শ্রমিকের পাশে না দাঁড়ালে রাষ্ট্রের নৈতিক এবং রাজনৈতিক ভিত্তিই ভেঙ্গে পড়বে। যে রাষ্ট্র ও সমাজ কাঠামোতে মানুষের জীবনের চেয়ে মুনাফার মূল্য অধিক তা আমরা চাই না।
লেখক : শিক্ষক; ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি এন্ড ফার্মাকোলজি বিভাগ, ফার্মেসি অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
zalmahmud¦yahoo.com
