আত্মবিনাশী প্রতিবাদ কাম্য নহে

আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০১৩, ২১:৩২
বিগত কয়েক বত্সর একের পর এক দুর্ঘটনা অস্থিতিশীল করিয়া তুলিয়াছে আমাদের পোশাক শিল্পকে। এই শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকরাও অসহিষ্ণু ও বিক্ষুব্ধ হইয়া উঠিয়াছে স্বাভাবিকভাবেই। কিন্তু সেই অসহিষ্ণুতার ভাষা যদি হয় আত্মহন্তারকতুল্য, তবে তাহা আমাদের বিদ্যমান সঙ্কটের সমাধান না দিয়া বরং আরো গহীন খাদের কিনারে লইয়া যায়। পোশাক খাতের মালিকদের নানাবিধ বৈষম্যহেতু শ্রমিকদের ভিতরকার পুঞ্জীভূত ক্ষোভ সৃষ্টি হইয়াছে দীর্ঘদিন ধরিয়াই। সাভারের ভয়াবহ ভবন ধসে শত শত পোশাক শ্রমিকের মৃত্যু ও আহত হওয়ার দুর্ঘটনা সেই ক্ষোভের ঘৃতে অগ্নি নিক্ষেপ করিয়াছে। ইহা স্বাভাবিক। কিন্তু তাহার প্রকাশ আমরা গত শুক্রবার রাজধানী ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় যাহা দেখিয়াছে তাহা আরো বড় অশনি সংকেত বলিলে অত্যুক্তি হইবে না। আমরা অত্যন্ত উদ্বেগের সহিত দেখিয়াছি, পোশাক শিল্পের বিক্ষুব্ধ হাজার হাজার শ্রমিক সাভারের দুর্ঘটনার প্রতিবাদে দুই শতাধিক যানবাহন, অর্ধশতাধিক পোশাক কারখানা ও বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর করিয়াছেন। আমরা আরো দেখিয়াছি গণগুজব কীভাবে আমাদের দেশের ভাতৃসংহারের অস্ত্র হইয়া উঠিতেছে। পিছিয়ে পড়া সমাজে ইহা এতোটাই ভয়াবহ হইয়া উঠিতে পারে যাহা নিজেদের পায়ে কুঠারাঘাততুল্য। গত শুক্রবারও শ্রমিকের মাঝে এই গুজবের বিষ বাতাসে ছড়ানো হয়। উস্কে দেওয়া হয় এই বলিয়া যে, সহিংসতায় তাহাদের দুইজন শ্রমিক নাকি মারা পড়িয়াছে! ইহার ফল হয় মারাত্মক। অতি ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা তখন এই গুজবকে কেন্দ্র করিয়া রামপুরা, বাড্ডা, মালিবাগ চৌধুরীপাড়া, মালিবাগ রেল ক্রসিং এলাকায় অরাজক পরিবেশ সৃষ্টি করিতে থাকেন। ভাঙচুর করেন কয়েকটি পোশাক কারখানা। কয়েকটি কারখানায় লুটপাটের ঘটনাও ঘটিয়াছে বলিয়া সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। এমনকি বিক্ষুব্ধ শ্রমিকের হাত হইতে রক্ষা পায় নাই ব্যাংকের এটিএম বুথ, আসবাবপত্রের দোকান ও অসংখ্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ’র সদস্যভুক্ত সব পোশাক কারখানা শনি ও রবিবার বন্ধ রাখিবার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু আমরা জানিতে পারিয়াছি, ঢাকা ও তাহার আশেপাশে পোশাক শিল্পের বাহিরে অন্যান্য কারখানা বন্ধ ছিল গতকাল। এমনিতেই আমাদের দেশে শিল্পবান্ধব পরিবেশ লইয়া নানাবিধ প্রশ্ন রহিয়াছে, সেইখানে অরাজক পরিস্থিতি আশঙ্কায় অন্যসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘটনা শিল্প বিকাশের ন্যূনতম পরিবেশকে ব্যাহত করিয়া তোলে। প্রশ্ন হইল, আমরা নানামুখী আত্মঘাতী আচরণ বহাল রাখিয়া নিজেদের বিপন্নতা ত্বরান্বিত করিব কিনা। সাভার বিপর্যয় শুধু মর্মান্তিকই নহে, তাহার নেপথ্য পরোক্ষ কারণ শ্রমিকদের জীবনের মূল্যকেও তুচ্ছ প্রতিপন্ন করিয়া থাকে। এ সমস্যার সমাধান, শ্রমিকদের বৈষম্য বিদূরীকরণ, শ্রমিক স্বার্থ না-দেখিলে সমস্ত পোশাক শিল্প খাতই বিপন্নতার মুখোমুখি হইবে—ইহা যেমন সত্য, তেমনি সত্য মুদ্রার অপর পৃষ্ঠাও। শ্রমিকরা নিজেদের স্বার্থ আদায়ে যদি গোটা শিল্প পরোক্ষভাবে হুমকির মুখে ফেলিয়া দেয়, তাহা হইলে তাহারা নিজেরাও বিপন্নতায় নিমজ্জিত হইবে। তাহাছাড়া ইহা শুধু পোশাক শিল্পের খাতের জন্য উদ্বেগের নহে, সমগ্র উত্পাদনশীল শিল্প প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক খাতের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলিতে বাধ্য। সামান্য স্ফুলিঙ্গও ভয়াবহ দাবদাহের কারণ হইতে পারে। সুতরাং শ্রমিক শ্রেণিরও নিজেদের দর্পণে গভীর মনোযোগে মুখ দেখিবার সময় আসিয়াছে নিজেদের স্বার্থেই। গভীর পরিতাপের সহিত আমরা দেখিতে পাই, সমস্যা সমাধানের এমন ধ্বংসাত্মক পথ একমাত্র উন্নয়নশীল বিশ্বেই দৃশ্যমান। ইহা এমন এক গোলকধাঁধা, যাহার চক্করে পড়িয়া ‘উন্নয়নশীল’ থেকে ‘উন্নত’ বিশ্বের প্রবেশের পথে কণ্টক ছড়ানো হয়। কেননা, ধ্বংসাত্মক পথ আমাদের সমাধান দিক বা না দিক, ভূতের অশরীরী পেছনদিককার পায়ের মত আমাদের পেছনের দিকেই ঠেলিয়া দেয়, তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। সুতরাং এসব ধ্বংসযজ্ঞের দর্পণে নিজেদের প্রতিচ্ছবিও দেখিবার সময় আসিয়াছে। কেননা, যাহাকে অবলম্বন করিয়া কোটি মানুষের রুটি-রুজি ও নিত্যজীবন প্রবহমান, তাহা বিপন্নতার গিরিখাতে পতিত হইলে কোটি জীবনও ভয়াবহ অনিশ্চয়তায় পড়িবে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন